০৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হোক

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। তারুণ্যের দেশ বললেও ভুল হবেনা। কারণ গতবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যে যা সংখ্যায় দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৭ লাখের বেশী। যারমধ্যে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী জনসংখ্যা ৩ কোটি ২ লাখ।
সময়ের সাথে সাথে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা। অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যার প্রমাণ বড় বড় প্রকল্প গুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা। যুবসমাজকে দক্ষ করতে নানামুখী আলোচনা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হলো চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার সীমাবদ্ধতা। বয়সসীমা শেষ হওয়ার ভয়ে যুবসমাজ দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে  চাকরির পিছনে ছুটছে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। পুলিশের এসআই-সার্জেন্টসহ কিছু পদে ২৭ বছর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বয়সসীমার এই নীতি মেনে চলছে। ফলে ৩০ বছরের পরে একজন যুবককে বেকারত্বের গ্লানি নিয়ে চলতে হয়।
অথচ এদেশর প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে সময় লাগে ২৫ থেকে ২৬ বছর।
যেখানে একজন স্নাতকে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীকে নিজ পাঠ্য ও গবেষণায় মনোনিবেশ করার কথা সেখানে অসংখ্য শিক্ষার্থী বয়সসীমা শেষ হওয়ায় ভয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় সময় না দিয়ে একাডেমিকের সাথে সম্পূর্ণ অমিল সরকারি চাকুরির পড়াশোনায় ব্যস্ত। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার আতুড়ঘর হওয়ার কথা সেখানে বিসিএস প্রস্তুতির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
অসংখ্য শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ  কিংবা গবেষণা করতে গিয়ে বয়স ৩০ বছর অতিক্রম করায় তারা বিদেশেই থেকে যাচ্ছেন।
জানা যায়, বর্তমান বিশ্বের ১৬২ টি  দেশের চাকরির নিয়োগে আবেদনের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত। এমনকি অনেক দেশে আগ্রহী ব্যক্তিরা অবসর গ্রহণের ঠিক আগের দিনও সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেন।
যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়ায় অবসরের আগের দিনও যোগ্যতা থাকলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে  ৬৫ বছর এবং সিভিল সার্ভিসের ক্ষেত্রে ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করা যায়।
আমরা সকলকিছুতে উন্নত দেশ গুলোর উদাহরণ দেই, তাদের সবকিছু অনুসরণ করি। তাহলে শুধুমাত্র এই ক্ষেত্রে কেন বিপরীতে অবস্থান? তারা যদি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত রেখে উন্নত দেশে  পরিণত  হতে পারে তাহলে আমরা কেন বয়সসীমা বৃদ্ধি করতে নারাজ?
১৯৯১ বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে ৩০ বছর করা হয়। এরপর ৩৩ বছর পেরিয়ে গেছে, এদেশের মানুষের গড় আয়ু ৫৭ বছর থেকে ৭৩ বছরে উন্নিত হয়েছে তবুও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি।
শুধু তাই নয়, ২০১১ সালে ডিসেম্বর মাসে  দাবিদাওয়া ছাড়াই একতরফা ভাবে শুধু অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৫৯ বছর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য ৬০ বছর করা হয়। কিন্তু প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি।
এদেশের শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও গবেষকেরা বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি বিষয়টি উপলব্ধি করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের  নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
একই দেশের নাগরিক হয়েও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর হলেও এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজে ৩৫ বছর এবং সরকারি নার্সিং এ ৩৫ বছর।
বড় আক্ষেপের বিষয়, জাতীয় যুব নীতিতে ১৮-৩৫ বছর বয়সীদের যুবক বলে গণ্য হলেও ৩০ বছর বয়সে তাদেরকে চাকরিতে আবেদনের সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না।
করোনা মহামারীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময়মতো ক্লাস পরিক্ষা না হওয়ায় তীব্র সেশনজটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। করোনা মহামারীর শুরুতে যাদের বয়স ২৭-২৯ বছর ছিল তাদের বয়স এখন ৩০ বা ততোধিক। ফলে তারা ৩০ বছরের পরিবর্তে ২৭ বছর সময় পেয়েছে। যার ফলে অসংখ্য শিক্ষিত যুবক এখন বেকার হয়ে বসে আছে এবং এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে।
সবশেষে বলতে চাই, দক্ষ জনশক্তি রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার বাঁধা দূর করে দক্ষতাকে মূল্যায়ন করা জরুরি। এদেশের যুবসমাজকে বেকারত্বের হাত থেকে মুক্ত করতে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে চাকরীতে আবেদনের বয়সসীমা অন্তত ৩৫ বছর করা হোক।

রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছেন তিন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হোক

আপডেট সময় : ০৮:৪১:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ মে ২০২৪
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। তারুণ্যের দেশ বললেও ভুল হবেনা। কারণ গতবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যে যা সংখ্যায় দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৭ লাখের বেশী। যারমধ্যে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী জনসংখ্যা ৩ কোটি ২ লাখ।
সময়ের সাথে সাথে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা। অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যার প্রমাণ বড় বড় প্রকল্প গুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা। যুবসমাজকে দক্ষ করতে নানামুখী আলোচনা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হলো চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার সীমাবদ্ধতা। বয়সসীমা শেষ হওয়ার ভয়ে যুবসমাজ দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে  চাকরির পিছনে ছুটছে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। পুলিশের এসআই-সার্জেন্টসহ কিছু পদে ২৭ বছর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বয়সসীমার এই নীতি মেনে চলছে। ফলে ৩০ বছরের পরে একজন যুবককে বেকারত্বের গ্লানি নিয়ে চলতে হয়।
অথচ এদেশর প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে সময় লাগে ২৫ থেকে ২৬ বছর।
যেখানে একজন স্নাতকে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীকে নিজ পাঠ্য ও গবেষণায় মনোনিবেশ করার কথা সেখানে অসংখ্য শিক্ষার্থী বয়সসীমা শেষ হওয়ায় ভয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় সময় না দিয়ে একাডেমিকের সাথে সম্পূর্ণ অমিল সরকারি চাকুরির পড়াশোনায় ব্যস্ত। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার আতুড়ঘর হওয়ার কথা সেখানে বিসিএস প্রস্তুতির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
অসংখ্য শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ  কিংবা গবেষণা করতে গিয়ে বয়স ৩০ বছর অতিক্রম করায় তারা বিদেশেই থেকে যাচ্ছেন।
জানা যায়, বর্তমান বিশ্বের ১৬২ টি  দেশের চাকরির নিয়োগে আবেদনের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত। এমনকি অনেক দেশে আগ্রহী ব্যক্তিরা অবসর গ্রহণের ঠিক আগের দিনও সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেন।
যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়ায় অবসরের আগের দিনও যোগ্যতা থাকলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে  ৬৫ বছর এবং সিভিল সার্ভিসের ক্ষেত্রে ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করা যায়।
আমরা সকলকিছুতে উন্নত দেশ গুলোর উদাহরণ দেই, তাদের সবকিছু অনুসরণ করি। তাহলে শুধুমাত্র এই ক্ষেত্রে কেন বিপরীতে অবস্থান? তারা যদি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত রেখে উন্নত দেশে  পরিণত  হতে পারে তাহলে আমরা কেন বয়সসীমা বৃদ্ধি করতে নারাজ?
১৯৯১ বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে ৩০ বছর করা হয়। এরপর ৩৩ বছর পেরিয়ে গেছে, এদেশের মানুষের গড় আয়ু ৫৭ বছর থেকে ৭৩ বছরে উন্নিত হয়েছে তবুও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি।
শুধু তাই নয়, ২০১১ সালে ডিসেম্বর মাসে  দাবিদাওয়া ছাড়াই একতরফা ভাবে শুধু অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৫৯ বছর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য ৬০ বছর করা হয়। কিন্তু প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি।
এদেশের শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও গবেষকেরা বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি বিষয়টি উপলব্ধি করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের  নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
একই দেশের নাগরিক হয়েও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর হলেও এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজে ৩৫ বছর এবং সরকারি নার্সিং এ ৩৫ বছর।
বড় আক্ষেপের বিষয়, জাতীয় যুব নীতিতে ১৮-৩৫ বছর বয়সীদের যুবক বলে গণ্য হলেও ৩০ বছর বয়সে তাদেরকে চাকরিতে আবেদনের সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না।
করোনা মহামারীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময়মতো ক্লাস পরিক্ষা না হওয়ায় তীব্র সেশনজটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। করোনা মহামারীর শুরুতে যাদের বয়স ২৭-২৯ বছর ছিল তাদের বয়স এখন ৩০ বা ততোধিক। ফলে তারা ৩০ বছরের পরিবর্তে ২৭ বছর সময় পেয়েছে। যার ফলে অসংখ্য শিক্ষিত যুবক এখন বেকার হয়ে বসে আছে এবং এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে।
সবশেষে বলতে চাই, দক্ষ জনশক্তি রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার বাঁধা দূর করে দক্ষতাকে মূল্যায়ন করা জরুরি। এদেশের যুবসমাজকে বেকারত্বের হাত থেকে মুক্ত করতে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে চাকরীতে আবেদনের বয়সসীমা অন্তত ৩৫ বছর করা হোক।