১২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুর অঞ্চলের নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি পুরুষের এক-তৃতীয়াংশ

কালের পরিক্রমায় কত মে দিবস আসে আবার কত মে দিবস চলে যায়। মে মাসের পর মে
মাস পরিবর্তন হলেও শ্রমিকদের ভার্গ্যরে কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। রংপুর অঞ্চলে কৃষিপ্রধান
অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ কৃষি শ্রমিক। মুই হনু কামলা, সারা দিন কাম দিলে, ভাত
এক গামলা এটি কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের প্রচলিত আঞ্চলিক একটি প্রবাদ। এখানকার কৃষি
শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামেই এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য নিশ্চিত হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠের পর
মাঠ ফসল ফলানোর কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। রোদ-বৃষ্টি-শীত উপেক্ষা করে তাদের শ্রম
কৃষি উৎপাদনের চাকা সচল রাখে। বিপুল শ্রমের বিনিময়ে কৃষি শ্রমিকরা যে মজুরি পান, তা
তাদের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী কৃষি শ্রমিক। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত
প্রতিটি স্তরে তাদের শ্রমও ফসল উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। অথচ পুরুষের সমানতালে কাজ করেও
নারী কৃষি শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। মহান মে দিবস, শ্রমজীবী
মানুষের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে
অর্জিত দিনটি শুধু শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য ও সংহতির প্রতীকই নয়, একই সঙ্গে বিশ্বের সব
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন। প্রতি বছর এই দিনে শিল্প-কারখানার
শ্রমিকদের অধিকারের কথা বিশেষভাবে উচ্চারিত হলেও কৃষিপ্রধান অর্থনীতির অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অংশ কৃষি শ্রমিকরা আলোচনার বাইরে থেকে যান। শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ
এবং সমাজের বিশিষ্টজনরা বলেন, মহান মে দিবসের তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা সব
শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলব। কৃষি শ্রমিকরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং
তাদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের ন্যায্য মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা,
নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান
উন্নয়ন করা সম্ভব। সরকার, কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সব স্তরের
মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কৃষি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গাইবান্ধা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২ হাজার ১৪৩ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার
আয়তনের গাইবান্ধা জেলার ৭টি উপজেলায় ৪টি পৌরসভা এবং ৮২টি ইউনিয়নে গ্রাম রয়েছে ১
হাজার ২৫৫টি। এখানকার জনসংখ্যা ২৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৭১৯ জন। এর মধ্যে শতকরা ৫৪ ভাগ পুরুষ এবং
৪৬ ভাগ নারী। জেলাজুড়ে মোট পরিবার ৬ লক্ষ ১১ হাজার ২৮৩টি। এর মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই কৃষি
পরিবার। জেলার ৬ লক্ষ ১ হাজার ৭২১টি কৃষক পরিবারের মধ্যে শতকরা ৩৮ ভাগই প্রান্তিক কৃষক
পরিবার, ৩১ ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক, ২০ ভাগ ভূমিহীন কৃষক, ৯ ভাগ মাঝারি কৃষক এবং মাত্র ২ ভাগ বড়
কৃষক পরিবার রয়েছে। জেলায় মোট কৃষি পরিবারের মধ্যে বর্গাচাষি পরিবারের সংখ্যা ৭১ হাজার
৭৭২টি। সাত উপজেলায় কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত ৫৫ হাজার ৬৫০ জন কৃষি শ্রমিক রয়েছেন।
গ্রামীণ জনপদে দেখা যায়, কৃষি শ্রমিকরা সাধারণত দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন।
বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিকাজের ধরন ও মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে এই মজুরির কিছুটা তারতম্য দেখা
যায়। তবে সাধারণভাবে তাদের দৈনিক মজুরি অন্য অনেক পেশার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এ সময়ে স্বল্প মজুরি তাদের পরিবারকে দারিদ্র্য
সীমার নিচে রেখে দেয়। অন্যদিকে একই ধরনের কৃষিকাজে নিয়োজিত পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায়
নারী শ্রমিকরা কম মজুরি পান। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা কিংবা বোঝা টানার
মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজেও এই বৈষম্য সু¯পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি পুরুষ
শ্রমিকদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম হয়ে থাকে। এই বৈষম্য শুধু আর্থিক কষ্টের কারণ নয়,
এটি নারী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা এবং ক্ষমতায়নের পথেও একটি বড় বাধা। গাইবান্ধা,
রংপুর, কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা মূলত
কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি এবং এই কৃষিকে সচল রাখেন
কৃষি শ্রমিক। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মান, শ্রমের মর্যাদা এবং অধিকার এখনও বহুলাংশে
উপেক্ষিত। শিল্প শ্রমিকদের জন্য যেমন নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং
ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কৃষি শ্রমিকদের জন্যও এসব
অধিকার অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কৃষি শ্রমিক এখনও দৈনিক ভিত্তিতে কাজ
করেন যাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফসলের মৌসুমের ওপর নির্ভর করে তাদের আয়
অনিশ্চিত থাকে। নেই কোনো নিয়োগপত্র, নেই স্বাস্থ্যসেবা বা সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে
ফসলহানি ঘটলে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও এখনও
অনেক কাজ শ্রমিকনির্ভর। বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই করা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে
কৃষি শ্রমিকের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। তারা জমিতে সার দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও ফসলের
রোগ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও করে থাকেন। এত কঠিন ও শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজ

করার পরও তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্যিই হতাশাজনক। কৃষি শ্রমিকদের কম মজুরির
পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। অনেক
ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য বিক্রি ও শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
ফলে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ফসল ক্রয় করে এবং শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে তারা নিজেরাই
লাভবান হন। এ ছাড়া কৃষকদের আর্থিক অসচ্ছলতা ও দর কষাকষির অভাবের কারণেও শ্রমিকরা ন্যায্য
মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। কৃষি শ্রমিকদের এই দুরবস্থা দেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যতের জন্য অশনি
সংকেত। যদি এই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তবে
ভবিষ্যতে কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যেতে পারে। ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের পেছনেও একাধিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, নারীরা
পুরুষের মতো শারীরিক শ্রম দিতে সক্ষম নন। অথবা তাদের কাজের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। এই
ধারণা প্রচলিত থাকার কারণে নিয়োগকর্তারা নারীদের কম মজুরি দিতে দ্বিধাবোধ করেন।
দ্বিতীয়ত নারী শ্রমিকদের দর কষাকষি করার ক্ষমতা কম থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে
অনেক নারী শ্রমিক কম মজুরিতেও কাজ করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া সংগঠিত শ্রমিক সংগঠনের
অভাব এবং আইনি সুরক্ষার দুর্বলতাও এই বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত কিছু
ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক দৈনিক মজুরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক বা ফসলের একটি অংশের বিনিময়ে কাজ
করেন, যেখানে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়। মজুরি বৈষম্যের
কারণে নারী কৃষি শ্রমকরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাদের সীমিত আয় পরিবারের
ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য যথেষ্ট হয় না। ফলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে
তারা। এ ছাড়াও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার কারণে অনেক নারী শ্রমিক কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে
ফেলেন এবং জীবিকার সন্ধানে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হন। এটি কৃষি উৎপাদনকেও প্রভাবিত করতে
পারে। কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে জাতীয়
কৃষক-ক্ষেতমজুর সমিতি গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ও কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের জেলা
সমন্বয়ক রেবতী বর্মণ বলেন, কৃষি শ্রমিকদের জন্য একটি ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা এবং তা
বাস্তবায়নের জন্য কঠোর নজরদারি রাখা উচিত। সেই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর
জন্য সরাসরি কৃষক এবং শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়াও
কৃষি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি
উদ্যোগে কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, কৃষি শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতির
মেরুদন্ড। তাদের শ্রমের মূল্যায়ন, ন্যায্য মজুরি এবং জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই
আমরা একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই কৃষি খাত গড়ে তুলতে সক্ষম হব। বাাংলাদেশ কৃষক-ক্ষেতমজুর
সংগঠন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহসানুল হাবীব সাঈদ নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য
প্রসঙ্গে বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীর কাজের প্রতি সম্মান জানানোর
মানসিকতা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যম এবং শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে লিঙ্গবৈষম্যমূলক ধারণাগুলো
পরিবর্তন করতে হবে। সেই সঙ্গে নারী কৃষি শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার এবং তাদের অধিকার
আদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। শ্রমিক ইউনিয়ন এবং নারী অধিকার
সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, মজুরি বৈষম্যের অবসান
ঘটিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই জরুরি নয় বরং
একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্যও অপরিহার্য। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সব
সাতরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এ বৈষম্য দূর করতে এবং নারী কৃষি শ্রমিকদের মর্যাদা ও
অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুর অঞ্চলের নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি পুরুষের এক-তৃতীয়াংশ

আপডেট সময় : ০২:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫

কালের পরিক্রমায় কত মে দিবস আসে আবার কত মে দিবস চলে যায়। মে মাসের পর মে
মাস পরিবর্তন হলেও শ্রমিকদের ভার্গ্যরে কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। রংপুর অঞ্চলে কৃষিপ্রধান
অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ কৃষি শ্রমিক। মুই হনু কামলা, সারা দিন কাম দিলে, ভাত
এক গামলা এটি কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের প্রচলিত আঞ্চলিক একটি প্রবাদ। এখানকার কৃষি
শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামেই এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য নিশ্চিত হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠের পর
মাঠ ফসল ফলানোর কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। রোদ-বৃষ্টি-শীত উপেক্ষা করে তাদের শ্রম
কৃষি উৎপাদনের চাকা সচল রাখে। বিপুল শ্রমের বিনিময়ে কৃষি শ্রমিকরা যে মজুরি পান, তা
তাদের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী কৃষি শ্রমিক। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত
প্রতিটি স্তরে তাদের শ্রমও ফসল উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। অথচ পুরুষের সমানতালে কাজ করেও
নারী কৃষি শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। মহান মে দিবস, শ্রমজীবী
মানুষের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে
অর্জিত দিনটি শুধু শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য ও সংহতির প্রতীকই নয়, একই সঙ্গে বিশ্বের সব
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন। প্রতি বছর এই দিনে শিল্প-কারখানার
শ্রমিকদের অধিকারের কথা বিশেষভাবে উচ্চারিত হলেও কৃষিপ্রধান অর্থনীতির অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অংশ কৃষি শ্রমিকরা আলোচনার বাইরে থেকে যান। শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ
এবং সমাজের বিশিষ্টজনরা বলেন, মহান মে দিবসের তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা সব
শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলব। কৃষি শ্রমিকরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং
তাদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের ন্যায্য মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা,
নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান
উন্নয়ন করা সম্ভব। সরকার, কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সব স্তরের
মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কৃষি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গাইবান্ধা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২ হাজার ১৪৩ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার
আয়তনের গাইবান্ধা জেলার ৭টি উপজেলায় ৪টি পৌরসভা এবং ৮২টি ইউনিয়নে গ্রাম রয়েছে ১
হাজার ২৫৫টি। এখানকার জনসংখ্যা ২৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৭১৯ জন। এর মধ্যে শতকরা ৫৪ ভাগ পুরুষ এবং
৪৬ ভাগ নারী। জেলাজুড়ে মোট পরিবার ৬ লক্ষ ১১ হাজার ২৮৩টি। এর মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই কৃষি
পরিবার। জেলার ৬ লক্ষ ১ হাজার ৭২১টি কৃষক পরিবারের মধ্যে শতকরা ৩৮ ভাগই প্রান্তিক কৃষক
পরিবার, ৩১ ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক, ২০ ভাগ ভূমিহীন কৃষক, ৯ ভাগ মাঝারি কৃষক এবং মাত্র ২ ভাগ বড়
কৃষক পরিবার রয়েছে। জেলায় মোট কৃষি পরিবারের মধ্যে বর্গাচাষি পরিবারের সংখ্যা ৭১ হাজার
৭৭২টি। সাত উপজেলায় কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত ৫৫ হাজার ৬৫০ জন কৃষি শ্রমিক রয়েছেন।
গ্রামীণ জনপদে দেখা যায়, কৃষি শ্রমিকরা সাধারণত দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন।
বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিকাজের ধরন ও মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে এই মজুরির কিছুটা তারতম্য দেখা
যায়। তবে সাধারণভাবে তাদের দৈনিক মজুরি অন্য অনেক পেশার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এ সময়ে স্বল্প মজুরি তাদের পরিবারকে দারিদ্র্য
সীমার নিচে রেখে দেয়। অন্যদিকে একই ধরনের কৃষিকাজে নিয়োজিত পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায়
নারী শ্রমিকরা কম মজুরি পান। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা কিংবা বোঝা টানার
মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজেও এই বৈষম্য সু¯পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি পুরুষ
শ্রমিকদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম হয়ে থাকে। এই বৈষম্য শুধু আর্থিক কষ্টের কারণ নয়,
এটি নারী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা এবং ক্ষমতায়নের পথেও একটি বড় বাধা। গাইবান্ধা,
রংপুর, কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা মূলত
কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি এবং এই কৃষিকে সচল রাখেন
কৃষি শ্রমিক। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মান, শ্রমের মর্যাদা এবং অধিকার এখনও বহুলাংশে
উপেক্ষিত। শিল্প শ্রমিকদের জন্য যেমন নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং
ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কৃষি শ্রমিকদের জন্যও এসব
অধিকার অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কৃষি শ্রমিক এখনও দৈনিক ভিত্তিতে কাজ
করেন যাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফসলের মৌসুমের ওপর নির্ভর করে তাদের আয়
অনিশ্চিত থাকে। নেই কোনো নিয়োগপত্র, নেই স্বাস্থ্যসেবা বা সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে
ফসলহানি ঘটলে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও এখনও
অনেক কাজ শ্রমিকনির্ভর। বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই করা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে
কৃষি শ্রমিকের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। তারা জমিতে সার দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও ফসলের
রোগ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও করে থাকেন। এত কঠিন ও শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজ

করার পরও তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্যিই হতাশাজনক। কৃষি শ্রমিকদের কম মজুরির
পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। অনেক
ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য বিক্রি ও শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
ফলে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ফসল ক্রয় করে এবং শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে তারা নিজেরাই
লাভবান হন। এ ছাড়া কৃষকদের আর্থিক অসচ্ছলতা ও দর কষাকষির অভাবের কারণেও শ্রমিকরা ন্যায্য
মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। কৃষি শ্রমিকদের এই দুরবস্থা দেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যতের জন্য অশনি
সংকেত। যদি এই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তবে
ভবিষ্যতে কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যেতে পারে। ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের পেছনেও একাধিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, নারীরা
পুরুষের মতো শারীরিক শ্রম দিতে সক্ষম নন। অথবা তাদের কাজের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। এই
ধারণা প্রচলিত থাকার কারণে নিয়োগকর্তারা নারীদের কম মজুরি দিতে দ্বিধাবোধ করেন।
দ্বিতীয়ত নারী শ্রমিকদের দর কষাকষি করার ক্ষমতা কম থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে
অনেক নারী শ্রমিক কম মজুরিতেও কাজ করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া সংগঠিত শ্রমিক সংগঠনের
অভাব এবং আইনি সুরক্ষার দুর্বলতাও এই বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত কিছু
ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক দৈনিক মজুরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক বা ফসলের একটি অংশের বিনিময়ে কাজ
করেন, যেখানে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়। মজুরি বৈষম্যের
কারণে নারী কৃষি শ্রমকরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাদের সীমিত আয় পরিবারের
ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য যথেষ্ট হয় না। ফলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে
তারা। এ ছাড়াও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার কারণে অনেক নারী শ্রমিক কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে
ফেলেন এবং জীবিকার সন্ধানে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হন। এটি কৃষি উৎপাদনকেও প্রভাবিত করতে
পারে। কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে জাতীয়
কৃষক-ক্ষেতমজুর সমিতি গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ও কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের জেলা
সমন্বয়ক রেবতী বর্মণ বলেন, কৃষি শ্রমিকদের জন্য একটি ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা এবং তা
বাস্তবায়নের জন্য কঠোর নজরদারি রাখা উচিত। সেই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর
জন্য সরাসরি কৃষক এবং শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়াও
কৃষি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি
উদ্যোগে কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, কৃষি শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতির
মেরুদন্ড। তাদের শ্রমের মূল্যায়ন, ন্যায্য মজুরি এবং জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই
আমরা একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই কৃষি খাত গড়ে তুলতে সক্ষম হব। বাাংলাদেশ কৃষক-ক্ষেতমজুর
সংগঠন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহসানুল হাবীব সাঈদ নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য
প্রসঙ্গে বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীর কাজের প্রতি সম্মান জানানোর
মানসিকতা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যম এবং শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে লিঙ্গবৈষম্যমূলক ধারণাগুলো
পরিবর্তন করতে হবে। সেই সঙ্গে নারী কৃষি শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার এবং তাদের অধিকার
আদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। শ্রমিক ইউনিয়ন এবং নারী অধিকার
সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, মজুরি বৈষম্যের অবসান
ঘটিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই জরুরি নয় বরং
একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্যও অপরিহার্য। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সব
সাতরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এ বৈষম্য দূর করতে এবং নারী কৃষি শ্রমিকদের মর্যাদা ও
অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।