8:26 pm, Tuesday, 16 June 2026

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিট ও রোগনির্ণয় বিভাগে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের ১২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) একযোগে বিকল হয়ে পড়ায় রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার কিডনি রোগীদের জন্য এই ডায়ালাইসিস ইউনিটই প্রধান ভরসা। এখানে প্রতিদিন তিন শিফটে ৭২ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তবে ২০১০ সালে চালু হওয়া ৩৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২১টি সচল রয়েছে। ৫টি সম্পূর্ণ অচল এবং বাকিগুলোর কার্যক্ষমতার মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় যেকোনো সময় পুরো ডায়ালাইসিস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়া ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রাখা সম্ভব নয়। গত ২৬ দিন ধরে সব এসি বিকল থাকায় মেশিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং রোগীদের ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তীব্র গরমে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থাও নেই। ফলে রোগীরা বাড়ি থেকে হাতপাখা বা ছোট বৈদ্যুতিক ফ্যান নিয়ে আসছেন।

অন্যদিকে হাসপাতালের রোগনির্ণয় বিভাগেও একই চিত্র। ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২৪টি, ৩টি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে ২টি, ৩টি এমআরআই মেশিনের মধ্যে ২টি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি অচল রয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগীকে অতিরিক্ত খরচে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

রোগী ও স্বজনরা অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরে করাতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। অনেক দরিদ্র রোগী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

হাসপাতালের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে অচল যন্ত্রপাতি পড়ে থাকায় অনেক কক্ষে ধুলোবালি ও ময়লা জমেছে। জনবল সংকটের কারণে যন্ত্রগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের কর্মীদের অভিযোগ, ডায়ালাইসিস ফি বাবদ বছরে এক কোটির বেশি টাকা আয় হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম দাবি করেছেন, ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে বড় কোনো সমস্যা নেই। দু-একটি এসি নষ্ট থাকলেও সেগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে।

এদিকে গত ১৪ জুন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ও অচল যন্ত্রপাতির কক্ষ ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনের সময় বহু মূল্যবান যন্ত্র বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে থাকার চিত্র তাদের সামনে উঠে আসে।

রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা দ্রুত নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, অচল মেশিন মেরামত, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় সংকট আরও গভীর হবে।

শু/সবা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

fifteen − 6 =

About Author Information

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল

Update Time : ০৮:২৬:১৫ pm, Tuesday, ১৬ জুন ২০২৬

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিট ও রোগনির্ণয় বিভাগে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের ১২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) একযোগে বিকল হয়ে পড়ায় রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার কিডনি রোগীদের জন্য এই ডায়ালাইসিস ইউনিটই প্রধান ভরসা। এখানে প্রতিদিন তিন শিফটে ৭২ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তবে ২০১০ সালে চালু হওয়া ৩৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২১টি সচল রয়েছে। ৫টি সম্পূর্ণ অচল এবং বাকিগুলোর কার্যক্ষমতার মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় যেকোনো সময় পুরো ডায়ালাইসিস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়া ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রাখা সম্ভব নয়। গত ২৬ দিন ধরে সব এসি বিকল থাকায় মেশিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং রোগীদের ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তীব্র গরমে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থাও নেই। ফলে রোগীরা বাড়ি থেকে হাতপাখা বা ছোট বৈদ্যুতিক ফ্যান নিয়ে আসছেন।

অন্যদিকে হাসপাতালের রোগনির্ণয় বিভাগেও একই চিত্র। ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২৪টি, ৩টি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে ২টি, ৩টি এমআরআই মেশিনের মধ্যে ২টি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি অচল রয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগীকে অতিরিক্ত খরচে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

রোগী ও স্বজনরা অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরে করাতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। অনেক দরিদ্র রোগী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

হাসপাতালের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে অচল যন্ত্রপাতি পড়ে থাকায় অনেক কক্ষে ধুলোবালি ও ময়লা জমেছে। জনবল সংকটের কারণে যন্ত্রগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের কর্মীদের অভিযোগ, ডায়ালাইসিস ফি বাবদ বছরে এক কোটির বেশি টাকা আয় হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম দাবি করেছেন, ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে বড় কোনো সমস্যা নেই। দু-একটি এসি নষ্ট থাকলেও সেগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে।

এদিকে গত ১৪ জুন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ও অচল যন্ত্রপাতির কক্ষ ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনের সময় বহু মূল্যবান যন্ত্র বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে থাকার চিত্র তাদের সামনে উঠে আসে।

রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা দ্রুত নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, অচল মেশিন মেরামত, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় সংকট আরও গভীর হবে।

শু/সবা