কাগজে-কলমে সভাপতি, বাস্তবে কোনো ক্ষমতা নেই। এমন ‘কাঠের পুতুল’ দিয়েই চলছে প্রকল্পের কাজ। আর সেই সুযোগে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নে।
টিআর, কাবিখা ও কাবিটা দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য নেওয়া এই প্রকল্পগুলোই এখন অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে কাজ যতটা হয়েছে, কাগজে দেখানো হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্তত ১৬টি প্রকল্পে কাজের তুলনায় বিল বেশি তোলা হয়েছে। কোথাও নিম্নমানের কাজ, কোথাও অসম্পূর্ণ কাজ আবার কোথাও কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সভাপতি এবং সেক্রেটারিরাই নিজেদের ‘অক্ষম’ বলে স্বীকার করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, তারা শুধু সই দেওয়ার জন্যই আছেন। একজনের ভাষায়, “আমরা শুধু কাগজে সভাপতি। বাস্তবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। চেয়ারম্যান আর সচিব যেভাবে বলেন, সেভাবেই সই করি। আমরা আসলে কাঠের পুতুল।”
এতে স্পষ্ট, প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা তো দূরের কথা, দায়িত্ববোধের জায়গাটিও ভেঙে পড়েছে।
এদিকে, ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরেই দেখা দিয়েছে দায় ঠেলার প্রবণতা। সচিব বলছেন, তিনি প্রকল্পের দায়িত্বে নন; আবার অভিযোগের তীর যাচ্ছে প্রকল্প সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও প্যানেল চেয়ারম্যানের দিকে।
আওনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব রাসেল মাহমুদ বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পরিদর্শনের পরই বিল অনুমোদন দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ১৬টি প্রকল্পের প্রথম পর্যায় এবং ৬ টি প্রকল্পে দ্বিতীয় পর্যায়ের বিল নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে। তবে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, “আমি কোনো প্রকল্পের সভাপতি বা সেক্রেটারি নই। প্রকল্প দেখার দায়িত্ব চেয়ারম্যান ও পিআইওর।”
অন্যদিকে, আওনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. সুরুজ মিয়া সরাসরি অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, “নামমাত্র কাজ করে লাখ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। কিছু প্রকল্পে কাজই হয়নি, কিন্তু বিল হয়েছে। এতে আমরা জনসম্মুখে বিব্রত হচ্ছি।” তিনি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিনারা আশরাফ তরফদার ও সচিবকে দায়ী করেন। তবে অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সরিষাবাড়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শওকত জামিল বলেন, “যেসব প্রকল্পে কাজ ঠিক আছে, সেগুলোর বিল দেওয়া হয়েছে। যেগুলো নিয়ে অভিযোগ এসেছে, সেগুলো আবার যাচাই করা হবে।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেসব প্রকল্পে এখন অনিয়মের অভিযোগ, সেগুলো কি বিল দেওয়ার আগে ঠিকমতো যাচাই করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তাহলে এত অভিযোগ কেন? আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে দায় কার?
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে একটি ‘সিস্টেম’ গড়ে উঠেছে, যেখানে সবাই জানে কী হচ্ছে, কিন্তু কেউ দায় নিতে চায় না। ফলে উন্নয়নের টাকা উন্নয়নে না গিয়ে অন্য খাতে চলে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ‘কাঠের পুতুল’ দিয়ে প্রকল্প চালানোর এই সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে।
শু/সবা






















