০১:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
 পাটের রপ্তানি বাণিজ্য

খুলনার টার্গেট, ভারতের মার্কেট

ভারতে এ বছর পর্যাপ্ত পাট উৎপাদন হওয়ায় এবং সেখানকার কৃষকদের মূল্য নিশ্চিত করতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পাট কমিশন কার্যালয় থেকে সব জুট মিলকে কাঁচাপাট আমদানি বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। গত ১০ অক্টোবর জারি করা এই নির্দেশনার ফলে পাট রপ্তানির জন্য খ্যাত খুলনার দৌলতপুর পাট মোকামে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। সেইসঙ্গে বিপাকে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। প্রায় ৭/৮ হাজার শ্রমিক অলস সময় পার করছে।

ব্রিটিশ আমল থেকে খুলনার দৌলতপুর কাঁচাপাট রপ্তানির প্রধান মোকাম হিসাবে প্রসিদ্ধ। এখানেই এক সময় প্রায় তিন শতাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল। গোডাউন, জুট প্রেস, প্যাকেজিং মিলে এক সময় প্রায় ১৫/১৬ হাজার শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু বিদেশে কাঁচাপাটের বাজার হারানোর কারণে রপ্তানি কমে আসে। কাঁচাপাট রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত ছিল। গত দুই দশক থেকে এই বাংলাদেশের কাঁচাপাট রপ্তানির সিংহ ভাগ যেত ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পাট অধিদপ্তরের সূত্রে বলা হয়েছে, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ১২ লাখ ৩৫ হাজার ১০৮ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়, যাতে এক হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা মূল্যের বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দু’মাসেই ভারতে রপ্তানি হয় দুই লাখ বেল আর বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা এলসি রয়েছে ৩০ হাজার বেল কাঁচাপাটের।

কিন্তু ভারতে এ বছর উৎপাদন বেশি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সরকার এই কাঁচাপাট আমদানি বন্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছে।

কাঁচাপাট রপ্তানিকারক হারুন-অর-রশিদ আকুঞ্জী জানান, ভারতের কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় প্রতিবাদ জানাতে সড়কে পাট পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। এ ঘটনার পর ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পাট কমিশন থেকে গত ১০ অক্টোবর এক নির্দেশনায় সব পাটকল কর্তৃপক্ষের কাছে কাঁচাপাট আমদানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

একই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পাট ও পাট টেক্সটাইল নিয়ন্ত্রণ আদেশের অধীনে উপরোক্ত আদেশ লংঘন করা যে কোনো মিলের উপরোক্ত আইন অথবা আদেশের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়ী হবে।

তিনি আরো জানান, এই আদেশের ফলে রপ্তানির পাইপ লাইনে থাকা ৩০ হাজার বেল পাট রপ্তানি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ভারতীয় জুট মিল মালিক গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রপ্তানি পাইপ লাইনে থাকা ৩০ হাজার বেল পাট যাতে এই নির্দেশনার আওতায় না আনা হয়। কারণ এই রপ্তানীর চুক্তি আগেই হয়েছিল।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই কলকাতা দ্যা টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কেন্দ্র মিলগুলোকে কাঁচা পাট আমদানি বন্ধ করতে বলেছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পাট আমদানির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন। যার মূল্য ৪৪৯ কোটি টাকা। যেখানে রপ্তানি ৩২ হাজার মেট্রিক টন, যার মূল্য ২২২ কোটি টাকা।

পাট কমিশন সম্প্রতি কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য পাটের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে জুট মিলগুলোকে পাট ব্যবহার, মজুত ও দৈনিক লেনদেনের হিসাব পাট কমিশনকে জানাতে বলেছে। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভারতে চলতি মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৯১ লাখ বেল পাট, আর মজুত ২৩ লাখ বেল। এরইমধ্যে ৫ লাখ বেল কাঁচাপাট আমদানি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়াকে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচাপাট সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ।

এদিকে, গতবছর এ সময় কাঁচা পাটের দাম ছিল প্রতি মণ সর্বনিম্ন ২ হাজার ৩৫০ টাকা, এ বছর সেই পাটের মূল্য ১শ’ টাকা। পাটের ভরা মৌসুমে এই সময় খুলনার দৌলতপুরে শত শত ট্রাক পাট বিভিন্ন মোকাম থেকে আসত। কিন্তু এবার বেশিরভাগ আমদানিকারকের অফিস/গোডাউন বন্ধ। নেই শ্রমিকদের কোলাহল। এক কথায় সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ সৈয়দ আলী ভারতে পাট রপ্তানি বন্ধের কথা স্বীকার করে জানান, ভারতীয় জুট মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ।

প্রসঙ্গত, খুলনার দৌলতপুরে কাঁচাপাট রপ্তানি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় ১৫/১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। পাট রপ্তানির নতুন বাজারের সন্ধান না পাওয়া গেলে এই বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ারও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

স/মিফা

 পাটের রপ্তানি বাণিজ্য

খুলনার টার্গেট, ভারতের মার্কেট

আপডেট সময় : ১২:০৩:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ভারতে এ বছর পর্যাপ্ত পাট উৎপাদন হওয়ায় এবং সেখানকার কৃষকদের মূল্য নিশ্চিত করতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পাট কমিশন কার্যালয় থেকে সব জুট মিলকে কাঁচাপাট আমদানি বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। গত ১০ অক্টোবর জারি করা এই নির্দেশনার ফলে পাট রপ্তানির জন্য খ্যাত খুলনার দৌলতপুর পাট মোকামে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। সেইসঙ্গে বিপাকে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। প্রায় ৭/৮ হাজার শ্রমিক অলস সময় পার করছে।

ব্রিটিশ আমল থেকে খুলনার দৌলতপুর কাঁচাপাট রপ্তানির প্রধান মোকাম হিসাবে প্রসিদ্ধ। এখানেই এক সময় প্রায় তিন শতাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল। গোডাউন, জুট প্রেস, প্যাকেজিং মিলে এক সময় প্রায় ১৫/১৬ হাজার শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু বিদেশে কাঁচাপাটের বাজার হারানোর কারণে রপ্তানি কমে আসে। কাঁচাপাট রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত ছিল। গত দুই দশক থেকে এই বাংলাদেশের কাঁচাপাট রপ্তানির সিংহ ভাগ যেত ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পাট অধিদপ্তরের সূত্রে বলা হয়েছে, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ১২ লাখ ৩৫ হাজার ১০৮ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়, যাতে এক হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা মূল্যের বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দু’মাসেই ভারতে রপ্তানি হয় দুই লাখ বেল আর বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা এলসি রয়েছে ৩০ হাজার বেল কাঁচাপাটের।

কিন্তু ভারতে এ বছর উৎপাদন বেশি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সরকার এই কাঁচাপাট আমদানি বন্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছে।

কাঁচাপাট রপ্তানিকারক হারুন-অর-রশিদ আকুঞ্জী জানান, ভারতের কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় প্রতিবাদ জানাতে সড়কে পাট পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। এ ঘটনার পর ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পাট কমিশন থেকে গত ১০ অক্টোবর এক নির্দেশনায় সব পাটকল কর্তৃপক্ষের কাছে কাঁচাপাট আমদানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

একই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পাট ও পাট টেক্সটাইল নিয়ন্ত্রণ আদেশের অধীনে উপরোক্ত আদেশ লংঘন করা যে কোনো মিলের উপরোক্ত আইন অথবা আদেশের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়ী হবে।

তিনি আরো জানান, এই আদেশের ফলে রপ্তানির পাইপ লাইনে থাকা ৩০ হাজার বেল পাট রপ্তানি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ভারতীয় জুট মিল মালিক গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রপ্তানি পাইপ লাইনে থাকা ৩০ হাজার বেল পাট যাতে এই নির্দেশনার আওতায় না আনা হয়। কারণ এই রপ্তানীর চুক্তি আগেই হয়েছিল।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই কলকাতা দ্যা টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কেন্দ্র মিলগুলোকে কাঁচা পাট আমদানি বন্ধ করতে বলেছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পাট আমদানির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন। যার মূল্য ৪৪৯ কোটি টাকা। যেখানে রপ্তানি ৩২ হাজার মেট্রিক টন, যার মূল্য ২২২ কোটি টাকা।

পাট কমিশন সম্প্রতি কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য পাটের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে জুট মিলগুলোকে পাট ব্যবহার, মজুত ও দৈনিক লেনদেনের হিসাব পাট কমিশনকে জানাতে বলেছে। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভারতে চলতি মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৯১ লাখ বেল পাট, আর মজুত ২৩ লাখ বেল। এরইমধ্যে ৫ লাখ বেল কাঁচাপাট আমদানি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়াকে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচাপাট সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ।

এদিকে, গতবছর এ সময় কাঁচা পাটের দাম ছিল প্রতি মণ সর্বনিম্ন ২ হাজার ৩৫০ টাকা, এ বছর সেই পাটের মূল্য ১শ’ টাকা। পাটের ভরা মৌসুমে এই সময় খুলনার দৌলতপুরে শত শত ট্রাক পাট বিভিন্ন মোকাম থেকে আসত। কিন্তু এবার বেশিরভাগ আমদানিকারকের অফিস/গোডাউন বন্ধ। নেই শ্রমিকদের কোলাহল। এক কথায় সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ সৈয়দ আলী ভারতে পাট রপ্তানি বন্ধের কথা স্বীকার করে জানান, ভারতীয় জুট মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ।

প্রসঙ্গত, খুলনার দৌলতপুরে কাঁচাপাট রপ্তানি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় ১৫/১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। পাট রপ্তানির নতুন বাজারের সন্ধান না পাওয়া গেলে এই বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ারও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

স/মিফা