০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিতে নতুন বার্তা

  • সরকার পতনের মতো বড় অভ্যুত্থান
  • রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই
  • জনবিক্ষোভের জেরে পতন এবং পলায়ন
  • চার বছরে তিন দেশে গণ বিপ্লব

’জেন-জি’ বিপ্পবের সূতিকাগার দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোন পথে

ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তানের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনসংখ্যার, শিক্ষা, জীবনযাত্রা প্রায় একই। অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন দুর্নীতির কেন্দ্রস্থল। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শ্রমের মজুরি না পাওয়া, বেকারত্ব, জনজীবনে নিরাপত্তা না থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। এককথায় এরা ঐতিহাসিকভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশ। কিন্তু বর্তমানে এরা নিজেদের উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশ বলে দাবি করলেও জীবনমানের কোনো উন্নতি নেই। ফলে হঠাৎ করে তৈরি হয় রাজনৈতিক সংকট। সরকার পতনের মতো বড় অভ্যুত্থান। সাম্প্রতিক সময়ে যেমন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে এ ধরনের চিত্র দেখা যায়।
তফাতটা শুধু পতাকার রং আর স্লোগানে। বাকিটা শুধুই মিল। জনতার স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভে। শাসকের প্রাথমিক অনমনীয়তা আর দমনপীড়নে। শেষ পর্যন্ত প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে পতন এবং পলায়নে। কলম্বো, ঢাকার পরে এ বার কাঠমান্ডুও দেখল একই ছবি। চার বছরের মধ্যে তিন দেশে গণ আন্দোলনের জেরে হল ক্ষমতাবদল।
২০২২ সালের জুলাই মাসে আর্থিক মন্দায় ধ্বস্ত শ্রীলঙ্কায় বিক্ষুব্ধ জনতার নিশানা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তদারকি প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিঙ্ঘের (গণরোষের জেরে গোতাবায়ার দাদা মাহিন্দা প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়ার পরে যিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন) সরকারি বাসভবনের দখল নিয়েছিল বিদ্রোহী জনতা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের কোটা সংস্কার বিরোধী আন্দোলন রূপ নিয়েছিল দেড় দশকের শাসকদল আওয়ামী লীগবিরোধী হিংসাত্মক বিক্ষোভে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়ার পরে তার সরকারি আবাস গণভবনেরও একই পরিণতি হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়া বইছে। গত চার বছরে গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হয়েছে তিনটি দেশে। বড় ধরনের আন্দোলন দেখেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গও। বিক্ষোভ হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারেও। অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার এই সরকার পতন কিংবা সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড এই প্রসঙ্গে বলেন, শাসক শ্রেণিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ হিসেবে দেখার যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিই বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে। তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশে বসবাসকারী দুই বিলিয়নের বেশি মানুষ, যারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ। ফলে এ অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অধিক জনসংখ্যা এবং শিল্পায়ন তৈরি না হওয়ার ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল নয় এখানকার অর্থনীতি। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ১৭০০ সালের মতো নিকট অতীতেও এ অঞ্চল বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ ধারণ করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক সময়কালে উল্লেখযোগ্য বি-শিল্পায়নের শিকার হয়। এর ফলে চরম দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়। বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে শিল্পায়ন তৈরি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা যথেষ্ট নয়। এ অঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, ফলে দেশগুলোকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা বা দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়, যা একধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির ফলে এই সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতার ফলে সাধারণ জনগণ বারবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়।
দুর্নীতি, দুঃশাসন, নির্যাতন-নিপীড়ণের মাধ্যমে সীমা লঙ্ঘণ, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের যুদ্ধ ঘোষণা। তারা সফলও হয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদি শাসকগোষ্ঠীকে হটিয়ে ‘জেন-জি’রা নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন। জেন-জি’দের আকস্মিক গণবিস্ফোরণের ভয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোও আতঙ্কগ্রস্ত। চরম অস্থির পরিস্থিতির শঙ্কায় রয়েছে ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
শ্রীলঙ্কা : ২০২২ সালের মাঝামাঝি নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে শ্রীলঙ্কা। ওই বছরের মার্চ থেকে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং শুরু হয়, আর মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়। তখন ক্ষমতায় ছিলেন রাজাপাকসে পরিবারের দুই প্রভাবশালী ভাই– প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে এবং প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসা গোতাবায়া নজিরবিহীনভাবে নির্বাহী ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। এর ফলে অর্থনীতির চরম দুর্দশার জন্য জনগণের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সরকারের ওপর। দেশটি পর্যটননির্ভর ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি ও ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর এই শিল্প একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল এবং ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় জাতিগত ও শ্রেণিগত সীমারেখা ভেদ করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী কলম্বোয় প্রেসিডেন্ট হাউজের সামনে বিশাল আন্দোলন ক্যাম্প বসানো হয়। বহু সমাজতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন এতে অংশ নিয়েছিল। মে মাসে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কলম্বোয় সরকারপন্থিদের হামলায় প্রায় ২০০ জন আহত হন। পুলিশ জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে। অন্যত্র দুই সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। সেসময় মাহিন্দা রাজাপাকসের বাড়ি এবং আরও কয়েকজন সরকারপন্থি নেতার বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে গোতাবায়া ছাড়া পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।
বাংলাদেশ : শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো জয়ী হন তিনি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তার দীর্ঘদিনের শাসন ভেঙে পড়ে। শুরুটা ছিল ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়দের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা ২০১৮ সালে বাতিল করা হলেও সুপ্রিম কোর্ট তা পুনর্বহাল করেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন থামাতে কঠোর দমনপীড়ন চালায় তৎকালীন প্রশাসন। সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ। কিন্তু তাতে আন্দোলন থেমে না গিয়ে আরও বড় আকার নেয় এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি হয়ে ওঠে একটাই- হাসিনার পদত্যাগ। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দমননীতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ৪ঠা আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এক বৈঠকে টানটান পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রথমে হাসিনা দৃঢ় অবস্থান নেন এবং সেনাবাহিনীকে আন্দোলনকারীদের সরাসরি দমনের নির্দেশ দেন বলে খবর মেলে। কিন্তু সেনাবাহিনী তাতে অস্বীকৃতি জানায়। ৫ আগস্ট সকালে হাসিনাকে জানানো হয়, নিরাপত্তা বাহিনী আর ছাত্রজনতাকে ঠেকাতে পারছে না। তবু অনড় ছিলেন হাসিনা। বোন শেখ রেহানাও তাকে পদত্যাগে রাজি করাতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় রাজি করান। সেদিনই হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর ৮ আগস্ট থেকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে এখনও রাষ্ট্র চালাচ্ছেন।
নেপাল : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কে পি শর্মা ওলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফের ক্ষমতায় আসেন। তবে তার সরকার শুরু থেকেই অস্থিরতায় ভুগছিল। চূড়ান্ত সংকট আসে ২০২৫ সালের আগস্টের শেষে, যখন সরকার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ দুই ডজনের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্ম। দুর্নীতি, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে তারা আগেই অসন্তুষ্ট ছিল। এবারের নিষেধাজ্ঞা ছিল শেষ ধাক্কা। গত ৮ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার মানুষ কাঠমান্ডুসহ সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে। অনেকেই স্কুলের পোশাক পরে বই হাতে বের হয়, ফলে আন্দোলনকে ‘জেন জি বিদ্রোহ’ নাম দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মতো নেপালেও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন অভিযান চালায়। সংকট নিরসনে সরকার দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তবু বিক্ষোভ থামেনি। ওইদিন সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লাল লেখক পদত্যাগ করেন, পরদিন পদত্যাগ করেন পানি সরবরাহমন্ত্রী প্রদীপ যাদব। ৯ সেপ্টেম্বরও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে আন্দোলনকারীরা। তারা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ কয়েকজন নেতার বাড়িতে হামলা হয়। তবে এদিন কারফিউ জারি ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে অনীহা দেখায়।
শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল ও নিজ জোটের চাপের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ওলি।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে ‘জিন-জি’ বসন্তের পর এখন চরম আতঙ্কে ভারতজুড়ে। কারণ যেভাবে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের ছায়া নেপালে পড়েছে, তা চিন্তারই বিষয়। মাত্র দুই দিনে তরুণদের বিক্ষোভে পদত্যাগে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালালেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। তরুণদের নজিরবিহীন আন্দোলনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নেপালের মসনদ। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ পালিয়েছেন। যারা পালাতে পারেননি, তাদের তাড়া করে মারপিট করেছে আন্দোলনকারীরা। অর্থমন্ত্রীকে ধাওয়া দিয়ে মারধরের পর দিগম্বর করে ছুড়ে ফেলেছে নদীতে। দুই দিনের বড় আন্দোলনের পর কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় হিমালয়-কন্যা। সেনাবাহিনীর হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন প্রেসিডেন্ট। অব্যাহত সহিংসতার জেরে বন্ধ হয়েছে বিমানবন্দর। সংসদ ভবন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রীদের বাড়ি।
একে একে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের পর নেপালেও এ ধরনের ঘটনা ভারতের জন্য উদ্বেগের। তার ওপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়াও অশান্তিতে। দেশটির সংসদ সদস্যরা জাকার্তায় ন্যূনতম মজুরির প্রায় ১০ গুণ বেশি আবাসন ভাতা পান। দেশের রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনের এ বৈষম্য ও দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে জেন-জিরা। নেপালের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের জেরে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। এ ঝুঁকি থেকে উত্তরণে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ইতোমধ্যে সমঝোতা করেছেন মমতা। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি জেলার চিকেন’স নেক এলাকায় নেপালের সঙ্গে ১০০ কিলোমিটার স্থল সীমান্ত আছে ভারতের। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরবর্তী জেন-জিদের টাগের্ট হতে যাচ্ছে ভারত। ভারতের মোদি সরকারের টানা ক্ষমতায় থাকা দেশেটিতে এখন প্রকাশ্যেই অনেক সমস্যা সামনে আসছে। দুর্নীতি- অর্থনীতির চাকা স্বক্রিয়া রাখা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে পরাজয়, চীন-রাশিয়ামুখী পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে মোদি সরকারের। ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। ফলে ভারতের অভ্যন্তরে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি এবং প্রবীণ নেতাদের শাসন তরুণ প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। নেপালের অলি ছিলেন ৭৩, বাংলাদেশের হাসিনা ৭৬, আর শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে ৭৪ বছর বয়সী নেতা। অথচ এই দেশগুলোর প্রায় অর্ধেক জনগণ ২৮ বছরের নিচে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিওতে রংপুরের দারুণ জয়

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিতে নতুন বার্তা

আপডেট সময় : ০৭:১৫:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • সরকার পতনের মতো বড় অভ্যুত্থান
  • রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই
  • জনবিক্ষোভের জেরে পতন এবং পলায়ন
  • চার বছরে তিন দেশে গণ বিপ্লব

’জেন-জি’ বিপ্পবের সূতিকাগার দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোন পথে

ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তানের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনসংখ্যার, শিক্ষা, জীবনযাত্রা প্রায় একই। অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন দুর্নীতির কেন্দ্রস্থল। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শ্রমের মজুরি না পাওয়া, বেকারত্ব, জনজীবনে নিরাপত্তা না থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। এককথায় এরা ঐতিহাসিকভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশ। কিন্তু বর্তমানে এরা নিজেদের উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশ বলে দাবি করলেও জীবনমানের কোনো উন্নতি নেই। ফলে হঠাৎ করে তৈরি হয় রাজনৈতিক সংকট। সরকার পতনের মতো বড় অভ্যুত্থান। সাম্প্রতিক সময়ে যেমন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে এ ধরনের চিত্র দেখা যায়।
তফাতটা শুধু পতাকার রং আর স্লোগানে। বাকিটা শুধুই মিল। জনতার স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভে। শাসকের প্রাথমিক অনমনীয়তা আর দমনপীড়নে। শেষ পর্যন্ত প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে পতন এবং পলায়নে। কলম্বো, ঢাকার পরে এ বার কাঠমান্ডুও দেখল একই ছবি। চার বছরের মধ্যে তিন দেশে গণ আন্দোলনের জেরে হল ক্ষমতাবদল।
২০২২ সালের জুলাই মাসে আর্থিক মন্দায় ধ্বস্ত শ্রীলঙ্কায় বিক্ষুব্ধ জনতার নিশানা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তদারকি প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিঙ্ঘের (গণরোষের জেরে গোতাবায়ার দাদা মাহিন্দা প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়ার পরে যিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন) সরকারি বাসভবনের দখল নিয়েছিল বিদ্রোহী জনতা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের কোটা সংস্কার বিরোধী আন্দোলন রূপ নিয়েছিল দেড় দশকের শাসকদল আওয়ামী লীগবিরোধী হিংসাত্মক বিক্ষোভে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়ার পরে তার সরকারি আবাস গণভবনেরও একই পরিণতি হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়া বইছে। গত চার বছরে গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হয়েছে তিনটি দেশে। বড় ধরনের আন্দোলন দেখেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গও। বিক্ষোভ হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারেও। অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার এই সরকার পতন কিংবা সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড এই প্রসঙ্গে বলেন, শাসক শ্রেণিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ হিসেবে দেখার যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিই বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে। তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশে বসবাসকারী দুই বিলিয়নের বেশি মানুষ, যারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ। ফলে এ অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অধিক জনসংখ্যা এবং শিল্পায়ন তৈরি না হওয়ার ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল নয় এখানকার অর্থনীতি। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি ছিল। ১৭০০ সালের মতো নিকট অতীতেও এ অঞ্চল বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ ধারণ করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক সময়কালে উল্লেখযোগ্য বি-শিল্পায়নের শিকার হয়। এর ফলে চরম দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়। বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে শিল্পায়ন তৈরি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা যথেষ্ট নয়। এ অঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, ফলে দেশগুলোকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা বা দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়, যা একধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির ফলে এই সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতার ফলে সাধারণ জনগণ বারবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়।
দুর্নীতি, দুঃশাসন, নির্যাতন-নিপীড়ণের মাধ্যমে সীমা লঙ্ঘণ, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের যুদ্ধ ঘোষণা। তারা সফলও হয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদি শাসকগোষ্ঠীকে হটিয়ে ‘জেন-জি’রা নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন। জেন-জি’দের আকস্মিক গণবিস্ফোরণের ভয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোও আতঙ্কগ্রস্ত। চরম অস্থির পরিস্থিতির শঙ্কায় রয়েছে ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
শ্রীলঙ্কা : ২০২২ সালের মাঝামাঝি নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে শ্রীলঙ্কা। ওই বছরের মার্চ থেকে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং শুরু হয়, আর মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়। তখন ক্ষমতায় ছিলেন রাজাপাকসে পরিবারের দুই প্রভাবশালী ভাই– প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে এবং প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসা গোতাবায়া নজিরবিহীনভাবে নির্বাহী ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। এর ফলে অর্থনীতির চরম দুর্দশার জন্য জনগণের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সরকারের ওপর। দেশটি পর্যটননির্ভর ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি ও ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর এই শিল্প একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল এবং ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় জাতিগত ও শ্রেণিগত সীমারেখা ভেদ করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী কলম্বোয় প্রেসিডেন্ট হাউজের সামনে বিশাল আন্দোলন ক্যাম্প বসানো হয়। বহু সমাজতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন এতে অংশ নিয়েছিল। মে মাসে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কলম্বোয় সরকারপন্থিদের হামলায় প্রায় ২০০ জন আহত হন। পুলিশ জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে। অন্যত্র দুই সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। সেসময় মাহিন্দা রাজাপাকসের বাড়ি এবং আরও কয়েকজন সরকারপন্থি নেতার বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে গোতাবায়া ছাড়া পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।
বাংলাদেশ : শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো জয়ী হন তিনি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তার দীর্ঘদিনের শাসন ভেঙে পড়ে। শুরুটা ছিল ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়দের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা ২০১৮ সালে বাতিল করা হলেও সুপ্রিম কোর্ট তা পুনর্বহাল করেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন থামাতে কঠোর দমনপীড়ন চালায় তৎকালীন প্রশাসন। সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ। কিন্তু তাতে আন্দোলন থেমে না গিয়ে আরও বড় আকার নেয় এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি হয়ে ওঠে একটাই- হাসিনার পদত্যাগ। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দমননীতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ৪ঠা আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এক বৈঠকে টানটান পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রথমে হাসিনা দৃঢ় অবস্থান নেন এবং সেনাবাহিনীকে আন্দোলনকারীদের সরাসরি দমনের নির্দেশ দেন বলে খবর মেলে। কিন্তু সেনাবাহিনী তাতে অস্বীকৃতি জানায়। ৫ আগস্ট সকালে হাসিনাকে জানানো হয়, নিরাপত্তা বাহিনী আর ছাত্রজনতাকে ঠেকাতে পারছে না। তবু অনড় ছিলেন হাসিনা। বোন শেখ রেহানাও তাকে পদত্যাগে রাজি করাতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় রাজি করান। সেদিনই হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর ৮ আগস্ট থেকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে এখনও রাষ্ট্র চালাচ্ছেন।
নেপাল : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কে পি শর্মা ওলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফের ক্ষমতায় আসেন। তবে তার সরকার শুরু থেকেই অস্থিরতায় ভুগছিল। চূড়ান্ত সংকট আসে ২০২৫ সালের আগস্টের শেষে, যখন সরকার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ দুই ডজনের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্ম। দুর্নীতি, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে তারা আগেই অসন্তুষ্ট ছিল। এবারের নিষেধাজ্ঞা ছিল শেষ ধাক্কা। গত ৮ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার মানুষ কাঠমান্ডুসহ সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে। অনেকেই স্কুলের পোশাক পরে বই হাতে বের হয়, ফলে আন্দোলনকে ‘জেন জি বিদ্রোহ’ নাম দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মতো নেপালেও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন অভিযান চালায়। সংকট নিরসনে সরকার দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তবু বিক্ষোভ থামেনি। ওইদিন সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লাল লেখক পদত্যাগ করেন, পরদিন পদত্যাগ করেন পানি সরবরাহমন্ত্রী প্রদীপ যাদব। ৯ সেপ্টেম্বরও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে আন্দোলনকারীরা। তারা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ কয়েকজন নেতার বাড়িতে হামলা হয়। তবে এদিন কারফিউ জারি ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে অনীহা দেখায়।
শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল ও নিজ জোটের চাপের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ওলি।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে ‘জিন-জি’ বসন্তের পর এখন চরম আতঙ্কে ভারতজুড়ে। কারণ যেভাবে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের ছায়া নেপালে পড়েছে, তা চিন্তারই বিষয়। মাত্র দুই দিনে তরুণদের বিক্ষোভে পদত্যাগে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালালেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। তরুণদের নজিরবিহীন আন্দোলনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নেপালের মসনদ। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ পালিয়েছেন। যারা পালাতে পারেননি, তাদের তাড়া করে মারপিট করেছে আন্দোলনকারীরা। অর্থমন্ত্রীকে ধাওয়া দিয়ে মারধরের পর দিগম্বর করে ছুড়ে ফেলেছে নদীতে। দুই দিনের বড় আন্দোলনের পর কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় হিমালয়-কন্যা। সেনাবাহিনীর হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন প্রেসিডেন্ট। অব্যাহত সহিংসতার জেরে বন্ধ হয়েছে বিমানবন্দর। সংসদ ভবন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রীদের বাড়ি।
একে একে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের পর নেপালেও এ ধরনের ঘটনা ভারতের জন্য উদ্বেগের। তার ওপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়াও অশান্তিতে। দেশটির সংসদ সদস্যরা জাকার্তায় ন্যূনতম মজুরির প্রায় ১০ গুণ বেশি আবাসন ভাতা পান। দেশের রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনের এ বৈষম্য ও দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে জেন-জিরা। নেপালের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের জেরে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। এ ঝুঁকি থেকে উত্তরণে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ইতোমধ্যে সমঝোতা করেছেন মমতা। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি জেলার চিকেন’স নেক এলাকায় নেপালের সঙ্গে ১০০ কিলোমিটার স্থল সীমান্ত আছে ভারতের। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরবর্তী জেন-জিদের টাগের্ট হতে যাচ্ছে ভারত। ভারতের মোদি সরকারের টানা ক্ষমতায় থাকা দেশেটিতে এখন প্রকাশ্যেই অনেক সমস্যা সামনে আসছে। দুর্নীতি- অর্থনীতির চাকা স্বক্রিয়া রাখা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে পরাজয়, চীন-রাশিয়ামুখী পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে মোদি সরকারের। ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। ফলে ভারতের অভ্যন্তরে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি এবং প্রবীণ নেতাদের শাসন তরুণ প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। নেপালের অলি ছিলেন ৭৩, বাংলাদেশের হাসিনা ৭৬, আর শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে ৭৪ বছর বয়সী নেতা। অথচ এই দেশগুলোর প্রায় অর্ধেক জনগণ ২৮ বছরের নিচে।