০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে যশোরবাসী

টানা বৃষ্টিতে যশোর শহরের কয়েকটি এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু রাস্তা ও বাড়ি পানিতে থৈ থৈ করছে। এতে জনজীবনে দুর্ভোগে বেড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতে শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷ হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়িঘরের ভেতরেও পানি প্রবেশ করে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায়  ১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ‘আরসিসি’ ড্রেন কোন কাজে আসছেনা। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণের কারণে ঠিকমতো পানি নিষ্কাশিত হয়না।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের ফলে যশোরে গত দুইদিন ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জেলায় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।  আর রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর)
দুপুর পর্যন্ত ১০৮ মিলিমিটার মাত্রার বৃষ্টিপাত হয়। আরও একদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের খড়কি এলাকার শাহ্ আবদুল করিম সড়ক, স্টেডিয়াম পাড়া, শহরের পিটিআই, নাজির শংকরপুর, খড়কি রূপকথা মোড় থেকে রেললাইন, ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে পাইপপট্টি, বেজপাড়া চিরুনিকল, মিশনপাড়া, বিমানবন্দর রোড ও ষষ্ঠীতলাপাড়ার বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়াও শহরের ছোট ছোট সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এসব সড়কের দুই পাশের ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত নোংরা পানি উপচে পড়েছে সড়কে। সড়ক ছাপিয়ে সেই পানি ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। পৌরসভার ৫,৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বসতঘরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে আছেন এসব ওয়ার্ডের মানুষেরা।
যশোর পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে আনুমানিক ৭ বছর আগে সিআরডিপি (সিটি রিজন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট) ও ইউজিপআইআই-৩ (তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ সেক্টর প্রকল্প) প্রকল্পের মাধ্যমে  ড্রেন নির্মাণ হয়। এতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। এছাড়াও কাঁচা-পাকা মিলিয়ে শহরে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার জুড়ে ড্রেন রয়েছে। মানুষের সচেনতার অভাবে ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারি বৃষ্টি হলেই যশোর শহরের অন্তত ৩০টি সড়কে পানি জমে যায়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ড্রেনের বেশির ভাগের (ঢাল) ঠিক নেই। যার কারণে এগুলো দিয়ে পানি গড়ায় না। ড্রেনের ভেতর পানি স্থির হয়ে জমে থাকে। ফলে বৃষ্টি হলে ড্রেন উপচে পড়ে। বৃষ্টির ও ড্রেনের কাদাপানি একাকার হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে যায়। শহরের বেশির ভাগ বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্যের ট্যাংকিগুলি পাইপ দিয়ে ড্রেনের সাথে যুক্ত। ফলে যখন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তখন ড্রেন থেকে কাদা ও মল মিশ্রিত বর্জ্যে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের বেজপাড়ার বাসিন্দা নির্মল রায় ও কাজী দেলোয়ার জানান, পৌর কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের জন্য স্থানীয়দের মতামত প্রাধান্য দেয় না। সুনিদিষ্ট পরিকল্পনাও নেয় না। তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে ড্রেন পরিস্কার না করায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একারণে বৃষ্টি হলে পানি বের হতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
শংকরপুর এলাকার রহমত আলী, রাজেশ, গোলাম রসুল ও সুইট হাসান জানিয়েছেন, রাস্তায় হাঁটু পানি জমেছে। বাড়িঘরে পানি উঠেছে।  জলাবদ্ধতার কারণে তারা দুর্ভোগে রয়েছেন। তারা আরও জানান, শংকরপুর এলাকার মানুষ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা সমস্যায় ভুগছেন। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণের কারণে সমস্যা লেগেই আছে। তারা আরও জানান, পয়োনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে শহরের পানি হরিণার বিল দিয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যেত। কিন্তু ২০১০ সালে হরিণার বিলে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। এরপর আশপাশে আরো অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে বিল দিয়ে পানি আগের মতো নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। খাল বেদখল, পর্যাপ্ত নর্দমার অভাব ও বক্সড্রেনের নামে খাল নালা হত্যাসহ নানা কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিনেও পৌরসভা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে পারেনি। তাই বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবতে হয়  শহরের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু জানিয়েছেন, মেডিকেল কলেজ নির্মাণ হওয়ার কারণে পৌরসভার পানি নিষ্কাশন হরিণার বিল দিয়ে ঠিকভাবে নিষ্কাশন হচ্ছে না। পৌরসভার ৬,৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পানি বেজপাড়া ছোটনের মোড় দিয়ে সরাসির হরিণার বিলে গিয়ে নামতো। কিন্তু মেডিকেল কলেজ নির্মাণ হওয়ায় সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেই পানি শংকরপুর টার্মিনাল হয়ে অনেক ঘুরে হরিনার বিলে পড়ছে। ফলে ঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। যে কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান জানিয়েছেন, মানুষের অসচেতনতার কারণেও ড্রেনের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তা, ড্রেন সংস্কার ও নির্মাণের জন্য এমজিএসপি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে সংযোগ খাল স্থাপন হলে শহরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে অনেকটা মুক্তি পাবে।
জনপ্রিয় সংবাদ

বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে যশোরবাসী

আপডেট সময় : ০৫:০৪:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
টানা বৃষ্টিতে যশোর শহরের কয়েকটি এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু রাস্তা ও বাড়ি পানিতে থৈ থৈ করছে। এতে জনজীবনে দুর্ভোগে বেড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতে শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷ হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়িঘরের ভেতরেও পানি প্রবেশ করে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায়  ১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ‘আরসিসি’ ড্রেন কোন কাজে আসছেনা। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণের কারণে ঠিকমতো পানি নিষ্কাশিত হয়না।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের ফলে যশোরে গত দুইদিন ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জেলায় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।  আর রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর)
দুপুর পর্যন্ত ১০৮ মিলিমিটার মাত্রার বৃষ্টিপাত হয়। আরও একদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের খড়কি এলাকার শাহ্ আবদুল করিম সড়ক, স্টেডিয়াম পাড়া, শহরের পিটিআই, নাজির শংকরপুর, খড়কি রূপকথা মোড় থেকে রেললাইন, ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে পাইপপট্টি, বেজপাড়া চিরুনিকল, মিশনপাড়া, বিমানবন্দর রোড ও ষষ্ঠীতলাপাড়ার বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়াও শহরের ছোট ছোট সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এসব সড়কের দুই পাশের ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত নোংরা পানি উপচে পড়েছে সড়কে। সড়ক ছাপিয়ে সেই পানি ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। পৌরসভার ৫,৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বসতঘরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে আছেন এসব ওয়ার্ডের মানুষেরা।
যশোর পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে আনুমানিক ৭ বছর আগে সিআরডিপি (সিটি রিজন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট) ও ইউজিপআইআই-৩ (তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ সেক্টর প্রকল্প) প্রকল্পের মাধ্যমে  ড্রেন নির্মাণ হয়। এতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। এছাড়াও কাঁচা-পাকা মিলিয়ে শহরে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার জুড়ে ড্রেন রয়েছে। মানুষের সচেনতার অভাবে ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারি বৃষ্টি হলেই যশোর শহরের অন্তত ৩০টি সড়কে পানি জমে যায়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ড্রেনের বেশির ভাগের (ঢাল) ঠিক নেই। যার কারণে এগুলো দিয়ে পানি গড়ায় না। ড্রেনের ভেতর পানি স্থির হয়ে জমে থাকে। ফলে বৃষ্টি হলে ড্রেন উপচে পড়ে। বৃষ্টির ও ড্রেনের কাদাপানি একাকার হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে যায়। শহরের বেশির ভাগ বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্যের ট্যাংকিগুলি পাইপ দিয়ে ড্রেনের সাথে যুক্ত। ফলে যখন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তখন ড্রেন থেকে কাদা ও মল মিশ্রিত বর্জ্যে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের বেজপাড়ার বাসিন্দা নির্মল রায় ও কাজী দেলোয়ার জানান, পৌর কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের জন্য স্থানীয়দের মতামত প্রাধান্য দেয় না। সুনিদিষ্ট পরিকল্পনাও নেয় না। তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে ড্রেন পরিস্কার না করায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একারণে বৃষ্টি হলে পানি বের হতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
শংকরপুর এলাকার রহমত আলী, রাজেশ, গোলাম রসুল ও সুইট হাসান জানিয়েছেন, রাস্তায় হাঁটু পানি জমেছে। বাড়িঘরে পানি উঠেছে।  জলাবদ্ধতার কারণে তারা দুর্ভোগে রয়েছেন। তারা আরও জানান, শংকরপুর এলাকার মানুষ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা সমস্যায় ভুগছেন। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণের কারণে সমস্যা লেগেই আছে। তারা আরও জানান, পয়োনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে শহরের পানি হরিণার বিল দিয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যেত। কিন্তু ২০১০ সালে হরিণার বিলে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। এরপর আশপাশে আরো অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে বিল দিয়ে পানি আগের মতো নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। খাল বেদখল, পর্যাপ্ত নর্দমার অভাব ও বক্সড্রেনের নামে খাল নালা হত্যাসহ নানা কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিনেও পৌরসভা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে পারেনি। তাই বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবতে হয়  শহরের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু জানিয়েছেন, মেডিকেল কলেজ নির্মাণ হওয়ার কারণে পৌরসভার পানি নিষ্কাশন হরিণার বিল দিয়ে ঠিকভাবে নিষ্কাশন হচ্ছে না। পৌরসভার ৬,৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পানি বেজপাড়া ছোটনের মোড় দিয়ে সরাসির হরিণার বিলে গিয়ে নামতো। কিন্তু মেডিকেল কলেজ নির্মাণ হওয়ায় সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেই পানি শংকরপুর টার্মিনাল হয়ে অনেক ঘুরে হরিনার বিলে পড়ছে। ফলে ঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। যে কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান জানিয়েছেন, মানুষের অসচেতনতার কারণেও ড্রেনের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তা, ড্রেন সংস্কার ও নির্মাণের জন্য এমজিএসপি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে সংযোগ খাল স্থাপন হলে শহরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে অনেকটা মুক্তি পাবে।