০৮:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তামাকের দাম বাড়ালে রাজস্ব বাড়বে ১০ হাজার কোটি

► তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন
► ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা

 

 

 

 

কার্যকরভাবে করারোপের মাধ্যমে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবি করেছেন তামাকবিরোধীরা। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১১ লাখেরও বেশি অকাল মৃত্যুর সংখ্যা কমবে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের করহার ও দাম বাড়িয়ে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয় ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘তামাক কর ও মূল্য পদক্ষেপ: বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এ দাবি জানানো হয়।
কর্মশালায় জানানো হয়, তামাকবিরোধীদের কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে। এই বাড়তি রাজস্ব চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৫ লাখ তরুণসহ, মোট ১১ লাখেরও অধিক মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

 

কর্মশালায় সাংবাদিকদের সামনে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (এনসিডি) ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক এবং প্রজ্ঞা’র তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক প্রকল্প প্রধান হাসান শাহরিয়ার। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে)-এর প্রোগ্রামস ম্যানেজার (বাংলাদেশ) মো. আব্দুস সালাম, আত্মা’র কনভেনর লিটন হায়দার, কো-কনভেনর মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

 

বক্তারা জানান, বাংলাদেশে সবধরনের তামাকপণ্য অত্যন্ত সস্তা এবং নিত্যপণ্যের তুলনায় এগুলো আরো বেশি সস্তা হয়ে পড়ছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৭টি মহানগরীর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং রংপুর) নিত্যপণ্যের গড় খুচরা মূল্য ২০২১ সালের (৪ জুলাই) তুলনায় ২০২৩ সালে (৪ জুলাই) যে হারে বেড়েছে, সেই হারে তামাক পণ্যের দাম বাড়েনি। এসময়ের মধ্যে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, খোলা আটা ৭৫ শতাংশ, পাঙ্গাস মাছ ৪৭ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ, গুঁড়ো দুধ ৩০ শতাংশ, এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।

 

 

তারা বলেন, বিশেষ করে নিম্ন স্তরে সিগারেটের খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্বল্প আয়ের তামাক ব্যবহারকারীকে ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করবে। বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই কম দামি সিগারেটের ভোক্তা এবং এই স্তরে সম্পূরক শুল্ক হার মাত্র ৫৮ শতাংশ। এজন্য আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের কর ও মূল্যবৃদ্ধির দাবি তুলেন বক্তারা। নিম্ন স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ টাকায় নির্ধারণ করে ৬৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার কথা তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। পাশাপাশি মধ্যম স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১১৩ টাকা থেকে ১৩০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানানো হয়। এই তিনটি স্তরে সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ করার কথা বলেন অংশগ্রহণকারীরা।

 

এছাড়া ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২৫ টাকা এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার জন্য বলা হয়। প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৫৫ টাকা এবং ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে বলেন বক্তারা। এছাড়া সব তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার দাবি জানানো হয় কর্মশালায়।

 

উল্লেখ্য, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতিবছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা একই সময়ে তামাকখাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের (২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা) চেয়ে অনেক বেশি। তামাকের দাম বেশি হলে তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং বর্তমান ব্যবহারকারী বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ছাড়তে বাধ্য হবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

তামাকের দাম বাড়ালে রাজস্ব বাড়বে ১০ হাজার কোটি

আপডেট সময় : ০৭:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল ২০২৪

► তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন
► ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা

 

 

 

 

কার্যকরভাবে করারোপের মাধ্যমে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবি করেছেন তামাকবিরোধীরা। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১১ লাখেরও বেশি অকাল মৃত্যুর সংখ্যা কমবে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের করহার ও দাম বাড়িয়ে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয় ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘তামাক কর ও মূল্য পদক্ষেপ: বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এ দাবি জানানো হয়।
কর্মশালায় জানানো হয়, তামাকবিরোধীদের কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে। এই বাড়তি রাজস্ব চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৫ লাখ তরুণসহ, মোট ১১ লাখেরও অধিক মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

 

কর্মশালায় সাংবাদিকদের সামনে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (এনসিডি) ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক এবং প্রজ্ঞা’র তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক প্রকল্প প্রধান হাসান শাহরিয়ার। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে)-এর প্রোগ্রামস ম্যানেজার (বাংলাদেশ) মো. আব্দুস সালাম, আত্মা’র কনভেনর লিটন হায়দার, কো-কনভেনর মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

 

বক্তারা জানান, বাংলাদেশে সবধরনের তামাকপণ্য অত্যন্ত সস্তা এবং নিত্যপণ্যের তুলনায় এগুলো আরো বেশি সস্তা হয়ে পড়ছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৭টি মহানগরীর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং রংপুর) নিত্যপণ্যের গড় খুচরা মূল্য ২০২১ সালের (৪ জুলাই) তুলনায় ২০২৩ সালে (৪ জুলাই) যে হারে বেড়েছে, সেই হারে তামাক পণ্যের দাম বাড়েনি। এসময়ের মধ্যে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, খোলা আটা ৭৫ শতাংশ, পাঙ্গাস মাছ ৪৭ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ, গুঁড়ো দুধ ৩০ শতাংশ, এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।

 

 

তারা বলেন, বিশেষ করে নিম্ন স্তরে সিগারেটের খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্বল্প আয়ের তামাক ব্যবহারকারীকে ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করবে। বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই কম দামি সিগারেটের ভোক্তা এবং এই স্তরে সম্পূরক শুল্ক হার মাত্র ৫৮ শতাংশ। এজন্য আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের কর ও মূল্যবৃদ্ধির দাবি তুলেন বক্তারা। নিম্ন স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ টাকায় নির্ধারণ করে ৬৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার কথা তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। পাশাপাশি মধ্যম স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১১৩ টাকা থেকে ১৩০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানানো হয়। এই তিনটি স্তরে সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ করার কথা বলেন অংশগ্রহণকারীরা।

 

এছাড়া ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২৫ টাকা এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার জন্য বলা হয়। প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৫৫ টাকা এবং ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে বলেন বক্তারা। এছাড়া সব তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার দাবি জানানো হয় কর্মশালায়।

 

উল্লেখ্য, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতিবছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা একই সময়ে তামাকখাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের (২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা) চেয়ে অনেক বেশি। তামাকের দাম বেশি হলে তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং বর্তমান ব্যবহারকারী বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ছাড়তে বাধ্য হবেন।