বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন ও তার অনুসারীরা পদত্যাগ না করায় শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। শনিবার (১৭ আগস্ট) তারা (শিক্ষার্থীরা) ভিসির বাসভবন ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। পরে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন কর্মসূচি চলবে। নিয়োগে বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির রেকর্ড তৈরি করা ড. আনোয়ার হোসেনকে ভিসি পদে আর দেখতে চাইছেন না।
জানা গেছে, অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ২০১৭ সালের ২০ মে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) ভাইস চ্যান্সেলর পদে যোগদান করেন। চাকরির প্রথম মেয়াদে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ৫৫ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিনি ২০২১ সালের ১৯ মে ভিসি পদের মেয়াদ শেষ করেন। একই বছরের ১ জুন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসির দায়িত্ব পান।
অভিযোগ উঠেছে, নানা দুর্নীতির মধ্যে তিনি যবিপ্রবির ১৪ লিফট স্থাপন নিয়ে ১০ কোটি টাকার অনিয়ম করে আলোচিত হন। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আর লিফটকাণ্ডে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা বাসিন্দা আব্দুল করিম। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) রয়েছে ড. আনোয়ার হোসেনের দুর্নীতির ফাইল।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেরে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ ও সরকার পতনের পর থেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। কোথাও কোথাও পদত্যাগ করেছেন প্রক্টর, প্রভোস্টসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রায় সবাই। তবে দুর্নীতির অভিযুক্ত যবিপ্রবির ভাইস চ্যান্সেলর পদত্যাগ না করায় হতবাক ও ক্ষুদ্ধ হয়েছেন অনেকে। ফলে বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থী ভিসি ও ভিসির অনুসারী হিসাবে পরিচিত ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, হল প্রভোস্ট, প্রক্টর, রিজেন্ট বোর্ড সদস্য ড. ইকবাল কবির জাহিদসহ উপাচার্যের অনুসারীদের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
গত ৭ আগস্ট যবিপ্রবি ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্য বিরোধী শিক্ষকরা জোটবদ্ধ হন। ওই দিন তারা ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড.আনিসুর রহমানের সাথে আনুষ্ঠানকি আলোচনা করেন। আলোচনায় বৈষম্য বিরোধী শিক্ষকরা ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের নানা অনিয়ম দুর্নীতর বিষয় তুলে ধরেন। ভিসির পছন্দের শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রামরাজত্ব কায়েম করেন বলেও বৈষম্য বিরোধীরা দাবি করেন।
গত ১০ আগস্ট ড. আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্যাতিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। যদিও একটি পক্ষ তাদের বিক্ষোভ সমাবেশ পন্ড করে দেন। এরপর ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা।
তারা গত ১৩ আগস্ট ভিসি ও তার অনুসারীদের পদত্যাগের দুই ঘন্টারও বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এসময় ভিসিকে সাবেক প্রধান মন্ত্রীর দালাল আখ্যায়িত মিছিল বের করা হয়। ক্যাম্পাসে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল, শেখ হাসিনা ম্যুরাল ভাংচুর করে তারা।
পরের দিন ১৪ আগস্ট ফের বিক্ষোভ মিছিল (‘মার্চ টু প্রশাসনিক ভবন’) করে শিক্ষার্থীরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন বলে ক্ষমতার জানান দেয়া ড. আনোয়ার হোসেনকে ১৭ আগস্ট শনিবারের মধ্যে তাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্য তিনি ও তার অনুসারীরা পদত্যাগ না করায় আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
এদিন দুপুর ১২ টার দিকে যবিপ্রবির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাডেমিক ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। পরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। পরে তারা ভিসির বাসভবন ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা দেয়। এসময় ভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, হল প্রভোস্ট, প্রক্টর, রিজেন্ট বোর্ড সদস্য ড. ইকবাল কবির জাহিদের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি আনোয়ার স্বৈরাচারী কায়দায় এই বিশ্ববিদ্যালয় চালিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোন কাজ নেই তিনি অনিয়ম দুনীর্তি করেছেন। এই দুনীর্তি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চক্র তৈরি করেছে। বিভিন্ন সময়ে যারা প্রতিবাদ করেছে, সেই শিক্ষক, কর্মচারী শিক্ষার্থীদের তিনি গোয়েন্দা সংস্থার লোক, পুলিশ দিয়ে আমাদের হয়রানি ও নাজেহাল করেছেন তিনি। তাই গত দুদিন আগে তাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম আমরা। তবে সেই আল্টিমেটামের পরেও তিনি পদত্যাগ না করায় আজ তালা এবং শাটডাউন ঘোষণা করেছি।
পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ উসামাহ বলেন, আমাদের একটাই দাবি আমরা স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের মদদপুষ্ট দালাল ভিসি আমরা চাইনা কারণ উনি কখনোই শিক্ষার্থীবান্ধব উপাচার্য ছিলেন না। আমরা উপাচার্যসহ সকল দালাল সিন্ডিকেটকে বলতে চাই আপনারা স্বসম্মানে পদত্যাগ করুন।
ফিজিওথ্যারাপি এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের শিক্ষার্থী ফরিদ হাসান বলেন, এই ক্যাম্পাসে যে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী যারা দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরী নিয়েছেন তাদেরকেও স্বসম্মানে পদত্যাগের দাবি জানায়। শিক্ষার্থীদের পূর্ণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষনাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় তাই আমরা এই ক্যাম্পাসে কোন ধরণের রাজনীতি চাই না।
একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শিক্ষার্থী আকিব ইবনে সাইদ বলেন, পদত্যাগের বিষয়ে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। আমরা সেই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকদেরকেও ছেড়ে দেবো না যারা ডিনস্ কমিটিতে বসে শিক্ষার্থীদের সাথে অমানবিক আচরণ করেছে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায় সেই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকরা আধিপত্য দেখায়। আজ শিক্ষার্থীরা রাজপথে তাদেরকে আধিপত্য দেখাবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী কারো বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির খোজ পাওয়া গেলে তাকে ছেড়ে দেবে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতিবাজ ভিসি এবং শিক্ষকরা আপনারা স্ব সম্মানে পদত্যাগ করুন।
























