* অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতীয় ১৫ ও মিয়ানমারের ২৭৬ নাগরিক আটক
* ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩টি হ্যান্ড গ্রেনেড, মর্টার সেল, গান পাউডার জব্দ
* বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও স্বার্ণালঙ্কার, কসমেটিক্স উদ্ধার
* গেল ডিসেম্বরে ১৫৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার পণ্যসামগ্রী জব্দ
* সীমান্তে মাদক-চোরাচালানে জড়িত ১৭১ জন গ্রেপ্তার
‘সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে বিজিবি’র সদস্যরা সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। এ জন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে’
– লেঃ কর্নেল এস এম খায়রুল আলম, অধিনায়ক, বিজিবি (৩৪ ব্যাটালিয়ন), কক্সবাজার
দেশের সীমান্ত এলাকায় এখনও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানেও থেমে নেই চোরাচালান। দেশের পটপরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের ভোল পাল্টে নানা কৌশলে চোরাকারবারিরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে আসছে। রাতের অন্ধকার আর বৈরী আবহাওয়ায় বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে চক্রের সদস্যরা। চোরাকারবারিদের নজরে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো। সীমান্তের দুর্গম অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ আর জঙ্গলবেষ্টিত এলাকাগুলো টার্গেটে রেখেই প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধ পথে দেশে আনছে অস্ত্র-মাদক, কাপড়-কসমেটিক্সসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে স্বর্ণালঙ্কার, দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ অন্যান্য পণ্য। সিলেট, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, যশোর, কুমিল্লা, ফেনী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, খাগড়াছড়ির নাইক্ষ্যাছড়িসহ দেশের সীমান্ত এলাকার অন্তত ৫০টি স্পট দিয়ে চোরাচালানীরা তৎপর রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার দু’পাড়েই রয়েছে চোরাচালানের সংঘবদ্ধ দালালচক্র। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চোখ ফাঁকি দিয়ে গরু-মহিষও আনা হচ্ছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) দৈনিক সবুজ বাংলায় পাঠানো বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সদস্য বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ১৫৫ কোটি ৫৯ লক্ষাধিক টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্যসামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। কক্সবাজার বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলছেন, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান দমন করতে বিজিবি সর্বদা সজাগ ও সতর্ক ভূমিকা পালন করছে। চোরাকারবারিদের ধরতে দেশের সীমান্তসহ বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিজিবি’র টহল ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সদ্য বিদায়ী বছর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসজুড়ে দেশের সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি’র অভিযানে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র-মাদক, গোলাবারুদসহ অবৈধভাবে আনা অন্যান্য পণ্যসামগ্রী জব্দ করেছে বিজিবি’র বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।

জব্দকৃত চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে- ২ কেজি ০৬৩.৩৮ গ্রাম স্বর্ণ, ১৪ হাজার ৮৮৩টি শাড়ী, ২৬ হাজার ১০০টি থ্রিপিস/শার্টপিস/চাদর/কম্বল, ২৬ হাজার ৫২০টি তৈরী পোশাক, ৯ হাজার ৮৮৩ মিটার থান কাপড়, ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৬৪৬টি কসমেটিক্স সামগ্রী, ১৬ হাজার ৯৫৪ পিস ইমিটেশন গহনা, ৩৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৮২টি আতশবাজি, ১১ হাজার ১১৯ ঘনফুট কাঠ, ৪ হাজার ৬৩৯ কেজি চা পাতা, ১০ হাজার ৯৯ কেজি সুপারি, ২৩ হাজার ১৩০ কেজি কয়লা, ৭০৮ ঘনফুট পাথর, ১৭৬ ঘনফুট বালু, ৪ হাজার ৬৩৬টি প্লাস্টিক/ইলেঃ সামগ্রী, ১৯১টি মোবাইল, ১ হাজার ৫৩২টি মোবাইল ডিসপ্লে, ১৬ হাজার ৪৭৩টি চশমা, ৩৪ হাজার ২৮১ কেজি জিরা, ৪ হাজার ৭৮৭ কেজি চিনি, ১ লাখ ৩ হাজার ৩২৬ কেজি পিয়াজ, ৬ হাজার ৬০ কেজি রসুন, ১ হাজার ৯০৫ প্যাকেট বিভিন্ন প্রকার বীজ, ৬ হাজার ৫৭৫ কেজি সার, ৬১৫ প্যাকেট কীটনাশক, ৩১১ লিটার ডিজেল, ২ লাখ ২৬ হাজার ১১১ পিস চকোলেট, ৮৬৫টি গরু/মহিষ, ১টি কষ্টি পাথরের মূর্তি ৮টি ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান, ১৩টি পিকআপ/মহেন্দ্র, ১টি ট্রাক্টর, ৭টি প্রাইভেটকার/মাইক্রোবাস, ২টি ট্রলি, ৬৯টি নৌকা, ২৫টি সিএনজি/ইজিবাইক, ৫৩টি মোটরসাইকেল এবং ৩৯টি বাইসাইকেল/ভ্যান।
উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে-১২টি বিদেশী/দেশীয় পিস্তল, ১টি রাইফেল, ৩টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১৬টি ম্যাগাজিন, ৩৩৬ রাউন্ড গোলাবারুদ, ১টি মর্টার সেল, ১৭ কেজি গান পাউডার এবং ৬টি অন্যান্য অস্ত্র।
এছাড়াও গত মাসে বিজিবি কর্তৃক বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে- ৯ লাখ ১১ হাজার ৯৮২পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৫৪ গ্রাম হেরোইন, ২ হাজার ১০১ বোতল ফেনসিডিল, ৭ কেজি ৪৩৯ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ৮ হাজার ৯৯৯ বোতল বিদেশী মদ, ২৭২.৫ লিটার বাংলা মদ, ১ হাজার ২০৭ বোতল ক্যান বিয়ার, ১ হাজার ৭৯৪ কেজি গাঁজা, ২ লাখ ৩২ হাজার ২৬৪ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট, ৩২ হাজার ২১০টি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট/ইনজেকশন, ৪ হাজার ২১৭ বোতল ইস্কাফ সিরাপ, ২০ হাজার ৮৪৮ বোতল বিভিন্ন প্রকার সিরাপ, ১১ হাজার ৬৯৫টি এ্যানেগ্রা/সেনেগ্রা ট্যাবলেট, ৫ বোতল, এলএসডি এবং ৬ লাখ ৮১ হাজার ২৪৮ পিস বিভিন্ন প্রকার ঔষধ ও অন্যান্য ট্যাবলেট।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৭১ জন চোরাচালানী এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ১৩৪ জন বাংলাদেশী নাগরিক, ১৫ জন ভারতীয় নাগরিক ও ২৭৬ জন মায়ানমার নাগরিককে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, দেশের সকল সীমান্তের এক হাজার ৭২৭ কিলোমিটার সীমান্ত রেখায় সবকটি সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটির সদস্যরা দেশের সবকটি সীমান্ত সুরক্ষা, সীমান্ত গোয়েন্দা, মানব পাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা, চোরাচালান বিরোধী কার্যক্রম, ওষুধ ও মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে অপারেশন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিজিবি’র এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সীমান্তে চোরাচারানের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল এস এম খায়রুল আলম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, বিজিবি সর্বদা সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তৎপর রয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং দুস্কৃতিকারীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির সকল সদস্য পেশাদারিত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের সাথে দায়িত্ব পালন করছে। এ লক্ষ্যে সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।

























