০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সমস্যার আবর্তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-১ 

চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

⮞ ছাত্রদের জন্য নেই কোনো আবাসিক হল
⮞ মেসজীবনে বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগের সঙ্গে প্রভাব ফেলছে লেখাপড়ায়

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। স্কুল, স্কুল থেকে কলেজ এরপর ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এই বিদ্যাপীঠটি। অথচ শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য আজও গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় হল। ছাত্রীদের জন্য দুই বছর আগে একটিমাত্র হল প্রতিষ্ঠিত হলেও ছাত্রদের জন্য নেই কোনো আবাসন ব্যবস্থা। যার ফলে হাজার হাজার ছাত্র পার করছে মানবেতর জীবন। পুরান ঢাকার গিঞ্জি মেসগুলো হয়ে উঠেছে তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। যা তাদের পড়াশোনায় ফেলছে মারাত্মক প্রভাব।
২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জগন্নাথ কলেজকে স্বীকৃতি দেয়া হয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। এত বছরে মাত্র একটি ছাত্রী হল পেয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যেটির নির্মাণে সময় লেগেছে ১১ বছর । এ ছাড়াও জবির একমাত্র ছাত্রী হল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলেও রয়েছে নানা সংকট।
বিশ্ববিদ্যালয়টি কলেজ থাকাকালে একসময় ১১টি ছাত্রাবাস (এর বাইরে একটি মাঠ) থাকলেও কাগজপত্র না থাকা বা সংরক্ষণ না করায় তিনটি বাদে বাকিগুলো এখনো বেদখলে। দখলে থাকা তিনটির জায়গাতেও হল করা হচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, সংস্কার না করায় সেগুলোতেও থাকার পরিবেশও নেই।
২০০৯ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা হলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও প্রভাবশালীদের দখলে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো এখনো পুনরুদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আবাসিক হলের দাবিতে মাসব্যাপী আন্দোলনে ফেটে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনের মুখে সরকার কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত দেয়। বেদখল হল উদ্ধারে জটিলতা থাকায় এবং বর্তমান ক্যাম্পাসে জায়গা না থাকায় ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের ঘোষণা আসে সে সময়। ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর জমির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। ৯ অক্টোবর নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। এক হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যে কিন্তু সবে মাত্র হয়েছে সীমান প্রাচীর।
শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়ে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা থেকে স্বপ্ন বুনতে আসে এখানে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আবাসন সুবিধা না থাকায় তাদের যেতে হয় এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের। পুরান ঢাকা ব্যবসায়িক এলাকা হওয়ায় এখানে একটু মাথা গুঁতে গুনতে হয় মোটা টাকা। নিজের সেই খরচ যোগাতে হয় শিক্ষার্থীর নিজেকেই। কেউ টিউশন কেউ বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে কেউবা আবার পার্ট টাইম কোনো কাজ করে সেই খরচা চালিয়ে থাকে। যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের পড়াশোনার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। যদি আবাসন সুবিধা থাকতো, অন্তত তারা এই নিশ্চয়তা পেতো যে, থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে আমাকে লড়াই করতে হবে না। অনেকে মানুষিকভাবে ভেঙে পড়ে। অনেকে এই চাপ সহ্য করতে না পেরে নানা রকম মাদক, আইন বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।
ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তোফায়েল আহমেদ সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে বড় সমস্যা হলো আবাসন সমস্যা। এর জন্য শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যায় ভুগে। পুরান ঢাকাতে টিউশন পাওয়া যায় না, বা গেলেও স্যালারি কম। ফলে প্রতি মাসে আমাদের অতিরিক্ত খরচ হয়। যার কারণে আমাদেরকে প্রতি মাসে বাড়ি থেকে টাকা নিতে হয়।
সমাজকর্ম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলিম ইসলাম বলেন, হল না থাকার কারণে আমাদেরকে মেসে থাকতে হয়। মেসের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, গ্যাস ও পানি সমস্যা তো নিত্যকার সমস্যা।
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসনাত বলেন, বর্তমানে প্রতিটি মেসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে আমাদেরকে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। আমাদের হল থাকলে মেস ভাড়ার মতো খরচ থেকে বাঁচা যেতো। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত খরচের মানসিক চাপ থেকে রেহাই পেত।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. আলামিন সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধা না থাকায়, আমাদের শিক্ষার্থীরা যে নানা বিধ সমস্যায় আছে সেটা আমাদেরও ব্যথিত করে। কিন্তু আমাদের পুরাতন ক্যাম্পাসে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় সেখানে হল করার চিন্তা ভাবনা আমাদের নেই। কেরানিগঞ্জে আমাদের নতুন ক্যাম্পাস হচ্ছে সেখানেই শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের নতুন ভিসি আসার পরে আমাদের নতুন ক্যাম্পাসের কাজে দ্রুততা এসেছে।
তিনি আরো বলেন, কেরানিগঞ্জের জেলখানার কাছে আমাদের কয়েক একর জমি আছে সেখানে হল করা যায় কি না তার জন্য ভিসি আপা আমাদেরকে প্রাথমিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিওতে রংপুরের দারুণ জয়

সমস্যার আবর্তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-১ 

চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

আপডেট সময় : ০২:০৯:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪

⮞ ছাত্রদের জন্য নেই কোনো আবাসিক হল
⮞ মেসজীবনে বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগের সঙ্গে প্রভাব ফেলছে লেখাপড়ায়

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। স্কুল, স্কুল থেকে কলেজ এরপর ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এই বিদ্যাপীঠটি। অথচ শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য আজও গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় হল। ছাত্রীদের জন্য দুই বছর আগে একটিমাত্র হল প্রতিষ্ঠিত হলেও ছাত্রদের জন্য নেই কোনো আবাসন ব্যবস্থা। যার ফলে হাজার হাজার ছাত্র পার করছে মানবেতর জীবন। পুরান ঢাকার গিঞ্জি মেসগুলো হয়ে উঠেছে তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। যা তাদের পড়াশোনায় ফেলছে মারাত্মক প্রভাব।
২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জগন্নাথ কলেজকে স্বীকৃতি দেয়া হয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। এত বছরে মাত্র একটি ছাত্রী হল পেয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যেটির নির্মাণে সময় লেগেছে ১১ বছর । এ ছাড়াও জবির একমাত্র ছাত্রী হল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলেও রয়েছে নানা সংকট।
বিশ্ববিদ্যালয়টি কলেজ থাকাকালে একসময় ১১টি ছাত্রাবাস (এর বাইরে একটি মাঠ) থাকলেও কাগজপত্র না থাকা বা সংরক্ষণ না করায় তিনটি বাদে বাকিগুলো এখনো বেদখলে। দখলে থাকা তিনটির জায়গাতেও হল করা হচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, সংস্কার না করায় সেগুলোতেও থাকার পরিবেশও নেই।
২০০৯ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা হলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও প্রভাবশালীদের দখলে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো এখনো পুনরুদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আবাসিক হলের দাবিতে মাসব্যাপী আন্দোলনে ফেটে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনের মুখে সরকার কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত দেয়। বেদখল হল উদ্ধারে জটিলতা থাকায় এবং বর্তমান ক্যাম্পাসে জায়গা না থাকায় ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের ঘোষণা আসে সে সময়। ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর জমির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। ৯ অক্টোবর নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। এক হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যে কিন্তু সবে মাত্র হয়েছে সীমান প্রাচীর।
শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়ে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা থেকে স্বপ্ন বুনতে আসে এখানে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আবাসন সুবিধা না থাকায় তাদের যেতে হয় এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের। পুরান ঢাকা ব্যবসায়িক এলাকা হওয়ায় এখানে একটু মাথা গুঁতে গুনতে হয় মোটা টাকা। নিজের সেই খরচ যোগাতে হয় শিক্ষার্থীর নিজেকেই। কেউ টিউশন কেউ বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে কেউবা আবার পার্ট টাইম কোনো কাজ করে সেই খরচা চালিয়ে থাকে। যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের পড়াশোনার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। যদি আবাসন সুবিধা থাকতো, অন্তত তারা এই নিশ্চয়তা পেতো যে, থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে আমাকে লড়াই করতে হবে না। অনেকে মানুষিকভাবে ভেঙে পড়ে। অনেকে এই চাপ সহ্য করতে না পেরে নানা রকম মাদক, আইন বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।
ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তোফায়েল আহমেদ সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে বড় সমস্যা হলো আবাসন সমস্যা। এর জন্য শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যায় ভুগে। পুরান ঢাকাতে টিউশন পাওয়া যায় না, বা গেলেও স্যালারি কম। ফলে প্রতি মাসে আমাদের অতিরিক্ত খরচ হয়। যার কারণে আমাদেরকে প্রতি মাসে বাড়ি থেকে টাকা নিতে হয়।
সমাজকর্ম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলিম ইসলাম বলেন, হল না থাকার কারণে আমাদেরকে মেসে থাকতে হয়। মেসের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, গ্যাস ও পানি সমস্যা তো নিত্যকার সমস্যা।
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসনাত বলেন, বর্তমানে প্রতিটি মেসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে আমাদেরকে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। আমাদের হল থাকলে মেস ভাড়ার মতো খরচ থেকে বাঁচা যেতো। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত খরচের মানসিক চাপ থেকে রেহাই পেত।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. আলামিন সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধা না থাকায়, আমাদের শিক্ষার্থীরা যে নানা বিধ সমস্যায় আছে সেটা আমাদেরও ব্যথিত করে। কিন্তু আমাদের পুরাতন ক্যাম্পাসে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় সেখানে হল করার চিন্তা ভাবনা আমাদের নেই। কেরানিগঞ্জে আমাদের নতুন ক্যাম্পাস হচ্ছে সেখানেই শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের নতুন ভিসি আসার পরে আমাদের নতুন ক্যাম্পাসের কাজে দ্রুততা এসেছে।
তিনি আরো বলেন, কেরানিগঞ্জের জেলখানার কাছে আমাদের কয়েক একর জমি আছে সেখানে হল করা যায় কি না তার জন্য ভিসি আপা আমাদেরকে প্রাথমিক নির্দেশনা দিয়েছেন।