শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে মর্মান্তিক এক খবর—এক গৃহবধূ ও তার নয় মাস বয়সী শিশুর নিথর দেহ পাওয়া গেছে ঘরের ভেতর। খবরটি মুহূর্তেই এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় আসে যশোর কারাগারে বন্দী নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালি (২২) নিজ শ্বশুরবাড়ির ঘরের সিলিংয়ের সঙ্গে রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিলেন। আর তার নয় মাসের শিশু সন্তান সেজাদ হাসান (নাজিফ) বাথরুমের একটি বালতির পানিতে ডুবানো অবস্থায় পাওয়া যায়। শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারের আশায় দ্রুত বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলেও আগেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাকিয়া হক।

তিনি বলেন, ‘শিশুটিকে হাসপাতালে আনার সময় জীবনের কোনো লক্ষণ ছিল না। তবুও পানিতে পড়া রোগী হিসেবে আমরা প্রায় ৪৫ মিনিট চেষ্টা করেছি।’ তবে শিশুটি দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়েছিল নাকি কেউ ফেলে দিয়েছিল—এ বিষয়ে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হতে পারেননি।
খবর পেয়ে বাগেরহাট সদর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কানিজের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। নিহত কানিজ নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের স্ত্রী। সাদ্দাম বর্তমানে ১১টি মামলায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী।
আত্মহত্যা না হত্যা—উঠছে প্রশ্ন
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, স্বামী কারাবন্দী থাকায় মানসিক অবসাদে ভুগে কানিজ সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন। তবে এ বক্তব্য মানতে নারাজ নিহতের পরিবার।
কানিজের ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন দাবি করেন, ‘আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। নামাজের পর ১টা ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে খবর পাই। তখন ওই বাড়িতে কেউ ছিল না। অনেক তথ্যের গ্যাপ আছে।’ তিনি জানান, প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে বিয়ে হলেও পরে দুই পরিবারই তা মেনে নেয়।
কানিজের বাবা ও জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে, কিন্তু আমার নাতির মৃত্যু কীভাবে হলো? পুলিশ তদন্ত করে সত্য বের করুক।’ তিনি এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।
কারাফটকে শেষ দেখা, প্যারোল মেলেনি
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর খবর জানার পর সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত লাশবাহী গাড়ি নিয়ে যশোর কারাগারের ফটকে গিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ পান তিনি।
সাদ্দামের ভাই মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই সন্তানকে কোলে নিতে পারেনি। শুধু মাথায় হাত রেখে বলেছে—আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না।’
পরিবারের অভিযোগ, প্যারোল সংক্রান্ত সঠিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় তারা যশোরে আবেদন করতে পারেননি।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, প্যারোল নীতিমালা অনুযায়ী যে জেলায় বন্দী থাকেন, সেই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই প্যারোল দিতে পারেন। সাদ্দাম যশোর কারাগারে থাকায় বাগেরহাট প্রশাসনের হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না।
এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্যারোলের জন্য কোনো লিখিত আবেদন করা হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনায় কেবল কারাফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘প্যারোল দেয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কারা কর্তৃপক্ষ শুধু আদেশ বাস্তবায়ন করে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই বক্তব্য দিয়ে জানিয়েছে, প্যারোলের কোনো আবেদন না থাকায় মুক্তির প্রশ্নই ওঠেনি।
তদন্তের অপেক্ষা
এদিকে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কানিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শিশুটির ফুসফুস ও মস্তিষ্কে পানি ছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাগেরহাট সদর থানার ওসি মো. মাসুম খান।
এমআর/সবা





















