দায়িত্ব পালনে চালক – মালিকদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ
চট্টগ্রামে গত পণরে দিনের অধিক সময় ধরে নির্বাচনের জন্য কার, মাইক্রোবাস, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ী রিকুইজিশন করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে রিকুইজিশন আতঙ্কে রয়েছেন বিভিন্ন যানবাহন চালক – মালিকরা। কিছু মালিক – চালক গাড়ি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও পেটের দায়ে রাস্তায় নামছেন অনেকে। ভুক্তভোগী গাড়ী চালক – মালিকদের অভিযোগ অনেকটা জোর করেই রাস্তায় গাড়ির কাগজপত্র জব্দ করে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা হচ্ছে চালকদের। আর যারা দায়িত্ব পালনে সায় দিচ্ছেন তারাও আছেন থাকা-খাওয়াসহ নানা ধরনের কষ্টে। পাচ্ছেন না সরকার নির্ধারিত খোরাকির টাকাসহ অন্য সুবিধা। নির্বাচনী ব্যয়ে গাড়ী রিকুইজিশনের জন্য একটি বড় বাজেট থাকলেও, প্রতিটি নির্বাচনে রিকুইজিশনের খপ্পরে পড়া গাড়ীর চালক ও মালিকদের বেশীরভাগ ক্ষেত্রে থাকা, খাওয়াসহ নানা সমস্যায় নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবহন মালিক সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাথে কথা বললে, তারা অভিযোগ করে জানান,, প্রতিবার নির্বাচনী কাজে গাড়ি রিকুইজিশন করার সময় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সাথে বৈঠক করা হলেও এবার কোনো আলোচনা করা হয়নি। এমনকি রিকুইজিশন করা গাড়িগুলোর ড্রাইভার-স্টাফদের খোরাকি বাবদ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা পাচ্ছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে ব্যবহৃত এসব গাড়ির চালকের অনেকে নিজের টাকায় খাবার কিনে খাচ্ছেন বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত অবস্থায়। গাড়ী রিকুইজিশনরে সীমাহীন কষ্টের ভয়ে আছেন চট্টগ্রামে চলাচলরত বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও হেলপাররা। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে আসছে। রাস্তায় গাড়ি বের করতে এবং গাড়ি চালাতেও অনেকে অপারগতা প্রকাশ করছেন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের চট্টগ্রামের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম বহনে বিপুল পরিমান যানবাহনের প্রয়োজন হয়। আর জনস্বার্থে সেসব সংস্থার চাহিদাপত্র অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলরত মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক, পিক-আপ, অটোরিকশা ও হিউম্যান হলার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি রিকুইজিশন করে থাকে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। আর রিকুইজিশনে থাকার সময় গাড়ির তেল ও আনুষঙ্গিক খরচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বহন করার নিয়ম রয়েছে। বরাবরের মতোই প্রতিটি নির্বাচনে প্রশাসন এসব খরচ বহন করে আসছে। এমনকি গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে ১৫ দিনের মধ্যে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অধীনে রয়েছে ১৭টি থানা। এসব থানার জন্য এখন পর্যন্ত রিকুইজিশন করা হয়েছে ২৫০টি মাইক্রোবাস, ৪০টি পিকআপ এবং ৫০টি বাস। এছাড়া জেলায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এবং নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা অন্যান্য সংস্থা ও ইউএনওদের চাহিদা অনুসারেও গাড়ী রিকুইজিশন করা হচ্ছে। আগামী ৪ জানুয়ারী পর্যন্ত এই রিকইজিশন কার্যক্রম চলবে। ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশ চাহিদার উপর ভিত্তি করে এসব গাড়ী রিকুইজিশন করবে বলে জানা গেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৭ জানুয়ারি। এর প্রায় ১৫ দিন আগ থেকে নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়ি রিকুইশনের চাহিদাপত্র ট্রাফিক বিভাগে পাঠাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো। যার মধ্যে রয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন (এপিবিএন), আনসার ও নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক।
গাড়ি রিকুইজিশনের পর চালকদের নিয়মিত খোরাকি দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের অভিযোগ সেই টাকা বেশিরভাগ সময় পান না তারা। এমনকি যেসব এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয় সেখানে থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থাও থাকে না গাড়ীর চালক ও হেলপারদের। তাই রিকুইজিশনকে এক ধরনের শাস্তি হিসেবেই দেখছেন গণপরিবহন চালক ও হেলপাররা। তাদের অভিযোগ নির্বাচনে গাড়ি রিকইজিশনে যেসব চালক ও হেলপাররা বিগত দিনে কাজ করেছেন, তারাই একমাত্র অবগত আছেন এই দায়িত্ব পালন কেমন কষ্টের। পরিবহন মালিক সংগঠনগুলো পুলিশের সাথে প্রতিবার নির্বাচনের আগে বৈঠক করে খোরাকির টাকার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এবার কোনো বৈঠক হয়নি। তাই খোরাকির টাকা পাওয়া নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে চালকদের মনে।
একজন বাস চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২৫ ডিসেম্বর হাটহাজারী উপজেলার বড়দিঘীর পাড় এলাকা থেকে তার বাসটি আটক করা হয় রিকুইজিশনের জন্য। এরপর তাকে পাঠানো হয় কাপ্তাই বিজিবি ক্যাম্পে। সেখানে যাওয়ার পর তিনি পড়েন নানা বিড়ম্বনায়। শুধু তাই নয়, ৯৯৯-এ ফোন করে অভিযোগ দিয়ে খাবারের সমস্যা সমাধান করতে হয় এই বাস চালককে।
তিনি আরো জানান, গত ২৫ ডিসেম্বর রিকুইজিশন করে পুলিশ লাইন হয়ে কাপ্তাই বিজিবি ক্যাম্পে আনা হয় আমার গাড়ি। প্রথমদিন খাবার-দাবার ঠিকভাবেই দিয়েছিল। সকাল হতেই আমাদেরকে বলা হয়,‘আপনারা এখানে থাকতে পারবেন না সিইও স্যারের অর্ডার।’ আমাদের তো যাওয়ার জায়গা নেই। কোথায় যাব? এরপর ৯৯৯-এ ফোন করলে দুপুরে আমাদের ডিম দিয়ে ভাত দেওয়া হয়। এখন আমরা বিজিবি ক্যাম্প ছেড়ে রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজে থাকছি এবং নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করছি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল জানান, প্রতিবছর নির্বাচনের সময়ে গাড়ি রিকুইজিশন হলে ট্রাফিক বিভাগ আমাদের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সাথে বৈঠক করে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোন রুট থেকে কয়টি গাড়ি দেওয়া হবে, ড্রাইভার-স্টাফদের খোড়াকি কত টাকা দেবে বা মালিকদেরকে কত টাকা দিবে। কিন্তু এবার সার্জেন্টরা তাদের ইচ্ছেমাফিক গাড়ি আটক করে রিকুইজিশনের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারদের সাথে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছনো।
ভাতার টাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, ড্রাইভার-স্টাফদের ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ আছে। কিন্তু এসব বিষয়ে আমাদের সাথে কোনো কথা হয়নি। এখন ভাতা পাবে কিনা সেটা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
নির্বাচনে গাড়ি রিকুইশন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গাড়ি রিকুইজিশনের জন্য বিভিন্ন সংস্থা চাহিদাপত্র দিয়েছে। সেই অনুযায়ী রিকুইজিশন প্রক্রিয়া চলছে। গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে মিনিবাস, মাইক্রোবাস, লেগুনা এবং পিকআপ। এখন পর্যন্ত ১৪শত এর অধিক গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান।


























