ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ডামাডোলে যেন হারিয়ে গিয়েছিল গাজায় তেল আবিবের আগ্রাসনের বিষয়টি। তবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যেও থেমে থাকেনি আগ্রাসন। গত শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ফিলিস্তিনি অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা ৩৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৪ হাজার ১২ জন ফিলিস্তিনি। এই সময়ে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির হামলায় আহত হয়েছে আরো অন্তত ৭৬ হাজার ৮৩৩ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮০০-এরও বেশি শিশু এবং নারী ৮ হাজার ৪০০ জন। এছাড়া গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ ৮ হাজারের বেশি। এর বাইরে ফিলিস্তিনি অপর ভূখণ্ড পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে অন্তত ৪৮৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো অন্তত ৪ হাজার ৮০০ জন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।
এদিকে স্থানীয় সময় গতকাল ভোরের দিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত রাফাহে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই শিশু। রাফাহের একটি আবাসিক ভবনে হামলার ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া রাফাহে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। এর ফলে রাফাহের অধিকাংশ কৃষিজমিই নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের তুলকারেমের নূর শামস শরণার্থীশিবিরে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। এ নিয়ে দ্বিতীয় দিন চলছে দেশটির সেনাদের অভিযান। এই অভিযানে এক কিশোরসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েল বাহিনী গভীর রাতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের তুলকারেমের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত নূর শামস শরণার্থীশিবিরে অভিযান শুরু করে। টানা ১২ ঘণ্টার অভিযান শেষে শুক্রবার সকালে ইসরায়েলি বাহিনী বুলডোজার ব্যবহার করে রাস্তা, দোকানপাট ও আবাসিক বাড়িঘর ধ্বংস করে। ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির প্রতিরক্ষাবাহিনী নূর শামস শরণার্থীশিবিরে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। গতকাল শনিবার ভোর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী নূর শামসে অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং ফিলিস্তিনি যোদ্ধারাও ইসরায়েলিদের ঠেকাতে সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের শহর রাফায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। মূলত রাফারর একটি আবাসিক ভবনে এই হামলা চালায় দখলদার বাহিনী। তাছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরের তুলকারেমে নুর শামস শরণার্থী ক্যাম্পে ইসরায়েলি বাহিনী দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান চালিয়েছে। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি রাফার এলাকায় সেনা সংখ্যা বাড়িয়েছে ইসরায়েল।
অন্যদিকে হাসপাতালের মর্গে হাঁটু গেড়ে বসে কোলে কাফনে মোড়ানো শিশুর লাশ জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার দক্ষিণে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের মর্গের ঐ ছবি গত বছরের ১৭ অক্টোবর তুলেছিলেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ সালেম। ইসরায়েলের হামলায় গাজার হাজারো মানুষের মৃত্যু আর স্বজনদের আর্তনাদের চিত্র তুলে ধরে চলতি বছরের ‘২০২৪ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতেছেন তিনি।
রয়টার্স লিখেছে, নাসের হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের লাশ খুঁজছিলেন ইসরায়েলের হামলায় প্রিয়জন হারা ফিলিস্তিনিরা। সে সময় ৩৬ বছর বয়সি নারী ইনাস আবু মামার মর্গে তার ভাতিজিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। ইসরায়েলের বোমা বর্ষণে নিহত পাঁচ বছরের ঐ শিশু সেলির মরদেহ ছিল কাফনে মোড়া। পুরস্কার গ্রহণ করে ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ সালেম বলেন, ‘পুরস্কার জিতে উদযাপন করার মতো ছবি এটি নয়।’
১৩০টি দেশের ৩ হাজার ৮৫১ জন ফটোগ্রাফারের ৬১ হাজার ৬২টি ছবি থেকে সেরা ছবিগুলো বেছে নেয় জুরি বোর্ড। নেদারল্যান্ডসের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’ ফাউন্ডেশন এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। জুরি সদস্য, গার্ডিয়ান নিউজ অ্যান্ড মিডিয়ার ফটোগ্রাফি প্রধান ফিওনা শিল্ড সালেমের তোলা ছবি সম্পর্কে বলেন, ছবিটি গভীর মর্মভেদী। ৩৯ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক সালেম ২০০৩ সাল থেকে রয়টার্সের সঙ্গে কাজ করছেন। ২০১০ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায়ও একটি পুরস্কার জেতেন।

























