১০:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ওরাও যে আমার সন্তান, ওদের রেখে কী করে আসি?

ওরাও যে আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? নিজের দুই সন্তানের কথা সেই
সময় একবারও না ভেবে অনেক মায়ের সন্তানকে বাঁচিয়ে চলে গেলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের
শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী। তবে ঘরে রইল তার মা-হারা দুই সন্তান। নিহত শিক্ষিকা মাহেরীন
চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল একবুক পোস্টে এসব কথাগুলোই বলছিলেন। ভাই মুনাফ চৌধুরী
বলেন, ওখানে যারা ছিলেন, তারা আমাদের বলেছেন, মাহেরীন ইচ্ছা করলে বের হতে পারতেন, কিন্তু
হননি। উনি বাচ্চাদের আগে বের করার চেষ্টা করেন। সোমবার ঘড়ির কাঁটায় যখন দুপুর সোয়া
১টা, রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিকট শব্দ করে আছড়ে পড়ে
বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানটি। মুহুর্তেই প্রতিষ্ঠানটির হায়দার আলী ভবনে দাউদাউ করে জ্বলে
উঠে আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় শ্রেণিকক্ষে থাকা ছোট ছোট শিশুদের। তাদের
বেশির ভাগই ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এত ক্ষিপ্ত
গতিতে বিমানটি আছড়ে পড়ে যে, আশপাশের এলাকাও কেঁপে উঠেছিল। সোমবার দুপুরের সেই
বিভীষিকায় মুহূর্তেই প্রাণ হারায় অনেক শিশু। তাদের সঙ্গে মারা যান তাদেরই প্রিয় শিক্ষিকা
মাহেরীন চৌধুরী, যিনি মাইলস্টোনের ওই শাখায় সমন্বয়ক ছিলেন। সেখানে থাকা এবং তাকে
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা বলেন, শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে মাহেরীন নিজে বের হতে
দেরি করেন। মুনাফ বলেন, তার বোনের মনের জোর ছিল অনেক। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন,
দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঠিক কে যেন ফোনে কল করেছিল বলতে পারব না। ফোনে আমাদের পরিবারের
একজনকে বলল, ওনার অবস্থা গুরুতর। ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের সেখানে যেতে
বলেন। কল পাওয়ার পরেই আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সবাইকে নিয়ে হাসপাতালে যান
মুনাফ। তিনি বলেন, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তারা যাওয়ার পরও জীবিত
ছিলেন তার বোন। কথাও বলছিলেন। তবে তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে
মুনাফ বলছিলেন, আগে বের হওয়ার সুযোগ থাকলেও মাহেরীন বের হননি। ওখানে যারা ছিলেন, তারা
আমাদের বলেছেন, তিনি তো আসলে আগে বের হতে পারতেন। তিনি আগে বের হননি। তার
শিক্ষার্থী যারা ছিল, তিনি তাদের আগে বের করার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, এতে যেটা
হয়েছে, তিনি এত বেশি ধোঁয়া আর আগুনে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার শ্বাসনালি
পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছিল। পরে আইসিউতে নেওয়ার পর নিশ্চিত হতে পারি যে, তার শ্বাসনালি
পুড়ে গেছে। দগ্ধ হওয়ার পর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি
ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা বলেন, তার শরীরের শতভাগই দগ্ধ হয়েছিল। আইসিইউতে
মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। সোমবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে আইসিউতেই মৃত্যু বরণ
করে মাহেরীন। মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ২৫মিনিটে গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার
বগুলাগাড়িতে তার লাশ নিয়ে আসেন স্বাজনরা। বিকাল সাড়ে ৩টায় বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ
মাঠে তার জানাজা করা হয়। সেখানে শোকার্ত মানুষ তাকে শেষ বিদায় জানান। জনাজা শেষে
পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, মাহেরীন চৌধুরী একজন আলোকিত
মানুষ ছিলেন। কারও প্রতি কখনো অন্যায় করেননি এবং অন্যায় কাজে জড়াননি। গ্রামে
শিক্ষাবিস্তারে তিনি কাজ করছিলেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য মাফ চেয়ে তারপর ভোট চান: মির্জা ফখরুল

ওরাও যে আমার সন্তান, ওদের রেখে কী করে আসি?

আপডেট সময় : ০১:২৭:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫

ওরাও যে আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? নিজের দুই সন্তানের কথা সেই
সময় একবারও না ভেবে অনেক মায়ের সন্তানকে বাঁচিয়ে চলে গেলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের
শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী। তবে ঘরে রইল তার মা-হারা দুই সন্তান। নিহত শিক্ষিকা মাহেরীন
চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল একবুক পোস্টে এসব কথাগুলোই বলছিলেন। ভাই মুনাফ চৌধুরী
বলেন, ওখানে যারা ছিলেন, তারা আমাদের বলেছেন, মাহেরীন ইচ্ছা করলে বের হতে পারতেন, কিন্তু
হননি। উনি বাচ্চাদের আগে বের করার চেষ্টা করেন। সোমবার ঘড়ির কাঁটায় যখন দুপুর সোয়া
১টা, রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিকট শব্দ করে আছড়ে পড়ে
বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানটি। মুহুর্তেই প্রতিষ্ঠানটির হায়দার আলী ভবনে দাউদাউ করে জ্বলে
উঠে আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় শ্রেণিকক্ষে থাকা ছোট ছোট শিশুদের। তাদের
বেশির ভাগই ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এত ক্ষিপ্ত
গতিতে বিমানটি আছড়ে পড়ে যে, আশপাশের এলাকাও কেঁপে উঠেছিল। সোমবার দুপুরের সেই
বিভীষিকায় মুহূর্তেই প্রাণ হারায় অনেক শিশু। তাদের সঙ্গে মারা যান তাদেরই প্রিয় শিক্ষিকা
মাহেরীন চৌধুরী, যিনি মাইলস্টোনের ওই শাখায় সমন্বয়ক ছিলেন। সেখানে থাকা এবং তাকে
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা বলেন, শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে মাহেরীন নিজে বের হতে
দেরি করেন। মুনাফ বলেন, তার বোনের মনের জোর ছিল অনেক। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন,
দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঠিক কে যেন ফোনে কল করেছিল বলতে পারব না। ফোনে আমাদের পরিবারের
একজনকে বলল, ওনার অবস্থা গুরুতর। ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের সেখানে যেতে
বলেন। কল পাওয়ার পরেই আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সবাইকে নিয়ে হাসপাতালে যান
মুনাফ। তিনি বলেন, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তারা যাওয়ার পরও জীবিত
ছিলেন তার বোন। কথাও বলছিলেন। তবে তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে
মুনাফ বলছিলেন, আগে বের হওয়ার সুযোগ থাকলেও মাহেরীন বের হননি। ওখানে যারা ছিলেন, তারা
আমাদের বলেছেন, তিনি তো আসলে আগে বের হতে পারতেন। তিনি আগে বের হননি। তার
শিক্ষার্থী যারা ছিল, তিনি তাদের আগে বের করার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, এতে যেটা
হয়েছে, তিনি এত বেশি ধোঁয়া আর আগুনে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার শ্বাসনালি
পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছিল। পরে আইসিউতে নেওয়ার পর নিশ্চিত হতে পারি যে, তার শ্বাসনালি
পুড়ে গেছে। দগ্ধ হওয়ার পর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি
ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা বলেন, তার শরীরের শতভাগই দগ্ধ হয়েছিল। আইসিইউতে
মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। সোমবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে আইসিউতেই মৃত্যু বরণ
করে মাহেরীন। মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ২৫মিনিটে গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার
বগুলাগাড়িতে তার লাশ নিয়ে আসেন স্বাজনরা। বিকাল সাড়ে ৩টায় বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ
মাঠে তার জানাজা করা হয়। সেখানে শোকার্ত মানুষ তাকে শেষ বিদায় জানান। জনাজা শেষে
পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, মাহেরীন চৌধুরী একজন আলোকিত
মানুষ ছিলেন। কারও প্রতি কখনো অন্যায় করেননি এবং অন্যায় কাজে জড়াননি। গ্রামে
শিক্ষাবিস্তারে তিনি কাজ করছিলেন।