০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর তীরে গড়ে উঠছে নতুন ‘পর্যটন স্পট’

কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত নির্মাণাধীন বাঁধ কাম সড়ক প্রকল্পটি এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ নয়, বরং রূপ নিচ্ছে চট্টগ্রামের নতুন একটি ‘পর্যটন স্পটে’। প্রতিদিন বিকেলে অসংখ্য মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় করছেন কর্ণফুলীর পাড়ে নির্মিত এই সড়কে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনে থাকে উপচে পড়া ভিড়।

মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর কূলঘেঁষে নির্মিত এ রাস্তাটি ঘিরে জমে উঠেছে বিকেলের আড্ডা। নদীর পাড় ধরে বসে কেউ উপভোগ করছেন সূর্যাস্ত, কেউবা নদীতে থাকা সারি সারি মাছ ধরার নৌকা ও জাহাজের দৃশ্য। নদীর দিকে তাকালে দেখা যায় পানির ওপর ভেসে থাকা নৌকা আর ছোট-বড় জাহাজের সারি। সন্ধ্যার পর জাহাজের ভেতরে জ্বলে ওঠা আলোয় তৈরি হয় ভিন্নরকম এক জাদুকরী পরিবেশ। যেন নদীর বুকেই গড়ে উঠেছে আরেক শহর।

অনেক দর্শনার্থীর মতে, এ জায়গাটি একসময় অপরাধপ্রবণ এলাকা ছিল। ছিল জঙ্গল, ছিল মাদকসেবীদের আড্ডা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কেউই এই পথে হাঁটতে চাইত না। তবে সড়ক নির্মাণ শুরুর পর সেই চিত্র পাল্টেছে। এলাকাটি এখন নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল হোসেন বলেন, “আগে এখানে ছিনতাই হতো, মাদকসেবীরা ভিড় করত। এখন পুরো চিত্র পাল্টে গেছে। পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে আসা যায়।”

আরেক দর্শনার্থী মিরাজ হোসেন বলেন, “রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ লাগানো হয়েছে। আরসিসি ব্লকগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যেন বসার জন্যই তৈরি। এখান বসে কর্ণফুলী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার আলাদা আনন্দ আছে।”

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে প্রায় ২,৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এই ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ কাম সড়ক। এর প্রস্থ হবে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট এবং উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত। এর ফলে এটি শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে কাজ করবে, যা জলাবদ্ধতা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নগরকে সুরক্ষা দেবে।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭০ একর জমির মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর প্রক্রিয়া চলমান। সড়কটির এক পাশে রয়েছে চট্টগ্রাম শহরের দৃশ্যপট, অন্য পাশে কর্ণফুলী নদী। রাতে শহরের আলো আর নদীর জাহাজে আলো জ্বলা দৃশ্য এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করে।

প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, “প্রকল্পটি মূলত জলাবদ্ধতা নিরসণ, শহর রক্ষা ও যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য হাতে নেয়া হয়েছিল। তবে কাজ শুরুর পর থেকেই এলাকাটির পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক মানুষ এখানে ঘুরতে আসে, যা দেখে আমাদেরও ভালো লাগে।”

তিনি আরও বলেন, “পর্যটকদের সুবিধার্থে গাছ লাগানো হয়েছে, আরও লাগানো হবে। নদীর পাড়ে ব্লক বসানো হয়েছে ভাঙনরোধে, তবে এগুলো এখন বসার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি হবে চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি বড় অর্জন।”

প্রকল্পের আওতায় নগরীর চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর ও পাম্প হাউজ স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ১০টির কাজ শেষ হয়েছে, বাকি দুটি খালের মুখে কাজ চলছে।

নগরের প্রান্তে গড়ে ওঠা এই ‘নতুন স্পট’ এখনই চট্টগ্রামবাসীর মন জয় করছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু নগরের পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মানও পাল্টে যাবে — এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিওতে রংপুরের দারুণ জয়

চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর তীরে গড়ে উঠছে নতুন ‘পর্যটন স্পট’

আপডেট সময় : ০১:২৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫

কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত নির্মাণাধীন বাঁধ কাম সড়ক প্রকল্পটি এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ নয়, বরং রূপ নিচ্ছে চট্টগ্রামের নতুন একটি ‘পর্যটন স্পটে’। প্রতিদিন বিকেলে অসংখ্য মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় করছেন কর্ণফুলীর পাড়ে নির্মিত এই সড়কে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনে থাকে উপচে পড়া ভিড়।

মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর কূলঘেঁষে নির্মিত এ রাস্তাটি ঘিরে জমে উঠেছে বিকেলের আড্ডা। নদীর পাড় ধরে বসে কেউ উপভোগ করছেন সূর্যাস্ত, কেউবা নদীতে থাকা সারি সারি মাছ ধরার নৌকা ও জাহাজের দৃশ্য। নদীর দিকে তাকালে দেখা যায় পানির ওপর ভেসে থাকা নৌকা আর ছোট-বড় জাহাজের সারি। সন্ধ্যার পর জাহাজের ভেতরে জ্বলে ওঠা আলোয় তৈরি হয় ভিন্নরকম এক জাদুকরী পরিবেশ। যেন নদীর বুকেই গড়ে উঠেছে আরেক শহর।

অনেক দর্শনার্থীর মতে, এ জায়গাটি একসময় অপরাধপ্রবণ এলাকা ছিল। ছিল জঙ্গল, ছিল মাদকসেবীদের আড্ডা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কেউই এই পথে হাঁটতে চাইত না। তবে সড়ক নির্মাণ শুরুর পর সেই চিত্র পাল্টেছে। এলাকাটি এখন নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল হোসেন বলেন, “আগে এখানে ছিনতাই হতো, মাদকসেবীরা ভিড় করত। এখন পুরো চিত্র পাল্টে গেছে। পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে আসা যায়।”

আরেক দর্শনার্থী মিরাজ হোসেন বলেন, “রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ লাগানো হয়েছে। আরসিসি ব্লকগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যেন বসার জন্যই তৈরি। এখান বসে কর্ণফুলী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার আলাদা আনন্দ আছে।”

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে প্রায় ২,৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এই ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ কাম সড়ক। এর প্রস্থ হবে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট এবং উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত। এর ফলে এটি শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে কাজ করবে, যা জলাবদ্ধতা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নগরকে সুরক্ষা দেবে।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭০ একর জমির মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর প্রক্রিয়া চলমান। সড়কটির এক পাশে রয়েছে চট্টগ্রাম শহরের দৃশ্যপট, অন্য পাশে কর্ণফুলী নদী। রাতে শহরের আলো আর নদীর জাহাজে আলো জ্বলা দৃশ্য এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করে।

প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, “প্রকল্পটি মূলত জলাবদ্ধতা নিরসণ, শহর রক্ষা ও যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য হাতে নেয়া হয়েছিল। তবে কাজ শুরুর পর থেকেই এলাকাটির পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক মানুষ এখানে ঘুরতে আসে, যা দেখে আমাদেরও ভালো লাগে।”

তিনি আরও বলেন, “পর্যটকদের সুবিধার্থে গাছ লাগানো হয়েছে, আরও লাগানো হবে। নদীর পাড়ে ব্লক বসানো হয়েছে ভাঙনরোধে, তবে এগুলো এখন বসার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি হবে চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি বড় অর্জন।”

প্রকল্পের আওতায় নগরীর চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর ও পাম্প হাউজ স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ১০টির কাজ শেষ হয়েছে, বাকি দুটি খালের মুখে কাজ চলছে।

নগরের প্রান্তে গড়ে ওঠা এই ‘নতুন স্পট’ এখনই চট্টগ্রামবাসীর মন জয় করছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু নগরের পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মানও পাল্টে যাবে — এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এমআর/সবা