১০:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে তৈরি ইট: সরকার হারাচ্ছে লক্ষ টাকা রাজস্ব

চট্টগ্রামের পাঁচ শতাধিক ইটভাটায় পরিবেশ শুধু দূষণ নয়, সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার কৌশলও চলছে দেদারসে। ভ্যাট কর্মকর্তাদের সাথে ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার জন্য চলছে লুকোচুরি খেলা।চট্টগ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠা অবৈধ ব্রিকফিল্ডের মালিকরা সরকারী ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে ইট চড়া দামে বাজারজাত  করে অধিক মুনাফা আয়ের অভিযোগ উঠেছে। সরকারী লাইসেন্স নেওয়া ব্রিকফিল্ড গুলোর মালিকরা সামান্য পরিমাণ ভ্যাট আদায় করলেও লাইসেন্স বিহীন অবৈধ বেশীর ভাগ ব্রিকফিল্ড মালিকরা নানা কৌশলে সরকারী ভ্যাট ফাঁকি দিয়েই ইটভাটায় পোড়ানো ইট অনেকটা বিনা বাঁধায় বাজারজাত করছেন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বে থাকা ভ্যাট ইন্সপেক্টরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর ইটভাটায় ইট তৈরি কার্য়ক্রম শুরু হলেই ব্রিকফিল্ড মালিকরা ভ্যাট পরিশোধ না করার জন্য বিভিন্ন কৌশল নেন। নিয়ম অনুসারে তৈরি ইটের ভ্যাট পরিশোধ না করায় ভ্যাট ইন্সপেক্টরসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাস্তায় রাস্তায় অভিযান চালিয়ে নানা ব্র্যান্ডের বাজারজাত করা ইটভর্তি ট্রাক আটক করে ভ্যাট আদায় করছেন বলে জানান ভ্যাট ইন্সপেক্টররা। আর যেসব  সরকারী অনুমোদন নেয়া লাইসন্সেধারী ব্রিকফিল্ড মালিকরা বাজারজাত করা ইটের তথ্য গোপন করে সরকারী ভ্যাট আদায় করছেন অনেক কম। তবে গত কয়েক বছরে অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে সব ধরনের ইটের দাম বেড়েছে অত্যাধিক।
চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন ব্রিকফিল্ড মালিকের সাথে কথা বললে, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারী – বেসরকারী সংস্থার লোকজনকে প্রতিটি ব্রিকফিল্ড মালিককে প্রতিবছর ইট পোড়ানোর মওসুমে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ দিতে হয়। নিজ নিজ এলাকার ব্রিকফিল্ড মালিক সমিতির নির্দিষ্ট চাঁদাও পরিশোধ করতে হয় মওসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে। এসব টাকা পরিশোধ করেই ব্রিকফিল্ড মালিকরা প্রতিবছর ইটভাটায় আগুন দিতে পারে। এরপরও বিভিন্ন ব্রিকফিল্ড মালিকদের ইটভাটায় প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থার অভিযান পরিচালিত হয়। অনেকটা চোর পুলিশ খেলার মতো এক ধরনের পরিস্থিতিতে সচল রাখা হয় এই শিল্প এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ব্রিকফিল্ড মালিকদের।
 ইটভাটায় সব ধরনের কাজ অবিরাম চলতে থাকলেও প্রতিবছর এই খাতে সরকার হারাচ্ছেন কোটি কোটি টাকার ভ্যাট তথা রাজস্ব। প্রতিবছর একটি বড় আকৃতির ইটভাটায় দেড় কোটি থেকে আড়াই কোটি ইট তৈরি হলেও গুটিকয়েক ব্রিকফিল্ড মালিক মাত্র ৮ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করে ইটভাটায় তৈরি করা কোটি কোটি ইট বিনা বাঁধায় বাজারজাত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভ্যাট ফাঁকির মানসিকতার কারণে সরকার প্রতিবছর এই খাতে হারাচ্ছেন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক ব্রিকফিল্ড থাকলেও সরকারী লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশটি। বাকী সব ব্রিকফিল্ড চলছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স না নিয়ে। ফলে এসব অবৈধ ব্রিকফিল্ডের মালিকরা সরকারী ভ্যাট আদায়ে বরাবরের মতো উদাসিন। ব্রিকফিল্ড মালিকরা অধিক মুনাফা করার লক্ষ্যে কম অংকের উৎকোচ প্রদান করে বিশাল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
ব্রিকফিল্ড মালিকদের অভিযোগ, অনেক ব্রিকফিল্ড মালিকদের ইতিমধ্যে শ্রমিকরা অগ্রিম টাকা নিয়ে ইটভাটা থেকে পালিয়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতায় অনেক লোকসান গুণেছেন তারা। ব্রিকফিল্ড শিল্প ধরে রাখতে গিয়ে অনেক মালিক সর্বস্ব হারিয়েছেন। এর মধ্যে ভ্যাট আদায়সহ নানা ধরনের ভোগান্তি কাটিয়ে মুনাফা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বাজারে চড়া দামে ইট বিক্রি করার পরও কেন লোকসান হবে এমন প্রশ্নের জবাবে এসব সুচতুর ব্রিকফিল্ড মালিকরা বিষয়টি বরাবরের মতো এড়িয়ে চলেছেন।
এদিকে চট্টগ্রামের পরিবেশবাদি সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে ব্রিকফিল্ড গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মালিকরা পরিবেশের কথা না ভেবে অধিক মুনাফা করার চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ায় বিভিন্ন এলাকার পরিবেশ বিপন্ন হতে চলেছে। সরকারী বিধি নিষেধ মেনে পরিকল্পিত ভাবে এই শিল্প গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম পরিবেশবাদি সংগঠনের নেতারা। এছাড়া এই খাত থেকে যথাযত রাজস্ব আদায়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও তাগাদা দেন এসব নেতারা।
জনপ্রিয় সংবাদ

ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে তৈরি ইট: সরকার হারাচ্ছে লক্ষ টাকা রাজস্ব

আপডেট সময় : ১২:০৭:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৪
চট্টগ্রামের পাঁচ শতাধিক ইটভাটায় পরিবেশ শুধু দূষণ নয়, সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার কৌশলও চলছে দেদারসে। ভ্যাট কর্মকর্তাদের সাথে ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার জন্য চলছে লুকোচুরি খেলা।চট্টগ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠা অবৈধ ব্রিকফিল্ডের মালিকরা সরকারী ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে ইট চড়া দামে বাজারজাত  করে অধিক মুনাফা আয়ের অভিযোগ উঠেছে। সরকারী লাইসেন্স নেওয়া ব্রিকফিল্ড গুলোর মালিকরা সামান্য পরিমাণ ভ্যাট আদায় করলেও লাইসেন্স বিহীন অবৈধ বেশীর ভাগ ব্রিকফিল্ড মালিকরা নানা কৌশলে সরকারী ভ্যাট ফাঁকি দিয়েই ইটভাটায় পোড়ানো ইট অনেকটা বিনা বাঁধায় বাজারজাত করছেন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বে থাকা ভ্যাট ইন্সপেক্টরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর ইটভাটায় ইট তৈরি কার্য়ক্রম শুরু হলেই ব্রিকফিল্ড মালিকরা ভ্যাট পরিশোধ না করার জন্য বিভিন্ন কৌশল নেন। নিয়ম অনুসারে তৈরি ইটের ভ্যাট পরিশোধ না করায় ভ্যাট ইন্সপেক্টরসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাস্তায় রাস্তায় অভিযান চালিয়ে নানা ব্র্যান্ডের বাজারজাত করা ইটভর্তি ট্রাক আটক করে ভ্যাট আদায় করছেন বলে জানান ভ্যাট ইন্সপেক্টররা। আর যেসব  সরকারী অনুমোদন নেয়া লাইসন্সেধারী ব্রিকফিল্ড মালিকরা বাজারজাত করা ইটের তথ্য গোপন করে সরকারী ভ্যাট আদায় করছেন অনেক কম। তবে গত কয়েক বছরে অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে সব ধরনের ইটের দাম বেড়েছে অত্যাধিক।
চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন ব্রিকফিল্ড মালিকের সাথে কথা বললে, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারী – বেসরকারী সংস্থার লোকজনকে প্রতিটি ব্রিকফিল্ড মালিককে প্রতিবছর ইট পোড়ানোর মওসুমে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ দিতে হয়। নিজ নিজ এলাকার ব্রিকফিল্ড মালিক সমিতির নির্দিষ্ট চাঁদাও পরিশোধ করতে হয় মওসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে। এসব টাকা পরিশোধ করেই ব্রিকফিল্ড মালিকরা প্রতিবছর ইটভাটায় আগুন দিতে পারে। এরপরও বিভিন্ন ব্রিকফিল্ড মালিকদের ইটভাটায় প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থার অভিযান পরিচালিত হয়। অনেকটা চোর পুলিশ খেলার মতো এক ধরনের পরিস্থিতিতে সচল রাখা হয় এই শিল্প এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ব্রিকফিল্ড মালিকদের।
 ইটভাটায় সব ধরনের কাজ অবিরাম চলতে থাকলেও প্রতিবছর এই খাতে সরকার হারাচ্ছেন কোটি কোটি টাকার ভ্যাট তথা রাজস্ব। প্রতিবছর একটি বড় আকৃতির ইটভাটায় দেড় কোটি থেকে আড়াই কোটি ইট তৈরি হলেও গুটিকয়েক ব্রিকফিল্ড মালিক মাত্র ৮ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করে ইটভাটায় তৈরি করা কোটি কোটি ইট বিনা বাঁধায় বাজারজাত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভ্যাট ফাঁকির মানসিকতার কারণে সরকার প্রতিবছর এই খাতে হারাচ্ছেন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক ব্রিকফিল্ড থাকলেও সরকারী লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশটি। বাকী সব ব্রিকফিল্ড চলছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স না নিয়ে। ফলে এসব অবৈধ ব্রিকফিল্ডের মালিকরা সরকারী ভ্যাট আদায়ে বরাবরের মতো উদাসিন। ব্রিকফিল্ড মালিকরা অধিক মুনাফা করার লক্ষ্যে কম অংকের উৎকোচ প্রদান করে বিশাল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
ব্রিকফিল্ড মালিকদের অভিযোগ, অনেক ব্রিকফিল্ড মালিকদের ইতিমধ্যে শ্রমিকরা অগ্রিম টাকা নিয়ে ইটভাটা থেকে পালিয়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতায় অনেক লোকসান গুণেছেন তারা। ব্রিকফিল্ড শিল্প ধরে রাখতে গিয়ে অনেক মালিক সর্বস্ব হারিয়েছেন। এর মধ্যে ভ্যাট আদায়সহ নানা ধরনের ভোগান্তি কাটিয়ে মুনাফা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বাজারে চড়া দামে ইট বিক্রি করার পরও কেন লোকসান হবে এমন প্রশ্নের জবাবে এসব সুচতুর ব্রিকফিল্ড মালিকরা বিষয়টি বরাবরের মতো এড়িয়ে চলেছেন।
এদিকে চট্টগ্রামের পরিবেশবাদি সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে ব্রিকফিল্ড গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মালিকরা পরিবেশের কথা না ভেবে অধিক মুনাফা করার চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ায় বিভিন্ন এলাকার পরিবেশ বিপন্ন হতে চলেছে। সরকারী বিধি নিষেধ মেনে পরিকল্পিত ভাবে এই শিল্প গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম পরিবেশবাদি সংগঠনের নেতারা। এছাড়া এই খাত থেকে যথাযত রাজস্ব আদায়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও তাগাদা দেন এসব নেতারা।