মানুষ ডাক্তারের পেছনে ঘুরবে না, ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবে’— স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, যদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বোঝাতে চান দেশে এত বেশি ডাক্তার তৈরি করা হবে যে মানুষকে আর দূরে যেতে হবে না, তাহলে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র ৭ জন ডাক্তার রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে এখনই মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়াতে হবে। কিন্তু এখানেই সময়সংক্রান্ত বড় অসঙ্গতি রয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন শিক্ষার্থী আজ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলে ডাক্তার হতে কমপক্ষে ৬ থেকে সাড়ে ৬ বছর সময় লাগে। বিশেষজ্ঞ হতে গেলে এর সঙ্গে আরও ৫ থেকে ৮ বছর যুক্ত হয়। অথচ সরকারের হাতে সময় রয়েছে মাত্র ৫ বছর। ফলে এই মেয়াদে ডাক্তার বাড়ানোর সুফল পাওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই। ডাক্তার সংকট কাটাতে হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন— সে ধরনের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা আছে কি না, সেটাই জানতে চান তিনি।
ডা. জারা বলেন, যদি উদ্দেশ্য হয় গ্রামে গ্রামে ডাক্তার পাঠানো এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দেওয়া, তবে সেটি সঠিক দিক। কিন্তু বাস্তবতায় দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও প্রায় ৭৫ শতাংশ ডাক্তার শহরে অবস্থান করছেন। এর মূল কারণ গ্রামে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য কম বেতন, মানসম্মত বাসস্থানের অভাব, সন্তানের শিক্ষার সমস্যা, পেশাগত উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। এ কারণেই বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদ থাকলেও ডাক্তার পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ডাক্তারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে হলে শুধু নির্দেশ দিলেই হবে না। গ্রামে কর্মরতদের জন্য মানসম্মত সরকারি বাসস্থান, নিরাপত্তা, পদোন্নতিতে বিশেষ সুবিধা ও প্রয়োজনে গ্রামীণ ভাতা দিতে হবে। একই সঙ্গে নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, টেকনোলজিস্ট ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। এসব বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সূচি জানতে চান তিনি।
ডা. তাসনিম জারা আরও বলেন, দেশে ডাক্তার তৈরি হলেও অনেক মেধাবী চিকিৎসক উন্নত কর্মপরিবেশ, ভালো বেতন ও নিরাপত্তার অভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এই ‘ব্রেইন ড্রেইন’ ঠেকাতে কার্যকর পরিকল্পনা না থাকলে একদিকে তৈরি করে অন্যদিকে হারাতে থাকবে দেশ।
তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আইসিইউ স্থাপনের ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সবার কাম্য। তবে জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অনেক জেলা ও উপজেলায় এখনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বা আইসিইউ সুবিধা নেই— সেখানে কোন এলাকাকে আগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
শেষে ডা. তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জানতে চায় দেশবাসী। স্বাস্থ্য খাতে সরকার সফল হলে সেটিই হবে জনগণের সবচেয়ে বড় অর্জন।
শু/সবা






















