০২:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পুরোদমে চালুর উদ্যোগ

আমদানি-রপ্তানি পণ্য সমানতালে হ্যান্ডলিংয়ের চেষ্টা । বসছে স্ক্যানার, কী গ্যান্ট্রি ক্রেনও
আসবে
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল
(পিসিটি) পুরোদমে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি
আমদানি পণ্যবোঝাই কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য টার্মিনালটিতে স্ক্যানার স্থাপন করা
হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি বিদেশি জাহাজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে আমদানি পণ্য বোঝাই
শতাধিক কন্টেনার খালাস করা হয়েছে। আমদানি পণ্যের কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম
পুরোদমে শুরু করার আগে টার্মিনালটির কোন কোন পয়েন্টে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া
জরুরি তা চিহ্নিত করতে কাজ চলছে। কী গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট
বহরও গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। পিসিটিতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায়
যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনাল
হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পিসিটি। চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের পাশ থেকে
বোট ক্লাব পর্যন্ত আগের বিমানবন্দর সড়কের বাঁকগুলো সোজা করে উদ্ধার করা নদীপাড়ের
৩২ একর জায়গায় পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এই টার্মিনালের
তিনটি জেটিতে চট্টগ্রাম বন্দরের এযাবত কালের সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোকে
অনায়াসে বার্থিং দেওয়া যাবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বাড়তি গভীরতার পাশাপাশি
চ্যানেলে কোনো বাঁক না থাকায় পিসিটি বড় জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধা পাবে। এই
টার্মিনালে ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের এবং ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ
ভিড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে এনসিটি, সিসিটির দূরত্ব
১৪–১৫ কিলোমিটার। আর পিসিটির দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। এটা বন্দরের বিদ্যমান
টার্মিনালগুলোর তুলনায় পিসিটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর র্কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা
ব্যয়ে টার্মিনালটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার
কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ই–ইঞ্জিনিয়ারিং এটির নির্মাণ
কাজ সম্পন্ন করে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও নানা কারণে
পিসিটি চালু হয়নি। পরে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সৌদি আরবের
রেড সী গেটওয়ে লিমিটেডের সাথে গত বছরের ডিসেম্বরে টার্মিনালটি পরিচালনার
ব্যাপারে চুক্তি হয়। গত ৮ জুন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পিসিটিতে জাহাজ
বার্থিং এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের অনুমোদন প্রদান করে।
সরকারি অনুমোদন মিললেও ইকুইপমেন্ট সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য পতেঙ্গা
কন্টেনার টার্মিনালে পুরোদমে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে কী গ্যান্ট্রি
ক্রেন না থাকায় এই টার্মিনালে কেবলমাত্র গিয়ার্ড ভ্যাসেল (নিজস্ব ক্রেন আছে এমন
জাহাজ) অপারেট করা হচ্ছে। জাহাজের ক্রেন দিয়ে রপ্তানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার
জাহাজিকরণ করা হয়। স্ক্যানার স্থাপন না করাসহ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৯ মাস
ধরে চালু হওয়া টার্মিনালটিতে আমদানি পণ্যবোঝাই হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়নি।
মার্কস লাইনের জাহাজগুলোই মূলত এই টার্মিনালটি ব্যবহার করছে। বিদেশ থেকে পণ্য
নিয়ে আসা এসব জাহাজ বন্দরের জেসিবি, সিসিটি কিংবা এনসিটির কোনো
জেটিতে বার্থিং নিয়ে আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার খালাস করে। পরে জাহাজটি

প্রথমে বার্থিং নেওয়া জেটি থেকে বের হয়ে পিসিটিতে যায় এবং সেখান থেকে
রপ্তানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার নিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা কলম্বোর পথ ধরে।
শুধুমাত্র রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং করে একটি টার্মিনাল চলতে পারে না বলে মন্তব্য করে সূত্র
বলেছে, পিসিটি সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সমানতালে আমদানি–রপ্তানি পণ্য
হ্যান্ডলিংয়ের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে এই টার্মিনালের জন্য স্ক্যানার আনা হয়েছে। যা
স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে। আগামী বছরের শুরুতে পিসিটিতে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন
স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা গেলে শুধুমাত্র গিয়ার্ড
ভ্যাসেলের ওপর যে নির্ভরতা তা থেকেও নিস্তার পাওয়া যাবে।
আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে নানা প্রক্রিয়া জড়িত। বন্দর ছাড়াও কাস্টমস,
সিকিউরিটি, ব্যাংক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দফতরের
সমন্বিত কর্মকাণ্ডেই বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে
প্রথমবারের মতো বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া
পিসিটিতে স্বাভাবিকভাবে সব কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। কী গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ
বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট আগে অর্ডার দিলেই কেবল তৈরি করা হয়। একেকটি ক্রেন বানাতে
অন্তত এক বছর সময় লাগে। ইতোমধ্যে পিসিটির জন্য ক্রেনের অর্ডার করা হলেও সেগুলো
এসে কার্যক্রম শুরু করতে এ বছর পার হয়ে যাবে। তবে এর আগে জাহাজের ক্রেন দিয়ে
আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিং শুরু করা হবে। গত মাসের ১৬ তারিখে মায়ের্স্ক
লাইনের মায়ের্স্ক ব্লাদিভোস্টক জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যবোঝাই মাত্র ৮টি কন্টেনার
খালাস করা হয়েছিল। গতকাল পিসিটিতে মায়ের্স্ক লাইনের মায়ের্স্ক জিয়াম্যান থেকে
১০৪ কন্টেনার আমদানি পণ্য খালাস করা হয়েছে। এসব কন্টেনারে আমদানিকৃত পণ্য
টার্মিনাল থেকে সরাসরি ডেলিভারি দেওয়া হবে। তাই এগুলো স্ক্যানিং করার প্রয়োজন
নেই বলে সূত্র জানিয়েছে।
পিসিটির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, আমরা সবকিছু গুছিয়ে
আনছি। অচিরেই যাতে আমদানি–রপ্তানি উভয় পণ্য হ্যান্ডলিং করতে পারি সেই লক্ষ্য নিয়ে
অগ্রসর হচ্ছি। দুটি জাহাজ থেকে সামান্য পরিমাণে আমদানি পণ্যের কন্টেনার খালাস
করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ট্রায়াল রান। পুরোদমে কাজ শুরু করতে আমাদেরকে
আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, পিসিটিতে বছরে প্রায় ৫ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। ৩২
একর জায়গায় নির্মিত টার্মিনালটিতে ১৬ একর ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন পশ্চাৎসুবিধা
এবং তিনটি জেটি (৫৮৪ মিটার দীর্ঘ) রয়েছে। জেটি এলাকায় পানির গভীরতা সাড়ে
১১ মিটার হলেও ১০ থেকে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো যাবে। এই
টার্মিনালে ১৯০ মিটার লম্বা ও ১০ বা সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের ৩টি কন্টেনার জাহাজ
একসাথে এবং ২২০ মিটার দীর্ঘ ডলফিন জেটিতে ১টি ভোজ্যতেলবাহী জাহাজ
ভেড়ানো যাবে। তবে ২১০ মিটার বা বেশি ল্যান্থের জাহাজ ২টির বেশি ভিড়ানো যাবে
না। টার্মিনালে ১ লাখ ১২ হাজার বর্গমিটারের আরসিসি পেভমেন্ট (অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড ও
সড়ক), ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার কন্টেনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) শেড, ৬ মিটার
উঁচু ১ হাজার ৭৫০ মিটার কাস্টমস বন্ডেড ওয়াল, ৫ হাজার ৫৮০ বর্গফুটের পোর্ট
অফিস ভবন, ১ হাজার ২০০ বর্গমিটারের যান্ত্রিক ও মেরামত কারখানাসহ বিভিন্ন
অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ টার্মিনাল হিসেবে পিসিটিকে
গড়ে তোলা হয়েছে।
টার্মিনালটিকে পুরোদমে চালু করতে কমপক্ষে ৪টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি),
৮টি রাবার টায়ার্‌ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি), ৪টি স্ট্রাডেল ক্যারিয়ার, ৪টি রিচ স্ট্যাকার,
১টি রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরএমজি), ৪টি লো–মাস্ট ফর্ক লিফট, ২টি ফায়ার
ট্রাক, ১টি ফায়ার কার, ৩টি নিরাপত্তা পেট্রোল কার, ১টি অ্যাম্বুলেন্স, ৫০ টনের দুটি
টাগ বোট, ২টি পাইলট বোট, ২টি ফার্স্ট স্পিড বোটসহ অন্তত ৮শ কোটি টাকার
ইকুইপমেন্ট লাগবে। রেড সী গেটওয়ে এই টার্মিনালের প্রয়োজনীয় সব ইকুইপমেন্ট

ক্রয় করবে। তারা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ২২ বছর এই টার্মিনাল পরিচালনা
করবে। এরপর ইকুইপমেন্টসহ বন্দরটি যেভাবে থাকে তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট
হস্তান্তর করা হবে বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে।
বন্দরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, পিসিটি পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে না পারলেও
আরএসজিটিআই চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাশুল পরিশোধ করছে। মাসে কমপক্ষে আড়াই
লাখ কন্টেনার হ্যান্ডলিং করার ট্যারিফ প্রদান করার কথা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে বন্দর
কর্তৃপক্ষ এক লাখ ডলারের মতো ট্যারিফ পাচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পুরোদমে চালুর উদ্যোগ

আপডেট সময় : ০৪:২৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫

আমদানি-রপ্তানি পণ্য সমানতালে হ্যান্ডলিংয়ের চেষ্টা । বসছে স্ক্যানার, কী গ্যান্ট্রি ক্রেনও
আসবে
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল
(পিসিটি) পুরোদমে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি
আমদানি পণ্যবোঝাই কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য টার্মিনালটিতে স্ক্যানার স্থাপন করা
হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি বিদেশি জাহাজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে আমদানি পণ্য বোঝাই
শতাধিক কন্টেনার খালাস করা হয়েছে। আমদানি পণ্যের কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম
পুরোদমে শুরু করার আগে টার্মিনালটির কোন কোন পয়েন্টে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া
জরুরি তা চিহ্নিত করতে কাজ চলছে। কী গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট
বহরও গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। পিসিটিতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায়
যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনাল
হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পিসিটি। চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের পাশ থেকে
বোট ক্লাব পর্যন্ত আগের বিমানবন্দর সড়কের বাঁকগুলো সোজা করে উদ্ধার করা নদীপাড়ের
৩২ একর জায়গায় পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এই টার্মিনালের
তিনটি জেটিতে চট্টগ্রাম বন্দরের এযাবত কালের সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোকে
অনায়াসে বার্থিং দেওয়া যাবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বাড়তি গভীরতার পাশাপাশি
চ্যানেলে কোনো বাঁক না থাকায় পিসিটি বড় জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধা পাবে। এই
টার্মিনালে ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের এবং ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ
ভিড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে এনসিটি, সিসিটির দূরত্ব
১৪–১৫ কিলোমিটার। আর পিসিটির দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। এটা বন্দরের বিদ্যমান
টার্মিনালগুলোর তুলনায় পিসিটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর র্কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা
ব্যয়ে টার্মিনালটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার
কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ই–ইঞ্জিনিয়ারিং এটির নির্মাণ
কাজ সম্পন্ন করে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও নানা কারণে
পিসিটি চালু হয়নি। পরে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সৌদি আরবের
রেড সী গেটওয়ে লিমিটেডের সাথে গত বছরের ডিসেম্বরে টার্মিনালটি পরিচালনার
ব্যাপারে চুক্তি হয়। গত ৮ জুন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পিসিটিতে জাহাজ
বার্থিং এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের অনুমোদন প্রদান করে।
সরকারি অনুমোদন মিললেও ইকুইপমেন্ট সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য পতেঙ্গা
কন্টেনার টার্মিনালে পুরোদমে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে কী গ্যান্ট্রি
ক্রেন না থাকায় এই টার্মিনালে কেবলমাত্র গিয়ার্ড ভ্যাসেল (নিজস্ব ক্রেন আছে এমন
জাহাজ) অপারেট করা হচ্ছে। জাহাজের ক্রেন দিয়ে রপ্তানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার
জাহাজিকরণ করা হয়। স্ক্যানার স্থাপন না করাসহ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৯ মাস
ধরে চালু হওয়া টার্মিনালটিতে আমদানি পণ্যবোঝাই হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়নি।
মার্কস লাইনের জাহাজগুলোই মূলত এই টার্মিনালটি ব্যবহার করছে। বিদেশ থেকে পণ্য
নিয়ে আসা এসব জাহাজ বন্দরের জেসিবি, সিসিটি কিংবা এনসিটির কোনো
জেটিতে বার্থিং নিয়ে আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার খালাস করে। পরে জাহাজটি

প্রথমে বার্থিং নেওয়া জেটি থেকে বের হয়ে পিসিটিতে যায় এবং সেখান থেকে
রপ্তানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার নিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা কলম্বোর পথ ধরে।
শুধুমাত্র রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং করে একটি টার্মিনাল চলতে পারে না বলে মন্তব্য করে সূত্র
বলেছে, পিসিটি সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সমানতালে আমদানি–রপ্তানি পণ্য
হ্যান্ডলিংয়ের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে এই টার্মিনালের জন্য স্ক্যানার আনা হয়েছে। যা
স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে। আগামী বছরের শুরুতে পিসিটিতে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন
স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা গেলে শুধুমাত্র গিয়ার্ড
ভ্যাসেলের ওপর যে নির্ভরতা তা থেকেও নিস্তার পাওয়া যাবে।
আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে নানা প্রক্রিয়া জড়িত। বন্দর ছাড়াও কাস্টমস,
সিকিউরিটি, ব্যাংক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দফতরের
সমন্বিত কর্মকাণ্ডেই বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে
প্রথমবারের মতো বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া
পিসিটিতে স্বাভাবিকভাবে সব কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। কী গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ
বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট আগে অর্ডার দিলেই কেবল তৈরি করা হয়। একেকটি ক্রেন বানাতে
অন্তত এক বছর সময় লাগে। ইতোমধ্যে পিসিটির জন্য ক্রেনের অর্ডার করা হলেও সেগুলো
এসে কার্যক্রম শুরু করতে এ বছর পার হয়ে যাবে। তবে এর আগে জাহাজের ক্রেন দিয়ে
আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিং শুরু করা হবে। গত মাসের ১৬ তারিখে মায়ের্স্ক
লাইনের মায়ের্স্ক ব্লাদিভোস্টক জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যবোঝাই মাত্র ৮টি কন্টেনার
খালাস করা হয়েছিল। গতকাল পিসিটিতে মায়ের্স্ক লাইনের মায়ের্স্ক জিয়াম্যান থেকে
১০৪ কন্টেনার আমদানি পণ্য খালাস করা হয়েছে। এসব কন্টেনারে আমদানিকৃত পণ্য
টার্মিনাল থেকে সরাসরি ডেলিভারি দেওয়া হবে। তাই এগুলো স্ক্যানিং করার প্রয়োজন
নেই বলে সূত্র জানিয়েছে।
পিসিটির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, আমরা সবকিছু গুছিয়ে
আনছি। অচিরেই যাতে আমদানি–রপ্তানি উভয় পণ্য হ্যান্ডলিং করতে পারি সেই লক্ষ্য নিয়ে
অগ্রসর হচ্ছি। দুটি জাহাজ থেকে সামান্য পরিমাণে আমদানি পণ্যের কন্টেনার খালাস
করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ট্রায়াল রান। পুরোদমে কাজ শুরু করতে আমাদেরকে
আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, পিসিটিতে বছরে প্রায় ৫ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। ৩২
একর জায়গায় নির্মিত টার্মিনালটিতে ১৬ একর ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন পশ্চাৎসুবিধা
এবং তিনটি জেটি (৫৮৪ মিটার দীর্ঘ) রয়েছে। জেটি এলাকায় পানির গভীরতা সাড়ে
১১ মিটার হলেও ১০ থেকে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো যাবে। এই
টার্মিনালে ১৯০ মিটার লম্বা ও ১০ বা সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের ৩টি কন্টেনার জাহাজ
একসাথে এবং ২২০ মিটার দীর্ঘ ডলফিন জেটিতে ১টি ভোজ্যতেলবাহী জাহাজ
ভেড়ানো যাবে। তবে ২১০ মিটার বা বেশি ল্যান্থের জাহাজ ২টির বেশি ভিড়ানো যাবে
না। টার্মিনালে ১ লাখ ১২ হাজার বর্গমিটারের আরসিসি পেভমেন্ট (অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড ও
সড়ক), ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার কন্টেনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) শেড, ৬ মিটার
উঁচু ১ হাজার ৭৫০ মিটার কাস্টমস বন্ডেড ওয়াল, ৫ হাজার ৫৮০ বর্গফুটের পোর্ট
অফিস ভবন, ১ হাজার ২০০ বর্গমিটারের যান্ত্রিক ও মেরামত কারখানাসহ বিভিন্ন
অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ টার্মিনাল হিসেবে পিসিটিকে
গড়ে তোলা হয়েছে।
টার্মিনালটিকে পুরোদমে চালু করতে কমপক্ষে ৪টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি),
৮টি রাবার টায়ার্‌ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি), ৪টি স্ট্রাডেল ক্যারিয়ার, ৪টি রিচ স্ট্যাকার,
১টি রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরএমজি), ৪টি লো–মাস্ট ফর্ক লিফট, ২টি ফায়ার
ট্রাক, ১টি ফায়ার কার, ৩টি নিরাপত্তা পেট্রোল কার, ১টি অ্যাম্বুলেন্স, ৫০ টনের দুটি
টাগ বোট, ২টি পাইলট বোট, ২টি ফার্স্ট স্পিড বোটসহ অন্তত ৮শ কোটি টাকার
ইকুইপমেন্ট লাগবে। রেড সী গেটওয়ে এই টার্মিনালের প্রয়োজনীয় সব ইকুইপমেন্ট

ক্রয় করবে। তারা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ২২ বছর এই টার্মিনাল পরিচালনা
করবে। এরপর ইকুইপমেন্টসহ বন্দরটি যেভাবে থাকে তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট
হস্তান্তর করা হবে বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে।
বন্দরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, পিসিটি পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে না পারলেও
আরএসজিটিআই চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাশুল পরিশোধ করছে। মাসে কমপক্ষে আড়াই
লাখ কন্টেনার হ্যান্ডলিং করার ট্যারিফ প্রদান করার কথা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে বন্দর
কর্তৃপক্ষ এক লাখ ডলারের মতো ট্যারিফ পাচ্ছে।