০৮:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় শিক্ষা কার্যক্রমে হযবরল

• বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক
• গরমে ক্লাসে গিয়ে অসুস্থ বহু শিক্ষার্থী
• স্কুল-মাদরাসা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
• বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সব প্রাথমিক ও আজ ২৭ জেলার স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা
• নির্দেশনা অমান্যের বিষয় খতিয়ে দেখা ও হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর

দেশের সব শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় দুটি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দেশনায়। তবে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বেশ সমন্বয়হীনতার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। শ্রেণি কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিভি- ন্ন বিষয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলেও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ চলমান তীব্র তাপদাহের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু/বন্ধ করা নিয়ে নানা সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয় দুটির সমন্বয়হীনতার প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। এর আগে রোজায় স্কুল ছুটি নিয়েও একই ধরণের ঘটনা ঘটে। সূত্রমতে, পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে গত ২১ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার কথা ছিল। তবে দেশে তীব্র তাপদাহের কারণে আরো একসপ্তাহ ছুটি বাড়ায় সরকার। তবে এ সময়েও তাপদাহ অব্যাহত এমনকি আবহাওয়া অফিস থেকে হিট অ্যালার্ট জারি থাকায় স্কুলের ছুটি আরো বাড়ানোর দাবি ওঠে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে।

অবশ্য এসময়ে একেবারে বন্ধ না রেখে অনলাইনে ক্লাস চালুরও পরামর্শ দেয় সংশ্লিষ্ট মহল। তবে এসব দাবি উপেক্ষা করেই কিছু নির্দেশনা অনুযায়ী ২৮ এপ্রিল সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে। আর তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে স্কুলে হাজির হতে গিয়ে বহু শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি গরমের কারণে দুইজন শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড়ের এক পর্যায়ে রোববার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঢাকাসহ ৫ জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সোমবার বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। অবশ্য এ ঘোষণারও উল্টোদিকে অবস্থান নিয়ে সোমবারও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসার নির্দেশনা বহাল রাখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীন এ সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মহলে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, রোববার রাতের সিদ্ধান্ত ঠিকমতো প্রচার না হওয়া বা জানতে না পারার অজুহাতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়নি। কোথাও স্কুল খোলা আবার কোথাও বন্ধ দেখা যায়। স্কুল খোলা রাখার কারণ হিসেবে সরকারি কোনো অর্ডার না হওয়ার যুক্তি তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। আর স্কুল খোলা থাকায় গরম উপেক্ষা করেই প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ক্লাসে হাজির হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য সোমবার ছুটির নোটিস প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, জরুরি নোটিস প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই জানানো হয়। এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই। অফিসিয়াল অর্ডার করতে সময় লাগে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে সোমবার স্কুল খোলা রাখার বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন রোববার জানিয়েছিলেন, যেহেতু প্রাথমিকের ক্লাস নতুন সময়সূচিতে তথা মর্নিং আওয়ারে হচ্ছে তাই বন্ধের প্রয়োজন নেই। আগের নিয়মানু- যায়ী খোলাই থাকবে। স্কুল-কলেজ খোলা নিয়ে বিতর্ক হলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকই অনলাইন কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা বন্ধ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে গতকাল নতুন নির্দেশনা এসেছে হাইকোর্ট থেকে। তীব্র গরম ও চলমান তাপদাহের মধ্যে সারাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং মাদ্রাসার পাঠদান আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গতকাল সোমবার বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। আদেশে আদালত বলেছেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) রয়েছে সেগুলোতে যথারীতি পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম চলবে। এছাড়া যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার দিন ধার্য করা থাকে সেক্ষেত্রে সিডিউল অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান জামান আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এসি নেই, তীব্র গরমের কারণে এ ধরনের প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলো বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার দিন ধার্য থাকলে নির্ধারিত সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া যাবে বলেও জানান এ আইনজীবী।

এদিকে হাইকোর্টের এ নির্দেশনাও উপেক্ষা করে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তীব্র তাপদাহের কারণে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের সব, ঢাকা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ, রংপুরের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, বরিশালের পটুয়াখালীসহ মোট ২৭ জেলার সব মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু আজ মঙ্গলবার বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা এম এ খায়ের মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, দেশে চলমান তাপদাহের কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দেশে তীব্র তাপদাহের কারণে শিশু শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা বিবেচনায় আগের অবস্থান থেকে সরে এসে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের বিদ্যালয় ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর লার্নিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। এদিকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার হাইকোর্টের নির্দেশের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। সবকিছুতেই কেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর আদালতের নিদের্শনা নিয়ে আসতে হবে? হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাবেন বলে জানান তিনি। গতকাল বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিজ্ঞান কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছেন- সংবাদমাধ্যমে আসা এমন খবর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা অসুস্থ হয়েছেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাকি অন্যত্র ছিলেন তাও দেখার বিষয়। এছাড়া ঢাকাসহ পাঁচ জেলায় তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বন্ধের নির্দেশনার পরও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা রাখা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি বিরাজমান তাপমাত্রার পরও খোলা রাখে তাহলে সেটা দেখা হবে। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি ঠিক নয় বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রাখা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আসলে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা নয়। আসলে প্রাথমিকের ক্লাস যে সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সেই সময়ের মধ্যে ঝুঁকি না থাকায় সেটা খোলা রেখেছে তারা। সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার পথে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে জয় কানাডা-ওমান ও নামিবিয়ার

দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় শিক্ষা কার্যক্রমে হযবরল

আপডেট সময় : ০৮:০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৪

• বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক
• গরমে ক্লাসে গিয়ে অসুস্থ বহু শিক্ষার্থী
• স্কুল-মাদরাসা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
• বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সব প্রাথমিক ও আজ ২৭ জেলার স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা
• নির্দেশনা অমান্যের বিষয় খতিয়ে দেখা ও হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর

দেশের সব শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় দুটি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দেশনায়। তবে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বেশ সমন্বয়হীনতার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। শ্রেণি কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিভি- ন্ন বিষয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলেও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ চলমান তীব্র তাপদাহের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু/বন্ধ করা নিয়ে নানা সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয় দুটির সমন্বয়হীনতার প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। এর আগে রোজায় স্কুল ছুটি নিয়েও একই ধরণের ঘটনা ঘটে। সূত্রমতে, পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে গত ২১ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার কথা ছিল। তবে দেশে তীব্র তাপদাহের কারণে আরো একসপ্তাহ ছুটি বাড়ায় সরকার। তবে এ সময়েও তাপদাহ অব্যাহত এমনকি আবহাওয়া অফিস থেকে হিট অ্যালার্ট জারি থাকায় স্কুলের ছুটি আরো বাড়ানোর দাবি ওঠে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে।

অবশ্য এসময়ে একেবারে বন্ধ না রেখে অনলাইনে ক্লাস চালুরও পরামর্শ দেয় সংশ্লিষ্ট মহল। তবে এসব দাবি উপেক্ষা করেই কিছু নির্দেশনা অনুযায়ী ২৮ এপ্রিল সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে। আর তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে স্কুলে হাজির হতে গিয়ে বহু শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি গরমের কারণে দুইজন শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড়ের এক পর্যায়ে রোববার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঢাকাসহ ৫ জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সোমবার বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। অবশ্য এ ঘোষণারও উল্টোদিকে অবস্থান নিয়ে সোমবারও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসার নির্দেশনা বহাল রাখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীন এ সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মহলে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, রোববার রাতের সিদ্ধান্ত ঠিকমতো প্রচার না হওয়া বা জানতে না পারার অজুহাতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়নি। কোথাও স্কুল খোলা আবার কোথাও বন্ধ দেখা যায়। স্কুল খোলা রাখার কারণ হিসেবে সরকারি কোনো অর্ডার না হওয়ার যুক্তি তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। আর স্কুল খোলা থাকায় গরম উপেক্ষা করেই প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ক্লাসে হাজির হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য সোমবার ছুটির নোটিস প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, জরুরি নোটিস প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই জানানো হয়। এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই। অফিসিয়াল অর্ডার করতে সময় লাগে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে সোমবার স্কুল খোলা রাখার বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন রোববার জানিয়েছিলেন, যেহেতু প্রাথমিকের ক্লাস নতুন সময়সূচিতে তথা মর্নিং আওয়ারে হচ্ছে তাই বন্ধের প্রয়োজন নেই। আগের নিয়মানু- যায়ী খোলাই থাকবে। স্কুল-কলেজ খোলা নিয়ে বিতর্ক হলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকই অনলাইন কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা বন্ধ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে গতকাল নতুন নির্দেশনা এসেছে হাইকোর্ট থেকে। তীব্র গরম ও চলমান তাপদাহের মধ্যে সারাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং মাদ্রাসার পাঠদান আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

গতকাল সোমবার বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। আদেশে আদালত বলেছেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) রয়েছে সেগুলোতে যথারীতি পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম চলবে। এছাড়া যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার দিন ধার্য করা থাকে সেক্ষেত্রে সিডিউল অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান জামান আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এসি নেই, তীব্র গরমের কারণে এ ধরনের প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলো বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার দিন ধার্য থাকলে নির্ধারিত সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া যাবে বলেও জানান এ আইনজীবী।

এদিকে হাইকোর্টের এ নির্দেশনাও উপেক্ষা করে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তীব্র তাপদাহের কারণে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের সব, ঢাকা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ, রংপুরের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, বরিশালের পটুয়াখালীসহ মোট ২৭ জেলার সব মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু আজ মঙ্গলবার বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা এম এ খায়ের মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, দেশে চলমান তাপদাহের কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দেশে তীব্র তাপদাহের কারণে শিশু শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা বিবেচনায় আগের অবস্থান থেকে সরে এসে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের বিদ্যালয় ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর লার্নিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। এদিকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার হাইকোর্টের নির্দেশের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। সবকিছুতেই কেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর আদালতের নিদের্শনা নিয়ে আসতে হবে? হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাবেন বলে জানান তিনি। গতকাল বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিজ্ঞান কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছেন- সংবাদমাধ্যমে আসা এমন খবর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা অসুস্থ হয়েছেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাকি অন্যত্র ছিলেন তাও দেখার বিষয়। এছাড়া ঢাকাসহ পাঁচ জেলায় তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বন্ধের নির্দেশনার পরও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা রাখা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি বিরাজমান তাপমাত্রার পরও খোলা রাখে তাহলে সেটা দেখা হবে। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি ঠিক নয় বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রাখা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আসলে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা নয়। আসলে প্রাথমিকের ক্লাস যে সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সেই সময়ের মধ্যে ঝুঁকি না থাকায় সেটা খোলা রেখেছে তারা। সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার পথে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।