০৪:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গুলি-মর্টার শেল বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল টেকনাফ

অনুপ্রবেশকারী ২৩ জনের
বিরুদ্ধে বিজিবির মামলা

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের উত্তেজনা বান্দরবানের ঘুমধুম তুমব্রু থেকে সরে এবার টেকনাফের দিকে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত সীমান্তের কাছাকাছি উনছিপ্রাং এলাকা গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে। টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্ষং উনছিপ্রাং এলাকার সঙ্গে মিয়ানমারের দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার। কাছাকাছি হওয়ায় মিয়ানমারে কী হচ্ছে তা খালি চোখে দেখা যায়। উনছিপ্রাং সীমান্তের স্থানীয়দের দাবি, ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখল করে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। এ কারণে টেকনাফ অংশে মিয়ানমারের শহর শীলখালী, বলিবাজার ও কুইরখালী থেকে এসব বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। উনছিপ্রাং এলাকার বাসিন্দা চিংড়ি চাষি বসত করিম বলেন, ‘মিয়ানমারের সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশ অংশে মাস্টারের প্যারা এলাকায় আমার চিংড়ি ঘের। মিয়ানমারে কী হচ্ছে সেটি খালি চোখে দেখা যায়। বিকালের দিকে কালো পোশাক পরা মানুষের সঙ্গে মিয়ানমারের নাসাকা (বিজিপি) সঙ্গে গুলি বিনিময় হয়েছে। কিছু মানুষ আমাদের সীমান্তে বিলার দ্বীপের দিকে আশ্রয় নিয়েছে। লাগাতার বোমা হামলা হয়েছে। বোমার বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে এপার। হোয়াইক্ষং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ আনুয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে শীলখালী, বলিবাজার ও কুইরখালী ঘাঁটি দখল নিতে বিদ্রোহীরা হামলা করছে। উনছিপ্রাং, খারাংখালী, ঝিমনখালী, কানজড়পাড়া এলাকায় ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দ শোনা যায়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সীমান্তের কাছাকাছি থাকা চিংড়ি চাষিরা। কয়েক দিন আগেও বসতঘরে গুলি এসে পড়ে।’ মিয়ানমারে সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশকারী ২৩ রোহিঙ্গাকে ১২টি অস্ত্রসহ পুলিশে সোপর্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। পুলিশ বলছে, কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তারা বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত বাসিন্দা। কিন্তু কী কারণে তারা মিয়ানমারে গিয়েছিল তা জানার চেষ্টা চলছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহাফুজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ২৩ জনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে বিজিবি। এরা বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা)। তাদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে। পুলিশ এদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ এর বাইরে কিছু অস্ত্রধারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেন গ্রুপের কিছু সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। যা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৮ এপিবিএনের সহ-অধিনায়ক পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করার বিষয়টি জানি না। তবে মঙ্গলবার রাত থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপ প্রধান নবী হোসেন ও তার সদস্যরা মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের তথ্য জানা গেছে। সে ক্যাম্পে প্রবেশ করতে পারে এমন আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তাকে পাওয়ামাত্র গ্রেফতার করা হবে। এ ছাড়া ক্যাম্পে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য এপিবিএন সজাগ রয়েছে।’
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি তুমব্রু সীমান্ত এলাকার ধানক্ষেতে পাওয়া একটি অবিস্ফোরিত রকেট লাঞ্চার তুলে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার পশ্চিমকূল তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় ধানক্ষেতে কাজ করার সময় স্থানীয় এক নারী একটি রকেট লাঞ্চার দেখতে পান। পরে ওই নারী লাঞ্চারটি হাতে ধরে তুলে এনে রাস্তার পাশে ফেলে রাখেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী তুমব্রু এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত বাবু সাংবাদিকদের জানান। একটি সূত্র বলছে, নয়াপাড়া বিলে অবিস্ফোরিত মর্টার শেলটি আরএল
গোলা। এটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হতে পারে। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দুপুরে শিশুরা লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে মর্টার শেলটি পায়। দ্রুত ঘটনাটি জানাজানি হয়। এলাকার লোকজন গিয়ে দেখেন, শেলটি অবিস্ফোরিত। পরে বিজিবি সেটি হেফাজতে নেয়। এর পর সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলকে খবর দেওয়া হয়। বিকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, লাল পতাকা টানিয়ে ঘুমধুম থেকে তুমব্রু চলাচলের রাস্তা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন বিজিবির সদস্যরা। রাস্তার পাশে রাখা রকেট লাঞ্চার ঘিরে জড়ো হয়েছেন স্থানীয়রা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। পাশে রয়েছে বিজিবির একটি তল্লাশি চৌকি। যে রাস্তার পাশে লাঞ্চারটি রাখা হয়েছে, সেখান থেকে বিজিবির এই তল্লাশি চৌকির দূরত্ব আনুমানিক ৩০-৪০ গজ। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত লাঞ্চারটি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘এলাকাবাসী খবর দেওয়ার পর রকেট লাঞ্চারের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ যোগাযোগ করা হলে ঘুমধুম পুলিশ তদন্তের কেন্দ্রে এসআই মাহফুজ ইমতিয়াছ ভুঁইয়া বলেন, ‘রকেট লাঞ্চার ব্যাপারে এলাকাবাসী আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু বিষয়গুলো বিজিবি দেখছে।’ ঘুমধুম ও তুমব্রুতে গোলাগুলি কিছুটা কমলেও সীমান্তের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ। তবে যারা গোলাগুলির কারণে দূর-দূরান্তে আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়েছিলেন, তাদের অনেকে ফিরতে শুরু করেছেন। এদিকে কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্যাহ বলেন, বিজিপি ও সেনাসদস্যদের ফিরিয়ে নেবে দেশটি। আমরাও মিয়ানমারের নাগরিক। আমরাও দ্রুত ফেরত যেতে চাই। জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী ও বিজিপি যেভাবে নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, এটা ইতিহাসে বিরল। বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনীর সামনে দাঁড়াতে না পেরে এখন তারাই বিতাড়িত।’ আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, তখনই সেখানে সংঘর্ষ বেঁধে গেল। এতে প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হতে পারে। নিজ দেশে সংঘাতের সুযোগ নিয়ে জান্তা সরকার যাতে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
নাগরিকদের ফেরত নিতে কক্সবাজারের পথে মিয়ানমারের জাহাজ : বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য ও নাগরিকদের ফেরত নিতে সামরিক জাহাজ পাঠাচ্ছে জান্তা সরকার। জাহাজটি আজ শনিবার কক্সবাজার উপকূলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে আজ শনিবার জাহাজ এসে পৌঁছাবে বলে মিয়ানমার আমাদের জানিয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সব মিয়ানমারের নাগরিককে কক্সবাজারে নেওয়া হবে। এরপর জাহাজটি যেহেতু খুব বড় হওয়ায় উপকূলের কাছে আসতে পারবে না। তাই ছোট ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে তাদের জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা দেশটির বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যসহ মোট ৩৩০ নাগরিককে টেকনাফের দুটি স্কুলে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তত্ত্বাবধানে তারা সেখানে রয়েছেন। মিয়ানমার থেকে যেই জাহাজটি পাঠানো হচ্ছে এ ধরনের সামরিক জাহাজের সক্ষমতা প্রায় ৫০০ জন বহন করা। ফলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সবাইকে এই জাহাজে পাঠানো সম্ভব বলে জানান কর্মকর্তারা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলী সাবরিন বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সেনা সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের গভীর সমুদ্র দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে রাখাইন সীমান্তে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী আর বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে। সংঘাত চলাকালে প্রায় দুই ব্যাটালিয়ানের অফিসার, সৈনিক, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ এবং কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। প্রথমে তাদের বিমানে ফেরত পাঠাতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে মিয়ানমার রাজি হয়নি। পরে সমুদ্রপথে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

 

 

 

স/ম

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মের ছুটি কমল

গুলি-মর্টার শেল বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল টেকনাফ

আপডেট সময় : ১১:৫২:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

অনুপ্রবেশকারী ২৩ জনের
বিরুদ্ধে বিজিবির মামলা

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের উত্তেজনা বান্দরবানের ঘুমধুম তুমব্রু থেকে সরে এবার টেকনাফের দিকে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত সীমান্তের কাছাকাছি উনছিপ্রাং এলাকা গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে। টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্ষং উনছিপ্রাং এলাকার সঙ্গে মিয়ানমারের দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার। কাছাকাছি হওয়ায় মিয়ানমারে কী হচ্ছে তা খালি চোখে দেখা যায়। উনছিপ্রাং সীমান্তের স্থানীয়দের দাবি, ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখল করে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। এ কারণে টেকনাফ অংশে মিয়ানমারের শহর শীলখালী, বলিবাজার ও কুইরখালী থেকে এসব বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। উনছিপ্রাং এলাকার বাসিন্দা চিংড়ি চাষি বসত করিম বলেন, ‘মিয়ানমারের সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশ অংশে মাস্টারের প্যারা এলাকায় আমার চিংড়ি ঘের। মিয়ানমারে কী হচ্ছে সেটি খালি চোখে দেখা যায়। বিকালের দিকে কালো পোশাক পরা মানুষের সঙ্গে মিয়ানমারের নাসাকা (বিজিপি) সঙ্গে গুলি বিনিময় হয়েছে। কিছু মানুষ আমাদের সীমান্তে বিলার দ্বীপের দিকে আশ্রয় নিয়েছে। লাগাতার বোমা হামলা হয়েছে। বোমার বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে এপার। হোয়াইক্ষং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ আনুয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে শীলখালী, বলিবাজার ও কুইরখালী ঘাঁটি দখল নিতে বিদ্রোহীরা হামলা করছে। উনছিপ্রাং, খারাংখালী, ঝিমনখালী, কানজড়পাড়া এলাকায় ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দ শোনা যায়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সীমান্তের কাছাকাছি থাকা চিংড়ি চাষিরা। কয়েক দিন আগেও বসতঘরে গুলি এসে পড়ে।’ মিয়ানমারে সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশকারী ২৩ রোহিঙ্গাকে ১২টি অস্ত্রসহ পুলিশে সোপর্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। পুলিশ বলছে, কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তারা বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত বাসিন্দা। কিন্তু কী কারণে তারা মিয়ানমারে গিয়েছিল তা জানার চেষ্টা চলছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহাফুজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ২৩ জনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে বিজিবি। এরা বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা)। তাদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে। পুলিশ এদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ এর বাইরে কিছু অস্ত্রধারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেন গ্রুপের কিছু সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। যা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৮ এপিবিএনের সহ-অধিনায়ক পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করার বিষয়টি জানি না। তবে মঙ্গলবার রাত থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপ প্রধান নবী হোসেন ও তার সদস্যরা মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের তথ্য জানা গেছে। সে ক্যাম্পে প্রবেশ করতে পারে এমন আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তাকে পাওয়ামাত্র গ্রেফতার করা হবে। এ ছাড়া ক্যাম্পে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য এপিবিএন সজাগ রয়েছে।’
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি তুমব্রু সীমান্ত এলাকার ধানক্ষেতে পাওয়া একটি অবিস্ফোরিত রকেট লাঞ্চার তুলে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার পশ্চিমকূল তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় ধানক্ষেতে কাজ করার সময় স্থানীয় এক নারী একটি রকেট লাঞ্চার দেখতে পান। পরে ওই নারী লাঞ্চারটি হাতে ধরে তুলে এনে রাস্তার পাশে ফেলে রাখেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী তুমব্রু এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত বাবু সাংবাদিকদের জানান। একটি সূত্র বলছে, নয়াপাড়া বিলে অবিস্ফোরিত মর্টার শেলটি আরএল
গোলা। এটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হতে পারে। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দুপুরে শিশুরা লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে মর্টার শেলটি পায়। দ্রুত ঘটনাটি জানাজানি হয়। এলাকার লোকজন গিয়ে দেখেন, শেলটি অবিস্ফোরিত। পরে বিজিবি সেটি হেফাজতে নেয়। এর পর সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলকে খবর দেওয়া হয়। বিকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, লাল পতাকা টানিয়ে ঘুমধুম থেকে তুমব্রু চলাচলের রাস্তা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন বিজিবির সদস্যরা। রাস্তার পাশে রাখা রকেট লাঞ্চার ঘিরে জড়ো হয়েছেন স্থানীয়রা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। পাশে রয়েছে বিজিবির একটি তল্লাশি চৌকি। যে রাস্তার পাশে লাঞ্চারটি রাখা হয়েছে, সেখান থেকে বিজিবির এই তল্লাশি চৌকির দূরত্ব আনুমানিক ৩০-৪০ গজ। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত লাঞ্চারটি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘এলাকাবাসী খবর দেওয়ার পর রকেট লাঞ্চারের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ যোগাযোগ করা হলে ঘুমধুম পুলিশ তদন্তের কেন্দ্রে এসআই মাহফুজ ইমতিয়াছ ভুঁইয়া বলেন, ‘রকেট লাঞ্চার ব্যাপারে এলাকাবাসী আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু বিষয়গুলো বিজিবি দেখছে।’ ঘুমধুম ও তুমব্রুতে গোলাগুলি কিছুটা কমলেও সীমান্তের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ। তবে যারা গোলাগুলির কারণে দূর-দূরান্তে আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়েছিলেন, তাদের অনেকে ফিরতে শুরু করেছেন। এদিকে কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্যাহ বলেন, বিজিপি ও সেনাসদস্যদের ফিরিয়ে নেবে দেশটি। আমরাও মিয়ানমারের নাগরিক। আমরাও দ্রুত ফেরত যেতে চাই। জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী ও বিজিপি যেভাবে নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, এটা ইতিহাসে বিরল। বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনীর সামনে দাঁড়াতে না পেরে এখন তারাই বিতাড়িত।’ আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, তখনই সেখানে সংঘর্ষ বেঁধে গেল। এতে প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হতে পারে। নিজ দেশে সংঘাতের সুযোগ নিয়ে জান্তা সরকার যাতে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
নাগরিকদের ফেরত নিতে কক্সবাজারের পথে মিয়ানমারের জাহাজ : বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য ও নাগরিকদের ফেরত নিতে সামরিক জাহাজ পাঠাচ্ছে জান্তা সরকার। জাহাজটি আজ শনিবার কক্সবাজার উপকূলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে আজ শনিবার জাহাজ এসে পৌঁছাবে বলে মিয়ানমার আমাদের জানিয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সব মিয়ানমারের নাগরিককে কক্সবাজারে নেওয়া হবে। এরপর জাহাজটি যেহেতু খুব বড় হওয়ায় উপকূলের কাছে আসতে পারবে না। তাই ছোট ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে তাদের জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা দেশটির বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যসহ মোট ৩৩০ নাগরিককে টেকনাফের দুটি স্কুলে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তত্ত্বাবধানে তারা সেখানে রয়েছেন। মিয়ানমার থেকে যেই জাহাজটি পাঠানো হচ্ছে এ ধরনের সামরিক জাহাজের সক্ষমতা প্রায় ৫০০ জন বহন করা। ফলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সবাইকে এই জাহাজে পাঠানো সম্ভব বলে জানান কর্মকর্তারা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলী সাবরিন বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সেনা সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের গভীর সমুদ্র দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে রাখাইন সীমান্তে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী আর বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে। সংঘাত চলাকালে প্রায় দুই ব্যাটালিয়ানের অফিসার, সৈনিক, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ এবং কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। প্রথমে তাদের বিমানে ফেরত পাঠাতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে মিয়ানমার রাজি হয়নি। পরে সমুদ্রপথে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

 

 

 

স/ম