১২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বৈশাখী আয়োজনে বাধা নিস্প্রাণ ডিসি হিলে শুধুই হাহাকার

পহেলা বৈশাখ মানেই নগরের ডিসি হিলে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আয়োজন। প্রতিবছর এদিনে
বর্ষবরণ-বর্ষবিদায়ের জম্পেশ অনুষ্ঠানে ঢল নামে মানুষের। আশপাশের এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়
জনজট। কিন্তু এবার পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। নেই কোনো নাচ-গান, আবৃত্তি, কবিগান, কথামালা,
আলোচনা। নেই কোনো জনসমাগম। অনুষ্ঠানের আগের দিন সন্ধ্যারাতে একদল লোক মিছিল নিয়ে
ভাঙচুর করে অনুষ্ঠানমঞ্চ। ফলে আয়োজকরা বাতিল করেন আজকের বৈশাখী অনুষ্ঠান। ৪৭ বছরে
চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের মিলনমেলায় রূপ নেওয়া এই ডিসি হিলে সোমবার ছিল শুধুই
হাহাকার।সোমবার (১৪ এপ্রিল) দুপুর তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত ডিসি হিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়,
ফাঁকা পড়ে আছে মঞ্চ। মঞ্চের এককোণার ছায়াশীতল জায়গায় ঘুমিয়ে আছেন গৃহহীন একজন বৃদ্ধ।
কিছু মানুষ এসে বসেছেন স্থায়ী আসনে। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার নিয়ে অনেকে এসে সময় কাটাচ্ছেন
ডিসি হিল এলাকায়। অনেকে আবার এসে ফিরে যাচ্ছেন অন্য কোথাও। নন্দনকানন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ
বিহারের সামনে থেকে পাহাড়িকা স্কুল পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে আইসক্রিম, রকমারি খাবার, খেলনা
এবং বেত ও মাটির গৃহস্থালী সামগ্রী নিয়ে বসেছেন ভাসমান দোকানিরা। কোনো আয়োজন না থাকায়
বেচাবিক্রি নেই। আফসোস সবার। কার্তিক নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘গতকাল
অফিস শেষ করে বাসায় গিয়ে বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে নিউজ দেখা হয়নি। তাই এখানে কোনো
অনুষ্ঠান না হওয়ার কথাটা জানতাম না। দুপুরে খেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে আসলাম। দেখি কোনো আয়োজন
নেই। বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কয়েকটা লোকের কারণে যদি আয়োজন বন্ধ করে দিতে হয়,
তাহলে প্রশাসনের কাজ কী? বিচ্ছিন্ন কিছু লোকের কারণে যদি আমাদের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়,
তাহলে বুঝে নিতে হবে, হেরে যাচ্ছে সুস্থ সংস্কৃতি।’সাখাওয়াত নামে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী
বলেন, ‘আমরা এতোগুলো মানুষ ডিসি হিলে এসেছি, আমাদের সংস্কৃতির আয়োজনে অংশ নিতে। যারা
এ আয়োজন চায় না, তারা এ দেশের ভালো চায় না। আর আমরা যদি তাদের বিপরীতে দাঁড়াতে না পারি
তাহলে তাদেরই তো জয় হলো।’কামরুল নামে একজন আইনজীবী বলেন, ‘যতদূর মনে পড়ে করোনার
সময় ডিসি হিলে আয়োজন বন্ধ ছিল। যথেষ্ট যৌক্তিক কারণে বন্ধ রাখা হলেও আমাদের তা মেনে
নিতে কষ্ট হয়েছে। আর এবার খারাপ কিছু না হওয়ার আতঙ্কে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি মেনে নিতে
কষ্ট হচ্ছে। নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে হলেও আয়োজন করা দরকার ছিল। কত আনন্দ নিয়ে আমরা
আসলাম। কিন্তু অনুষ্ঠান না থাকায় একটু ঘুরে এখন সিআরবি চলে যাচ্ছি।’শিক্ষিকা শ্রবণী বলেন,
‘আয়োজন নেই। এটি ভাবতেই অবাক লাগে। আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যদি এক হতো,
তাহলে ডিসি হিলের অনুষ্ঠান না হওয়ার বিষয়টি সবার খারাপ লাগতো। এখন অনেকে সিআরবিতে
তাদের মতো অনুষ্ঠান করছে। অনুষ্ঠান করবে। কিন্তু তারা চাইলে ডিসি হিলের আয়োজনটাও সফল
করতে পারতো।’ঘর সাজানোর মাটির জিনিস বিক্রি করতে আসা রফিক বলেন, ‘আমরাতো এই দিনে
বিক্রি করার জন্য একটা বাজেট করে এসেছি। কিন্তু বেচাবিক্রি হচ্ছে না বললেই চলে। আগে এই
সময়ের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি করতাম। এবার এখনও দুইশ টাকা বিক্রি করতে
পারিনি।’বেত ও তাল পাতার পাখা বিক্রেতা বেলাল বলেন, ‘গরমে সবাই পাখা কিনতো। এবার গরম
আছে, কিন্তু কেউ কিনছেন না। যা এনেছি, তা থেকেই যাবে। ঘণ্টা খানেকপর আমিও চলে যাবো।
বলীখেলার মেলা যদি হয়, সেখানেই বিক্রি করতে হবে এসব।’
আলপনা শিল্পী রূপায়ন বলেন, ‘কেউ হাতে বা মুখে আলপনা আঁকতে চাচ্ছে না। আগে কতজনের মুখে
ও হাতে ‘শুভ নববর্ষ’ লিখেছি। অথচ এবার এখনও ১০ জন মানুষ জোটাতে পারিনি।’

ডিসি হিলের মূল ফটকে দায়িত্বে থাকা উপ-পরিদর্শক রবিউল বলেন, ‘অনুষ্ঠান না হলেও অনেকে
বিষয়টি জানেন না। এরপরও মানুষ অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি আসছে। তাই তাদের নিরাপত্তার
কথা ভেবে আমাদের থাকতে বলা হয়েছে। কোনো সমস্যা নেই। সব ঠিকঠাক আছে। অনুষ্ঠান না
হওয়ায় অনেকে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

বৈশাখী আয়োজনে বাধা নিস্প্রাণ ডিসি হিলে শুধুই হাহাকার

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৫

পহেলা বৈশাখ মানেই নগরের ডিসি হিলে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আয়োজন। প্রতিবছর এদিনে
বর্ষবরণ-বর্ষবিদায়ের জম্পেশ অনুষ্ঠানে ঢল নামে মানুষের। আশপাশের এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়
জনজট। কিন্তু এবার পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। নেই কোনো নাচ-গান, আবৃত্তি, কবিগান, কথামালা,
আলোচনা। নেই কোনো জনসমাগম। অনুষ্ঠানের আগের দিন সন্ধ্যারাতে একদল লোক মিছিল নিয়ে
ভাঙচুর করে অনুষ্ঠানমঞ্চ। ফলে আয়োজকরা বাতিল করেন আজকের বৈশাখী অনুষ্ঠান। ৪৭ বছরে
চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের মিলনমেলায় রূপ নেওয়া এই ডিসি হিলে সোমবার ছিল শুধুই
হাহাকার।সোমবার (১৪ এপ্রিল) দুপুর তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত ডিসি হিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়,
ফাঁকা পড়ে আছে মঞ্চ। মঞ্চের এককোণার ছায়াশীতল জায়গায় ঘুমিয়ে আছেন গৃহহীন একজন বৃদ্ধ।
কিছু মানুষ এসে বসেছেন স্থায়ী আসনে। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার নিয়ে অনেকে এসে সময় কাটাচ্ছেন
ডিসি হিল এলাকায়। অনেকে আবার এসে ফিরে যাচ্ছেন অন্য কোথাও। নন্দনকানন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ
বিহারের সামনে থেকে পাহাড়িকা স্কুল পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে আইসক্রিম, রকমারি খাবার, খেলনা
এবং বেত ও মাটির গৃহস্থালী সামগ্রী নিয়ে বসেছেন ভাসমান দোকানিরা। কোনো আয়োজন না থাকায়
বেচাবিক্রি নেই। আফসোস সবার। কার্তিক নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘গতকাল
অফিস শেষ করে বাসায় গিয়ে বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে নিউজ দেখা হয়নি। তাই এখানে কোনো
অনুষ্ঠান না হওয়ার কথাটা জানতাম না। দুপুরে খেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে আসলাম। দেখি কোনো আয়োজন
নেই। বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কয়েকটা লোকের কারণে যদি আয়োজন বন্ধ করে দিতে হয়,
তাহলে প্রশাসনের কাজ কী? বিচ্ছিন্ন কিছু লোকের কারণে যদি আমাদের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়,
তাহলে বুঝে নিতে হবে, হেরে যাচ্ছে সুস্থ সংস্কৃতি।’সাখাওয়াত নামে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী
বলেন, ‘আমরা এতোগুলো মানুষ ডিসি হিলে এসেছি, আমাদের সংস্কৃতির আয়োজনে অংশ নিতে। যারা
এ আয়োজন চায় না, তারা এ দেশের ভালো চায় না। আর আমরা যদি তাদের বিপরীতে দাঁড়াতে না পারি
তাহলে তাদেরই তো জয় হলো।’কামরুল নামে একজন আইনজীবী বলেন, ‘যতদূর মনে পড়ে করোনার
সময় ডিসি হিলে আয়োজন বন্ধ ছিল। যথেষ্ট যৌক্তিক কারণে বন্ধ রাখা হলেও আমাদের তা মেনে
নিতে কষ্ট হয়েছে। আর এবার খারাপ কিছু না হওয়ার আতঙ্কে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি মেনে নিতে
কষ্ট হচ্ছে। নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে হলেও আয়োজন করা দরকার ছিল। কত আনন্দ নিয়ে আমরা
আসলাম। কিন্তু অনুষ্ঠান না থাকায় একটু ঘুরে এখন সিআরবি চলে যাচ্ছি।’শিক্ষিকা শ্রবণী বলেন,
‘আয়োজন নেই। এটি ভাবতেই অবাক লাগে। আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যদি এক হতো,
তাহলে ডিসি হিলের অনুষ্ঠান না হওয়ার বিষয়টি সবার খারাপ লাগতো। এখন অনেকে সিআরবিতে
তাদের মতো অনুষ্ঠান করছে। অনুষ্ঠান করবে। কিন্তু তারা চাইলে ডিসি হিলের আয়োজনটাও সফল
করতে পারতো।’ঘর সাজানোর মাটির জিনিস বিক্রি করতে আসা রফিক বলেন, ‘আমরাতো এই দিনে
বিক্রি করার জন্য একটা বাজেট করে এসেছি। কিন্তু বেচাবিক্রি হচ্ছে না বললেই চলে। আগে এই
সময়ের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি করতাম। এবার এখনও দুইশ টাকা বিক্রি করতে
পারিনি।’বেত ও তাল পাতার পাখা বিক্রেতা বেলাল বলেন, ‘গরমে সবাই পাখা কিনতো। এবার গরম
আছে, কিন্তু কেউ কিনছেন না। যা এনেছি, তা থেকেই যাবে। ঘণ্টা খানেকপর আমিও চলে যাবো।
বলীখেলার মেলা যদি হয়, সেখানেই বিক্রি করতে হবে এসব।’
আলপনা শিল্পী রূপায়ন বলেন, ‘কেউ হাতে বা মুখে আলপনা আঁকতে চাচ্ছে না। আগে কতজনের মুখে
ও হাতে ‘শুভ নববর্ষ’ লিখেছি। অথচ এবার এখনও ১০ জন মানুষ জোটাতে পারিনি।’

ডিসি হিলের মূল ফটকে দায়িত্বে থাকা উপ-পরিদর্শক রবিউল বলেন, ‘অনুষ্ঠান না হলেও অনেকে
বিষয়টি জানেন না। এরপরও মানুষ অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি আসছে। তাই তাদের নিরাপত্তার
কথা ভেবে আমাদের থাকতে বলা হয়েছে। কোনো সমস্যা নেই। সব ঠিকঠাক আছে। অনুষ্ঠান না
হওয়ায় অনেকে এসে ফিরে যাচ্ছেন।