❖ মুক্ত হয়ে উচ্ছ্বসিত নাবিক, পরিবারে আনন্দ
❖মুক্তিপণ নিয়ে তীরে উঠতেই গ্রেপ্তার ৮ জলদস্যু
❖ মুক্তিপণের অর্থ জানাতে অনাগ্রহ মালিকপক্ষের
অবশেষে দীর্ঘ একমাস পর সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবল থেকে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ২৩ নাবিকসহ মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি পেয়ে উচ্ছ্বসিত নাবিকরা। তাদের মুক্তির খবরে স্বস্তি ফিরেছে পরিবারের মাঝে। কবে তারা নিজগৃহে ফিরে আসবে এ আনন্দে মাতোয়ারা সদস্য মুক্তিপ্রাপ্ত নাবিকদের স্বজন-পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু মুক্তিপণ দিয়ে ফেরার পথে আবারো জলদস্যুদের কবলে পড়ার শঙ্কায় এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি স্পেন ও ইতালির নৌবাহিনীর স্কর্টে ভারত মহাসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অতিক্রম করছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’সহ নাবিকেরা। সোমালীয় জলদস্যুদের অন্য কোনো গ্রুপ হামলা চালানোর শঙ্কায় এ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মেরিন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর আগে জলদস্যুদের আক্রমণের সময় বারবার সহযোগিতা চেয়ে স্পেন-ইতালিসহ অন্তত চারটি দেশের নৌবাহিনীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি জাহাজটির ২৩ নাবিক। এখন কৃতিত্ব নিতে প্রতিযোগিতা চলছে দেশগুলোর। এদিকে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে তীরে উঠতেই সোমালীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ৮ জলদস্যু। তবে কত টাকায় তাদের মুক্তি মিলেছে তা জানাতে অনাগ্রহ জানিয়েছেন জাহাজটির মালিকপক্ষ।
জানা গেছে, সোমালীয় জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে উপকূল ত্যাগ করে ভারত মহাসাগর অংশে পৌঁছাতেই এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের আশপাশে অবস্থান নেয় অন্তত চারটি দেশের নৌবাহিনীর কয়েকটি বোট। এরপর এসব দেশের নৌসদস্যরা জাহাজটিতে উঠে আসেন। এসময় তারা নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের নাবিকদের সঙ্গে ছবিও তোলেন। অবশ্য জাহাজের নাবিকরা আগে থেকেই বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উল্লাস করছিলেন। মুক্তিপণ দিয়ে ফেরার পথে ভারত মহাসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অতিক্রমের সময় সোমালীয় জলদস্যুদের অন্য কোনো গ্রুপ হামলা চালানোর শঙ্কায় নৌসদস্যরা এ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানান মেরিন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে কেএসআরএম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) শাহরিয়ার জাহান রাহাত জানান, ‘ছয়টি যুদ্ধ জাহাজ ঘিরে রেখেছে ‘এমভি আবদুল্লাহ’কে। তারাও একটি মানসিক চাপের মধ্যে ছিল। আমাদের মতো চারটি দেশের নৌবাহিনীর তাগিদ ছিল, যাতে তাড়াতাড়ি ওই ইস্যুটা সমাধান করা যায়। এ কারণে আল্লাহর রহমতে আমরা এ ইস্যুটা দ্রুত সমাধান করতে পেরেছি।
জানা গেছে, জলদস্যুদের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ নিয়ে একটি উড়োজাহাজ বাংলাদেশ সময় ১৩ এপ্রিল বিকালে জিম্মি জাহাজের ওপর চক্কর দেয়। এসময় জাহাজের ওপরে ২৩ নাবিক অক্ষত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর বিমান থেকে ডলারভর্তি তিনটি ব্যাগ সাগরে ফেলা হয়। স্পিডবোট দিয়ে এসব ব্যাগ জলদস্যুরা কুড়িয়ে নেয়। জাহাজে উঠে দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ গুনে নেয় জলদস্যুরা। তবে চুক্তি অনুযায়ী জাহাজটি যথাসময়ে ছেড়ে দেয়নি দস্যুরা। পরবর্তীতে আশপাশে কেউ আটক করছে কি না, সেটি নিশ্চিত হয়ে জাহাজ থেকে দস্যুরা নেমে যায়। মুক্তিপণের অর্থ নিয়ে সোমালিয়ার সময় ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা ৮ মিনিটে দস্যুরা জাহাজটি ছেড়ে তীরের দিকে চলে যায়। তীরে পৌঁছানোর পর অন্তত আটজন জলদস্যুকে দেশটির পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সোমালিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম গারো অনলাইনের প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই জলদস্যুদের সঙ্গে আল-শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পুন্টল্যান্ড পুলিশ ফোর্সের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গারো অনলাইনকে জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ছিনতাই করা জলদস্যু দলের ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে অভিযানে জলদস্যুদের দেয়া মুক্তিপণের টাকা উদ্ধার হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে মুক্তিপণ কত এবং কীভাবে দেওয়া হয়েছে সেটি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি জাহাজের মালিকপক্ষের কোনো কর্মকর্তা। এদিকে মুক্ত হয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন নাবিকরা। মুক্ত হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোন করে কথা বলেছেন অনেকে। এছাড়া জাতীয় পতাকা হাতে হাসিমুখে দেখা গেছে তাদের। তাদের মুক্তির খবর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে তাদের স্বজন-পরিবারের সদস্যরা। কবে তারা নিজগৃহে ফিরে আসবেন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা। জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজের দ্বিতীয় প্রকৌশলী মো. তৌফিকুল ইসলামের স্ত্রী জোবায়দা নোমান বলেন, আমার স্বামী ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফোন করেছিল। বলেছে, জলদস্যুদের কাছ থেকে মুক্ত হয়েছে, এখন ভালো আছে। তিনি আরও বলেন, বেশিক্ষণ কথা হয়নি। কারণ তখন ব্যস্ত ছিল। সবকিছু গুছিয়ে পরে আবার কথা বলবে বলে জানিয়েছে। বলেছে চিন্তা করো না, দোয়া করো। দুবাই রওনা দিয়েছি। মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ সময় ১৩ এপ্রিল দিবাগত মধ্যরাতে ২৩ নাবিক নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এমভি আবদুল্লাহ। আগামী ১৯ এপ্রিল আরব আমিরাতের বন্দরে পৌঁছার কথা রয়েছে।
এদিকে গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় কেএসআরএমের কর্পোরেট কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেছেন মালিকপক্ষ। কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম বলেন, আমেরিকার একটা কন্ডিশন আছে, একটি ডলার নিতে হলেও তাদের সংস্থার অনুমতি নিতে হয়। ওটা আমাদেরও নিতে হয়েছে। এ ধরনের ইন্টারন্যাশনাল কাজে তাদের অনেক অ্যাসোসিয়েটের সমন্বয় করতে হয়। তিনি বলেন, আমি উদ্ধার প্রক্রিয়া হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে মনোনীত প্রতিনিধি। আমাদের সঙ্গে ওদের কনফারেন্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে মুক্তিপণের বিষয়ে আলোচনা না করার জন্য। সেই অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী আমি আপনাদের সঙ্গে কিছু শেয়ার করতে পারব না। কারণ এটা আমি সই করেছি। মেহেরুল করিম বলেন, উদ্ধার প্রক্রিয়ায় আমরা আমেরিকান নিয়ম মেনেছি এবং ইউকে (যুক্তরাজ্য) ও সোমালিয়ার নিয়ম মেনেছি। ফাইনালি কেনিয়ার নিয়মও মেনেছি। সবার সঙ্গে আমাদের অ্যাগ্রিমেন্ট করা আছে এ বিষয়ে আলোচনা না করার জন্য। তবে আমি আবার বলি, আমরা সবকিছু আইন মেনে করেছি।
এদিকে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ বলেছেন, জলদস্যুদের মুক্তিপণ দিয়ে নাবিকদের উদ্ধারের তথ্য সরকারের কাছে নেই। গত ১৩ এপ্রিল নাবিক মুক্ত হওয়ার সময় জলদস্যুরা নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন নাবিককে জাহাজ থেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের দৃঢ়তায় নাবিকদের নিরাপদ রেখেছে। আমার ধারণা, নাবিকদের দেশে ফিরতে ২০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়কালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবল থেকে বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’ ও ২৩ নাবিককে মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে ডলার ভর্তি ব্যাগ সাগরে ফেলার যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, জিম্মি বাংলাদেশি নাবিকদের মুক্ত করতে মুক্তিপণ লেগেছে এমন কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। সোমালিয়ান জলদস্যুদের মুক্তিপণ দেওয়ার প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও এডিট করা হয়ে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জানতাম পরিত্যক্ত জিনিস পানিতে ফেলে। ডলারের মতো এত দামি জিনিস যে পানিতে ফেলে, তা জানা ছিল না’। তিনি বলেন, এটা এখন কোন সিনেমার ছবি আমি তো জানি না। এমন ছবি তো আমরা অনেক সিনেমায় দেখি। কোন ছবি কোথায় গিয়ে কীভাবে যুক্ত হয়েছে, কোনটার সঙ্গে কোনটা এডিট হয়েছে আমি জানি না।
প্রসঙ্গত, গত ১২ মার্চ বিকালে সোমালীয় উপকূল থেকে অন্তত সাড়ে ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরে এসে ভারত মহাসাগরে ২৩ নাবিকসহ এমভি আবদুল্লাহ জাহাজকে জিম্মি করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। সেখানে থাকা ২৩ নাবিককে একটি কেবিনে আটকে রাখে। আটকের পর জাহাজটিকে সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৫৮ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে গত ৪ মার্চ আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে এমভি আবদুল্লাহ। ১৯ মার্চ সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। জিম্মি জাহাজ আটকে তারা মুক্তিপণ দাবি করে। বিষয়টি মালিকপক্ষ সরাসরি স্বীকার না করলেও মুক্তিপণ দিয়েই জাহাজটিকে মুক্ত করেছে তারা। এর আগে ১৪ বছর আগে একই মালিকের আরেকটি জাহাজ এমভি জাহান মণিকেও একইভাবে মুক্ত করে কেএসআরএম গ্রুপ। এবার জলদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা পেতে জরুরি বার্তা দিয়েছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। তাৎক্ষণিকভাবে তারা কোনো সহায়তা করেনি। পরবর্তীতে জাহাজটি সোমালীয় উপকূলে পৌঁছার পর আক্রমণ করে জিম্মি ২৩ নাবিককে মুক্ত করে আনার পরিকল্পনা করলেও তাতে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ সরকার এবং জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম। সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল বিকালে জলদস্যুদের কাছে বিমানে করে পৌঁছানো হয় মুক্তিপণের ডলার ভর্তি তিনটি ব্যাগ। অর্থ পেয়েই মধ্যরাতে ২৩ নাবিকসহ জাহাজটি মুক্ত করে দেয় জলদস্যুরা।
























