২১ জুলাই ২০২৫। দুপুর ১টা ৬ মিনিট। উত্তরা দিয়াবাড়ির আকাশে হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণ—তারপর গগনচিরা আগুন, আর মাটিতে কান্নার দোলাচাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে শোকাবহ দিনগুলোর তালিকায় যোগ হলো আরও একটি ভয়ংকর অধ্যায়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি F‑7 যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের পাশেই, যেখানে শতশত শিশু তখন ক্লাসে।
মুহূর্তেই শান্ত স্কুলপ্রাঙ্গণ রূপ নেয় দগ্ধ লাশের মিছিল ও ভীত-কাঁপা কান্নার বনে। ক্লাসে বসে থাকা তৃতীয় শ্রেণির সোনামনিদের কেউ কেউ তখন ছবি আঁকছিল, কেউ বানান করছিল, আর কেউ হয়তো স্কুলশেষে বাবা-মায়ের কাছে ফিরবে বলে স্বপ্ন দেখছিল—কিন্তু সেই স্বপ্ন আর ফেরা হয়নি তাদের। বিমানটি একটি ভবনের পাশঘেঁষে ভেঙে পড়ার পর মুহূর্তেই চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দগ্ধ হয় শিশুর শরীর, ক্ষত-বিক্ষত হয় একেকটি পরিবারের বুকের ভেতর।
প্রাথমিকভাবে নিহতের সংখ্যা বলা হচ্ছিল ১৮–১৯, পরে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২০ ছাড়িয়ে। এ রিপোর্ট লেখার সময় সকাল পৌনে দশটা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৭। আহত প্রায় দেড়শ’র বেশি। তাদের কেউ বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালের বিছানায় লড়ছে, আবার কেউ স্থায়ীভাবে অঙ্গহানি নিয়ে বেঁচে থাকবে বাকি জীবন।
স্কুলের এক শিক্ষার্থী কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার পাশে বসা বন্ধু আগুনে পুড়ে যায়। আমি চিৎকার করলেও কিছু করতে পারিনি…” আরেকজন জানায়, “আমরা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ আগুন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের ওপর।” শিক্ষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে—কিন্তু আগুন আর ধোঁয়ার বিরুদ্ধে মানুষের পেরোনোর যে একটা সীমা থাকে, তারা হেরে যান সেই সীমার কাছে।

এই ঘটনার সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জাতি। কাঁদে মা-বাবা, প্রতিবেশী, শিক্ষক—কাঁদে এক দেশের মানুষ, যার বুকজুড়ে এই শিশুরা ছিল অদেখা আগামীর প্রতীক। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী শোকপ্রকাশ করেন; ভারতসহ একাধিক দেশের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক জানান। ক্রিকেটার, শিল্পী, কবি থেকে শুরু করে প্রতিটি হৃদয় এক হয়ে ব্যথিত হয়—এ এক জাতীয় শোক, যে শোক রাজনীতি চেনে না, শ্রেণিভেদ মানে না।
বিমানটির চালক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও প্রাণ হারিয়েছেন। শেষ মুহূর্তে বিমানটি জনবহুল ভবনে না ফেলে পাশের স্কুলের মাঠ লক্ষ্য করেছিলেন—তাঁর এই আত্মত্যাগ যেন অবর্ণনীয় এক ব্যথার পাশাপাশি জন্ম দেয় অতল শ্রদ্ধার।
ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট, সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার কাজ চালায়। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান। মেট্রোরেলের মাধ্যমে কিছু রোগীকে পৌঁছে দেওয়া হয় জরুরি সেবায়, যার মধ্যে ছিল অনেক শিশুর দগ্ধ শরীর।
সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষাঙ্গনের পাশে কেন বিমান মহড়া? যান্ত্রিক ত্রুটির দায় কি কেবল প্রযুক্তির, নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা? আমরা কি নিরাপদ ছিলাম? আমাদের শিশুরা কি নিরাপদ ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো মিলবে আগামী দিনে। কিন্তু যে শিশুরা আজ আর নেই, তাদের খালি বেঞ্চগুলো, খোলা খাতাগুলো, পড়ে থাকা ছোট জুতোজোড়া আজ চিৎকার করে বলে যাচ্ছে—“আমরা কিছু চাইনি, কেবল বাঁচতে চেয়েছিলাম”।
উত্তরার সেই আকাশ এখন আর আগুনে জ্বলছে না। কিন্তু তার তাপ জাতির অন্তরে এখনও জ্বলছে। শিশুদের মুখ থেকে হারিয়ে যাওয়া হাসিগুলো যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আকাশে—নীরব, কিন্তু আর্ত।






















