‘আমাদের টাকা প্রয়োজন’-এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি পার্বত্য চট্টগ্রামের, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের আদিবাসী জুম্ম সমাজের দৈনন্দিন জীবনের এক গভীর বাস্তবতার প্রতিধ্বনি। এটি কেবল একটি আর্থিক চাহিদার প্রকাশ নয়; বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের একটি সম্মিলিত অভিজ্ঞতার ভাষ্য। প্রায় প্রতিদিনের আলোচনায় কেউ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশার কথা বলেন, কেউ কর্মসংস্থানের সংকটের কথা তুলে ধরেন, আবার কেউ উন্নয়নের নামে গৃহীত প্রকল্পগুলোর সুফল থেকে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত থাকার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থসংকটের প্রকৃত উৎস কোথায়? এটি কি কেবল ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ঘাটতি, দুর্ভাগ্য কিংবা সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দার ফল? নাকি এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে এমন এক বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে, যা দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর উৎপাদন, বাজারে অংশগ্রহণ, সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং উন্নয়নের সুযোগকে সীমিত করে রেখেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে অর্থের অভাবকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এই প্রবন্ধে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, টাকার অভাব কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; বরং এটি অর্থনীতি ও রাজনীতির গভীর আন্তঃসম্পর্কের ফল। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝার জন্য নীতিকে বুঝতে হয়, আর নীতিকে বোঝার জন্য বুঝতে হয় রাজনীতিকে। কারণ সমাজে কে কী পাবে, কে বঞ্চিত হবে, কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কী ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হবে-এসবই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস এবং নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় উদ্যোগের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের আলোকে এই প্রবন্ধে আমি একটি কেন্দ্রীয় যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি: আদিবাসী জুম্ম সমাজের অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল আর্থিক সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্প বা ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমস্যার ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই সমাধান। অর্থনৈতিক মুক্তির পথ, শেষ পর্যন্ত, রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়েই নির্মিত হতে পারে।
অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি
টাকা অর্থনীতির বিষয়। অর্থনীতি বলতে আমরা সাধারণত সম্পদের উৎপাদন, বণ্টন, বিনিময় ও ভোগের সমগ্র ব্যবস্থাকে বুঝি। অর্থনীতি কেবল অর্থ বা টাকার লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষ কী উৎপাদন করবে, কীভাবে উৎপাদন করবে, উৎপাদিত সম্পদ কারা পাবে, কারা ভোগ করবে এবং কোন নিয়মে তা বণ্টিত হবে-এসব প্রশ্নও অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। এই কারণেই অর্থনীতির মূল বিষয় শুধু উৎপাদন নয়, উৎপাদন-সম্পর্কও। উৎপাদন-সম্পর্ক বলতে বোঝায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষে মানুষে এবং মানুষ ও সম্পত্তির মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উৎপাদিত সম্পদের মালিক কে হবে, কে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ করবে, কে লাভবান হবে এবং কে বঞ্চিত থাকবে-এসবই উৎপাদন-সম্পর্কের প্রশ্ন। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি নির্দিষ্ট নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামোর দ্বারা পরিচালিত হয়। এ কারণে টাকা বা অর্থকে বোঝার জন্য শুধু বাজার বা আয়ের দিকে তাকালেই যথেষ্ট নয়। যে নীতি ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করে, সেগুলোকেও বুঝতে হয়। কী উৎপাদিত হবে, কীভাবে উৎপাদিত হবে, কী নিয়মে ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় হবে এবং উৎপাদিত সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে-এসবই অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
কিন্তু এই নীতি ও নিয়ম কোথা থেকে আসে? এর উত্তর নিহিত রয়েছে রাজনীতিতে। মালিকানার ধরন, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, করব্যবস্থা, ভূমি-নীতি, বাজারের নিয়ম কিংবা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ-সবই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ, অর্থনীতি পরিচালিত হয় রাজনৈতিক ক্ষমতা, নীতি ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা। এই আন্তঃসম্পর্ককে বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক অর্থনীতি। কী উৎপাদিত হচ্ছে বা কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে- এই প্রশ্ন রাজনৈতিক অর্থনীতি শুধু জিজ্ঞাসই করে না বরং আরও মৌলিক প্রশ্ন তোলে-এই নিয়মগুলো কে নির্ধারণ করছে, কার স্বার্থে নির্ধারণ করছে এবং এর ফলে কে লাভবান হচ্ছে, আর কে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদ ও ক্ষমতার সম্পর্কের বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বুঝতে হলে অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতিকেও বুঝতে হয়; কারণ সম্পদের বণ্টন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বণ্টনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সম্পদ ও উৎপাদন

‘টাকা প্রয়োজন’-এই কথাটি মূলত টাকার অভাবের কথাই প্রকাশ করে। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি কেবল নগদ অর্থের সংকট নয়; বরং সম্পদ, আয় এবং উৎপাদনের সুযোগের অভাবেরও ইঙ্গিত বহন করে। অর্থনীতি মূলত অভাব এবং সেই অভাব পূরণের উপায়ের অধ্যয়ন। মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য বস্তু ও সেবা সৃষ্টি করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় উৎপাদন (Production)। উৎপাদন সম্ভব হয় উৎপাদনশক্তির (Productive Forces) মাধ্যমে। উৎপাদনশক্তির মধ্যে রয়েছে মানুষের শ্রম, জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তি, উৎপাদনের উপকরণ ও যন্ত্রপাতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা অবকাঠামোরও প্রয়োজন হয়-যেমন ভূমি, কারখানা, অফিস, প্রতিষ্ঠান কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ, সম্পদ সৃষ্টি কোনো একক ব্যক্তির প্রচেষ্টার ফল নয়। এটি মানুষ, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সম্পর্কের সম্মিলিত ফল।
টাকা নিজে সম্পদ নয় বরং সম্পদের মূল্য প্রকাশ ও বিনিময়ের একটি স্বীকৃত মাধ্যম। আধুনিক রাষ্ট্র বা তার কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইনগতভাবে মুদ্রা ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ধারণ করে। অন্যদিকে, বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোসম্পদ রাষ্ট্র কর্তৃক ইস্যুকৃত মুদ্রা নয়; এটি বিকেন্দ্রীভূত কম্পিউটার নেটওয়ার্কে সংরক্ষিত একটি ডিজিটাল সম্পদ, যা ব্যবহারকারীদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিনিময় হয়। তাই টাকার অভাবকে কেবল নগদ অর্থের সংকট হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো-কার হাতে সম্পদ রয়েছে, কারা সম্পদ সৃষ্টি করতে পারছে, কারা সেই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে, এবং কারা তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্পদ বলতে আজ শুধু জমি, ধান বা গবাদিপশুকে বোঝায় না; জ্ঞান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, স্বাস্থ্য এবং প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তিও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি দক্ষ শ্রমশক্তি নিজেই উৎপাদনক্ষম সম্পদ।
এই সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হয়, কার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কীভাবে বণ্টিত হয় এবং কোন প্রক্রিয়ায় এক শ্রেণি বা জনগোষ্ঠী সম্পদের ওপর অধিকার হারায়-এসব প্রশ্নের বিশ্লেষণই রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল আলোচ্য। তাই টাকার সংকটের প্রকৃত কারণ বুঝতে হলে শুধু অর্থের প্রবাহ নয়, সম্পদ ও ক্ষমতার সম্পর্কও বিশ্লেষণ করতে হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের জুম্মদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের আদিবাসী জুম্ম সমাজের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র এখনো মূলত কৃষিনির্ভর এবং তুলনামূলকভাবে অনুন্নত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জুমচাষের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের একটি বড় অংশ সমতল জমিতেও চাষাবাদ করেন। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কৃষির বাইরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশই ছোট চা-দোকান বা অনুরূপ ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা করেন, যা টেকসই ব্যবসায়িক পুঁজির বিকাশ ঘটাতে পারেনি। অল্প কয়েকটি মুদি বা খাবারের দোকান ছাড়া উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় নেই। এ ছাড়া কিছু মানুষ স্বল্প আয়ের চাকরিতে নিয়োজিত, এবং হাতে গোনা কয়েকজন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন; তাঁদের মধ্যেও অনেকে উন্নত জীবিকা বা কর্মসংস্থানের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
এই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কৃষক আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছেন, তবুও পার্বত্য অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। বিদ্যমান সমতল কৃষিজমিরও একটি অংশ নানা কারণে স্থানীয় মানুষের হাতছাড়া হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার বর্গাচাষ বা অন্যের জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে শিল্প ও উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেখানেও স্থানীয় জুম্ম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ বাইরের অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকেরা দখল করেছেন। ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য শিল্প খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি।
কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক তরুণ শহরে বিভিন্ন কোম্পানিতে শ্রমিক বা নিম্নপদস্থ কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে আয় অর্জন করলেও সেই শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের এলাকা বা সম্প্রদায়ের উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে না। তাঁদের শ্রম ও উৎপাদনশক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে, অথচ নিজস্ব অঞ্চলে শিল্প, কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টির ভিত্তি দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
স্বাভাবিক উৎপাদন বনাম পণ্য উৎপাদন

উৎপাদনের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে একটি সমাজে সাধারণভাবে দুই ধরনের উৎপাদন দেখা যায়-আত্মভোগের জন্য উৎপাদন (subsistence production) এবং বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন (commodity production)। আত্মভোগের জন্য উৎপাদনের লক্ষ্য হলো পরিবার বা সম্প্রদায়ের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করা, আর পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য হলো বাজারে বিনিময় বা বিক্রয়ের মাধ্যমে আয় অর্জন করা। এই দুই ধরনের উৎপাদনের উদ্দেশ্য ভিন্ন হওয়ায় পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং সংগঠনও ভিন্ন হয়।
পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বাজার, ক্রেতার চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, মূল্য নির্ধারণ এবং বিপণনের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হয়। এই পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে উৎপাদিত পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে না এবং উৎপাদনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পণ্যের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, তা বিনিময় বা বিক্রয়ের জন্য উৎপাদিত হয়। তাই বাজারের জন্য উৎপাদিত পণ্য যদি নিয়মিতভাবে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়, তবে তা আর পণ্য হিসেবে তার অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না। অর্থাৎ, পণ্য উৎপাদনের সাফল্য নির্ভর করে কেবল উৎপাদনের ওপর নয়; বরং বাজারে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি, বিনিময় এবং উৎপাদন ব্যয় পুনরুদ্ধারের ওপরও।
বাজার-নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় রাজনীতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের আদিবাসী জুম্ম সমাজে বর্তমানে খাদ্যশস্য, গৃহস্থালি ব্যবহারের সামগ্রী, বনজ ও বৃক্ষজাত পণ্য এবং বম সমাজের ক্ষেত্রে বস্ত্রসামগ্রী উৎপাদিত হয়। কিন্তু উৎপাদনের পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো-এসব পণ্যের বাজার কোথায়, এবং সেই বাজার কার নিয়ন্ত্রণে? উৎপাদন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য মূল্যে বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করা। বাস্তবে স্থানীয় বাজারব্যবস্থার ওপর জুম্ম উৎপাদকদের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। বিপণন ও পাইকারি বাণিজ্যের বড় অংশ বহিরাগত ব্যবসায়ীদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উৎপাদকরা নিজেরা দাম নির্ধারণ করতে পারেন না বরং মধ্যস্বত্বভোগী বা ক্রেতাদের নির্ধারিত দামেই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই অসম ক্ষমতার সম্পর্কই স্থানীয় বাজার-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
একই ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় নীতিতেও প্রতিফলিত হয়। এর একটি উদাহরণ হলুদ উৎপাদন। সরকার যখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদেশ থেকে হলুদ আমদানি করে, তখন দেশীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং পাহাড়ে উৎপাদিত হলুদের চাহিদা ও দাম কমে যায়। এর ফলে স্থানীয় কৃষকেরা প্রায়ই উৎপাদন ব্যয়ই তুলতে পারেন না। অথচ নীতিগতভাবে সরকার চাইলে দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় আমদানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত চাষাবাদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ি কৃষকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এই উদাহরণটি দেখায় যে, অর্থনৈতিক সংকট কেবল বাজারের সমস্যা নয়; এটি নীতিনির্ধারণেরও প্রশ্ন। রাজনীতি শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার বিষয় নয়; বরং কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কোন উৎপাদক রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবে, বাজার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সম্পদের বণ্টন কোন নীতিতে হবে-এসব সিদ্ধান্তই রাজনীতির অংশ।
স্থানীয় উদ্যোগের একটি অভিজ্ঞতা
স্থানীয় পর্যায়েও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। যেমন-বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা, সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রভাব ভাঙা, বাইরের জেলা বা বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ খোঁজা, কৃষক সমিতি গঠন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া। এগুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; এগুলোও রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ, কারণ এগুলোর মাধ্যমে বাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করা যায়।
আমি যখন রোয়াংছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন কৃষক সমিতি গঠনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা-যিনি একজন নারী ছিলেন। এই উদ্যোগে আন্তরিক সমর্থন দিয়েছিলেন। আমার নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিটি গ্রামে একটি করে রেজিস্টার খাতা পাঠানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী। প্রথমত, কৃষকদের সংগঠিত করা এবং তাঁদের সমস্যার লিখিত নথি সংরক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা। বাস্তবে দেখা যেত, অনেক কর্মকর্তা মাঠে না গিয়ে উপজেলা সদরেই দাপ্তরিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতেন। রেজিস্টার খাতায় কৃষকদের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা, পরামর্শ ও কার্যক্রম লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে পারেন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
একই সময়ে আমি রোয়াংছড়ি সদর হাটের সাপ্তাহিক হাটবারও পরিবর্তন করেছিলাম। এর পেছনে ছিল একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যুক্তি। কৃষকেরা যদি রোয়াংছড়ির হাটে তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে যেন পরদিন বান্দরবান সদরের বাজারে তা নিয়ে যেতে পারেন। কৃষিপণ্য, বিশেষ করে কাঁচা ও দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী কৃষকদের কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করতেন। কিন্তু বিকল্প বাজারের সুযোগ সৃষ্টি হলে কৃষকের হাতে একটি বিকল্প তৈরি হয়। তিনি বলতে পারেন-আজ এই দামে বিক্রি করব না, আগামীকাল অন্য বাজারে বিক্রি করব। এই সম্ভাবনাই ব্যবসায়ীদের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ সৃষ্টি করে এবং কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই বিবেচনাতেই বান্দরবান সদরের হাটের একদিন আগে রোয়াংছড়ির হাটবার নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই উদ্যোগটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতার বিরোধিতা এবং কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে শেষ পর্যন্ত আগের হাটবারই পুনর্বহাল করা হয়। তবুও এই উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব সম্পূর্ণ অস্বীকৃত ছিল না। সুয়ানলু পাড়ার একজন বম ব্যবসায়ী, যাঁকে আমি দাদা বলে সম্বোধন করি, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে জানিয়েছিলেন যে এই পরিবর্তনের ফলে তাঁরা বাস্তব উপকার পেয়েছিলেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মেইহ্লাঅং এবং এলাকার কয়েকজন তরুণও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন।
নেতৃত্ব ও শ্রমের সংস্কৃতি
কৃষকদের উন্নয়নে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রশিক্ষণ এবং কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যবিধি এখনো গৃহীত না হওয়ার কারণে এই সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো হচ্ছে না। জনগণের কল্যাণে বরাদ্দকৃত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা উন্নয়নের গতি ও কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে কিছু জনপ্রতিনিধির মধ্যে নির্বাচিত হওয়ার পর জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুযোগ-সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রমের দক্ষতার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্থানীয় শ্রমবাজারে আমার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক শ্রমিকের মধ্যে দক্ষতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কর্মশৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে। ইটের গাঁথুনি, ভবন নির্মাণ বা অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ অনেকের নেই। আবার দীর্ঘ সময় ধারাবাহিকভাবে ও নিয়ম মেনে কাজ করার অভ্যাসও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। একসময় বাঁশ ও কাঠভিত্তিক বিভিন্ন পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল। বর্তমানে সেই সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ফলে দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্কৃতি উন্নয়ন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা যায়। সম্প্রতি আমার এক দূরসম্পর্কের দাদার এক আত্মীয় তাঁর বাগানে একজন শ্রমিককে নিয়োগ করেছিলেন। কাজ শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের তুলনায় তিনি প্রতিদিনই দেরিতে কাজে আসতেন। একাধিকবার সময়মতো উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানোর পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় নিয়োগকর্তা তাঁকে জানিয়ে দেন যে, সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে না পারলে পরদিন থেকে আর কাজে আসার প্রয়োজন নেই। এই ঘটনাটি দেখায় যে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে শুধু কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়। দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত নৈতিকতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই বাস্তবতাকে কেবল ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার আলোকে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। শ্রমবাজারের মান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানুষের কাজের সংস্কৃতি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জুম্ম জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, ন্যায্য অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একইভাবে, আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবার উপস্থিতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক পূর্বশর্ত। তাই এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বাস্তবতার সমন্বিত প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নীতির অবক্ষয় ও সম্পদের ক্ষতি
নীতি নষ্ট হলে কীভাবে সম্পদও নষ্ট হয়, তার একটি উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে। দুই ভাই-বোন তাঁদের বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতার বসতভিটায় নিজ নিজ পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। দুই পরিবারই ছিল আর্থিকভাবে দুর্বল। বার্ধক্যে এসে ভাই দাবি করেন যে সম্পূর্ণ ভিটা তাঁর একক মালিকানাধীন এবং তিনি বোনের পরিবারকে স্থান ত্যাগ করতে বলেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়। শোনা যায়, মামলার ব্যয় বহন করতে গিয়ে ভাই তাঁর দুই-একটি গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে নির্ধারিত হয় যে বসতভিটার মালিকানা উভয়েরই থাকবে। কিন্তু এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় ভাই যে সম্পদ ব্যয় করেছিলেন, তার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট খরচের মাধ্যমে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই ঘটনা দেখায় যে, ন্যায্যতা ও সমঝোতার অভাব থাকলে কেবল সম্পর্কই নয়, বাস্তব সম্পদও অপচয় হয়। এখানে উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ কোনো নতুন সম্পদ সৃষ্টি হয় না।
বয়োজ্যেষ্ঠরা একটি প্রবাদে এই বাস্তবতাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করেছেন: “প্রদান ভালো হলে আদান ভালো হয়।” অর্থাৎ, কোনো কাজে আপনি যদি ভালোভাবে প্রদান করতে না পারেন-যেমন যথাযথ জ্ঞান, দক্ষতা, শ্রম বা দায়িত্ব-তাহলে তার প্রতিদানও ভালো হবে না। অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এই নীতি প্রযোজ্য। শ্রমবাজারে দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং কার্যকর কাজের মানই নির্ধারণ করে আপনি কী পরিমাণ আয় বা সুযোগ পাবেন। কাজের মান দুর্বল হলে সুযোগ সীমিত হয়, আর সুযোগ সীমিত হলে সম্পদ অর্জনের পথও সংকুচিত হয়ে যায়।
ভাববাদ নয়, বাস্তবতাই সত্যের মাপকাঠি
অর্থনীতি ও রাজনীতি সঠিকভাবে কাজ না করলে স্বাভাবিকভাবেই সম্পদের সৃষ্টি ও বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয়। আর সম্পদ সৃষ্টি না হলে টাকার প্রবাহও সীমিত হয়ে যায়। তাই কেবল টাকার অভাব নিয়ে অভিযোগ করা যথেষ্ট নয় বরং যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি ও বণ্টন হয়, সেটিকে বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং পরিবর্তনের সক্ষমতা অর্জন করাই জরুরি। এই প্রেক্ষিতে সচেতনতা কেবল একটি মানসিক অবস্থা নয়। এটি একটি বাস্তব-ভিত্তিক জ্ঞানপ্রক্রিয়া। সচেতনতার একটি ভাবগত দিক রয়েছে, আবার তার একটি বস্তুগত ভিত্তিও আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকেই চিন্তা, ধারণা ও মতাদর্শের জন্ম হয়, আবার সেই ধারণাগুলো পরবর্তীতে বাস্তবতাকে প্রভাবিত ও পরিবর্তন করতেও সক্ষম হয়। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের মাধ্যমেই সচেতনতা কার্যকর হয়।
সুতরাং, সচেতনতা সম্পর্কে কেবল বিমূর্তভাবে কথা বলা যথেষ্ট নয় বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজের বাস্তব কাঠামোকে বোঝার মধ্য দিয়েই তা অর্থবহ হয়ে ওঠে। চিন্তা ও মতাদর্শ শেষ পর্যন্ত এই বস্তুগত বাস্তবতারই প্রতিফলন, যদিও তারা আবার সেই বাস্তবতাকে পরিবর্তনের শক্তিও ধারণ করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দারিদ্র্য বা সম্পদের অভাবকে যদি শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত বা পূর্বনির্ধারিত কারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তবে তা বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। সামাজিক বৈষম্য, সম্পদের বণ্টন, উৎপাদন সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস-এইসব বাস্তব উপাদানই সাধারণত অর্থনৈতিক অবস্থাকে নির্ধারণ করে। তাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্লেষণই সামাজিক সমস্যার কার্যকর সমাধানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ভূমি: আদিবাসী জুম্মদের মূল সম্পদ
বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এই ভূমি-পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও কারণ বিদ্যমান-যেমন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজারভিত্তিক চাপ, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। এসব প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবে ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অনেক ধারার বাস্তবায়ন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত দাবি ও স্বীকৃতি এখনো নীতিগত ও প্রশাসনিক পর্যায়ে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা, ভুল সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেও অনেক পরিবার বা গোষ্ঠী ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বা তা ধরে রাখতে পারেনি।
পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি এখনো প্রধান উৎপাদনসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ শিল্পায়ন, পুঁজির বিকাশ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনক্ষম সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। এই বাস্তবতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। জ্ঞান, দক্ষতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাও অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে আরও গভীর করে। কারণ সম্পদ কেবল বিদ্যমান থাকার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে না বরং তার কার্যকর ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং উৎপাদনশীল প্রয়োগের ওপরই তার প্রকৃত ফল নির্ভর করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমি, মানবসম্পদ এবং ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার দুর্বল সমন্বয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তোলে।
উপসংহার: রাজনৈতিক সমাধানই অর্থনৈতিক সমাধানের চাবিকাঠি
যেহেতু বর্তমান বাস্তবতায় পর্যাপ্ত সম্পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-আয়ের উৎস কোথা থেকে আসবে? কেবল ‘টাকা নেই’ বলে অভিযোগ করে বসে থাকাও কোনো সমাধান নয়। অর্থনৈতিক সংকট বোঝার পরের ধাপ হলো সম্পদ সৃষ্টির সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং তার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। এই প্রক্রিয়ায় অর্থনীতি ও রাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সম্পদ বণ্টন এবং কর্মসংস্থানের কাঠামো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার বিন্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুধু ব্যক্তিগত বা স্থানীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতা, অংশগ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও অপরিহার্য।
আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন হলে আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক অধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানও সীমিত থাকবে।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক বিশ্লেষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে মূলত একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক কাঠামো ও অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর সমাধান ছাড়া অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল অসম্পূর্ণই থাকবে না, বরং পুনরাবৃত্তও হতে পারে।
ক্য বা মং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
লেখা: ক্য বা মং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী 
























