বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পথচলা মসৃণ ছিল না। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে চারবার নিষিদ্ধ হয়ে দলীয় নিবন্ধন হারানো, নির্বাচনী মাঠে সংকোচন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপে পড়েও রাজনীতিতে শক্তি নিয়ে টিকে আছে। বর্তমানে অনেকটাই দাপটে রাজনীতির ভ‚মিকায় জামায়াত। ’৭১ সালে দেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের ইসলামীর নেতৃবৃন্দের সম্পৃক্ততার অভিযোগে আওয়ামী শামসনামলে নজিরবিহীন রোষানলের রেশ কাটিয়ে সময়ের প্রেক্ষাপটে দলটি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর থেকে জামায়াত আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন নতুন কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা যাকে ‘চিকন কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। সময়ের হাওয়া আজকের নিবন্ধনে তা নিয়েই আলোচনা-
এক. বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক হারিয়ে বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে রাজনীতিতে সংগঠিত থাকার চেষ্টা করে। আদালতের রায়ে দলের নিবন্ধন বাতিল ও প্রতীক দাঁড়িপাল্লার হারানোর পর জামায়াত উন্মুক্ত পরিচয়ে নয়, ছায়া-পরিচয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। স্থানীয় বিভিন্ন শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মকে ম্যানেজ অথবা ইসলামী মূলনীতি ভিত্তিক সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে জামায়াত বিভিন্ন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোষণা এবং সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কাজে দলের নেতাকর্মীদের জন্য বিশেষ কর্মপন্থা চালু রাখে। এতে নিষিদ্ধকালেও বাস্তবে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার সুযোগ পায় দলটি।
দুই. দেশের আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে বিগত সময়ে ‘কোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসেবে সক্রিয় অংশীদার ছিল জামায়াত। ’৭১-এর ভ‚মিকায় জামায়াত বার বার প্রশ্নের মুখোমুখি হলেও রাজনৈতিক দাবার চালে কৌশলী জামায়াত ’৯০-এর দশক থেকেই বিএনপির অন্যতম সহযোগী হিসেবে সু-খ্যাতি লাভ করে। যার প্রমাণ মিলে, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল, অবরোধ, মাঠের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জামায়াতের কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল ভ‚মিকা রাখার ক্ষেত্রে। এর মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট পথ হিসেবে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেও চেষ্টা করে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
তিন. জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ও সমালোচনা মোকাবিলায় দলটি বিভিন্নভাবে আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাংক, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রবাসী লবিং গ্রæপকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে। নিজেদেরকে ‘ধর্মীয় গণতান্ত্রিক দল’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি ‘চিকন কৌশলের’ অংশ।
চার. জামায়াতে ইসলামী দেশের যুব-শক্তি এবং তরুণদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিউ-মডারেট, ইসলামি-ভ্যালু-বেইজড ইমেজ প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালাচ্ছে। দলটির শক্তিশালী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সরাসরি সামনে না এনে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-ভিত্তিক স্টাডি সার্কেল, সামাজিক সংগঠকে আরও বেশি সক্রিয় রাখতে জোর তৎপরতায় লিপ্ত। উদ্দেশ্য, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ন্যারেটিভ সৃষ্টি করা এবং জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনকে সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণে আদর্শ ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ব্যাপক সফলতাও পেয়েছে দলটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রথম সারির কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির ভ‚মিধস বিজয় পেয়েছে।
পাঁচ. ইসলামী আমল-আকিদায় ভিন্নমত থাকলেও জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যান্য ইসলামীগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা এবং বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী যেসব ত্যাগী নেতা প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় বাদ পড়েছেন তারা যদি পুনর্বিবেচনায় দলের চ‚ড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় আসতে না পারেন ওইসব মনোনয়ন-বঞ্চিত বিএনপি নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করছে দলটির হাইকমান্ড। জামায়াতের একাধিক সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় সফলতার লক্ষ্যে নিবন্ধিত ছোট ছোট ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে ‘বৃহত্তর ইসলামী জোট’ গঠনের পথে জামায়াত। বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদেরও টার্গেটে রেখেছেন নিজেদের ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য।
এদিকে বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। দল যদি তাদের মূল্যায়ন না করে তাহলে দলের বিপক্ষে গিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করবেন। প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। তাছাড়া জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন ইস্যুতে আলোচনা চলমান আছে তাদের। ভোটের মাঠ দখল নিতে ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানা এবং বিএনপির বিদ্রোহীদের নিয়ে ভোটের মাঠে জয় নিশ্চিতে জামায়াতেরও ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত আছে।
ছয়. সামাজিক-মানবিক কর্মকাÐে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। বিশেষ করে বন্যা, শীত, রমজান, দরিদ্রদের মাঝে সহায়তা প্রদানে জামায়াতের বিভিন্ন এনজিও, ট্রাস্ট ও সামাজিক সংগঠন কাজ করে। যার মূল্য লক্ষ্য, তৃণমূল জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং নিজেদের ভোটব্যাংক শক্তিশালী করা।
সাত. অনলাইন ন্যারেটিভ কন্ট্রোল বলতে গেলে এখন জামায়াতের হাতেই। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুভ‚তি, রাজনৈতিক পরামর্শ, সরকারের সমালোচনাকে বিশেষভাবে ‘চিকন কৌশলে’ অর্থাৎ নিজস্ব মিডিয়া ইকোসিস্টেম তৈরি করে স্যোশাল মিডিয়ায় ন্যারেটিভ যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ওইসব বিষয়গুলোকে কাজে লাগাতে দলটির বিপুল সংখ্যক অনলাইন যোদ্ধা কাজ করছে।
আট. কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য সীমিত রেখে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের মাধ্যমে গরম গরম প্রচারণা চালানো জামায়াতের আরও একটি ‘চিকন কৌশলের’ অংশ। তাদের বক্তব্যে কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসলে শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য নয় বলে এটি অস্বীকারের সুযোগ নিচ্ছে দলটি।
এদিকে জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চান তারা। ন্যূনতম ২০০টি আসনে জয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অন্ততপক্ষে ১৮৫টি আসনে জয়ের জন্য যোগ্য, জনপ্রিয় এবং জেতার মতো প্রার্থীদের অগ্রাধিকার এবং সমঝোতার ভিত্তিতে আসন ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তও দলটির হাইকমান্ডের আছে। যে লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করছে জামায়াত। বিশেষ করে নতুন ভোটার এবং তরুণদের কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দিতে কৌশল তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর নামে ও পক্ষে বিভিন্ন রকমের দলীয় সংগীত ও অন্যান্য প্যারোডি গান বানানো হয়েছে। মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে ব্যাপক শোডাউন করছেন প্রার্থীরা।
এদিকে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নতুন বাংলাদেশ আর পুরাতন ফর্মুলায় চলবে না ‘ইনশাআল্লাহ’। নতুন বাংলাদেশ চলবে নতুন ফর্মুলায়। আর কোন দলের পক্ষপাতদুষ্ট কোনো সরকার দেখতে চায় না জনগণ। জনগণ দেখতে চায় জনগণের সরকার। যেই সরকারের নিয়োজিত প্রত্যেকটি ব্যক্তি নিজের জন্যে চিন্তা করার আগে জনগণের জন্য স্বার্থ নিয়ে ভাববেন। ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ’ আমরা বিভক্ত জাতি আর দেখতে চাই না। জাতিকে যারা বিভক্ত করে, তারা জাতির দুশমন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জনগণের সম্পদ চুরি ও দুর্নীতির মতো অভিজ্ঞতা তার দলের নেই। আগামী ফেব্রæয়ারিতে রোজার পূর্বে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেই নির্বাচনে জনগণ যাদের কর্মসূচি সমর্থন করে, যাদের বক্তব্যে আস্থা রাখে, তাদেরকেই বাছাই করে নেবে। আমরা তাদের অভিনন্দন জানানোর জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি আমাদের দলকে জনগণ বেছে নেয়, আমরা সকল রাজনৈতিক দল এবং শক্তিকে আহŸান জানাবো, আপনারাও আমাদেরকে সমর্থন দেবেন, অভিনন্দন জানাবেন এবং আপনাদের সাথে নিয়েই আমরা দেশ গড়বো ‘ইনশাআল্লাহ’। তিনি বলেন, কেউ কেউ ইতোমধ্যে বলেছেন, তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল দলকে সঙ্গে নিয়ে… যদি তারা নির্বাচিত হন… তাহলে সরকার গড়বেন ‘ইল্লাল্লা জামাতে ইসলামী’ (জামায়াতে ইসলামী ছাড়া)। আমরা তাদের বিনয়ের সঙ্গে বলবো, জনগণ যদি মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের নির্বাচিত করে আমরা আপনাদেরও বাদ দেবো না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশ গড়বো ইনশাআল্লাহ। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি আমাদের অভিজ্ঞতা নাই, জনগণের সম্পদ চুরি করার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। দলীয় কর্মীদেরকে দিয়ে চাঁদাবাজি করার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণকায়েম করার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। সর্বপর্যায়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দুর্নীতি করার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। বর্তমান ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ বিদায় নেয়নি; বরং এটি এখন বাংলাদেশে ‘ফেসি’ হিসেবে রয়ে গেছে। তিনি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারী এবং মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানির মতো ফ্যাসিবাদীদের পাঁচটি লক্ষণ চিহ্নিত করে বলেন এই সকল লক্ষণ আজকে বিদ্যমান। দেশের মানুষ এসব অন্যায়-অবিচারের অবসান চায়। জামায়াত দেশের জনগণকে নিশ্চিয়তা দিতে চায়, তারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাওয়ার ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে গত ১ ডিসেম্বর মার্কিন ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে রিপাবলিকান পার্টি-ঘনিষ্ঠ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপের ফল প্রকাশের পর। এই জরিপের ফলাফলে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থনের ব্যবধান খুবই কম, মাত্র চার শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ২৬ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। এতে জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপির কাছাকাছি জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানে দলটির হাইকমান্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
উপসংহার : জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সংকটে থাকলেও, গোপনে বিকল্প কাঠামোতে এবং জোট রাজনীতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশলগত পথ খুঁজছে। দলের বর্তমান অবস্থান তাদেরকে প্রকাশ্য রাজনীতির চেয়ে চিকন, ছায়া-নির্ভর ও কৌশলগত পথে চলতে বাধ্য করেছে। এই কৌশলগুলো সফল হবে কিনা তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী কাঠামো এবং বিরোধী জোটসমূহের অবস্থানের ওপর।
লেখক : সাংবাদিক


























