❖হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ৩৫, মৃত ১৫
❖৪২ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা তীব্র তাপপ্রবাহ
❖বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস তাপ ধরে রাখছে
❖তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে নবজাতক, গর্ভবতী মা, শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষ
পুরো এপ্রিল মাস তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবারও দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। গত তাপপ্রবাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন হিট স্ট্রোক করেছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৫ জন। এই অবস্থায় তাপপ্রবাহকে ভীতি হিসেবে না দেখে এটি কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, সে বিষয়ে জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ ও দুজন নারী। তবে বেসরকারিভাবে, হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়া মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। কেননা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২২ এপ্রিল থেকে অর্থাৎ তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার ২০ দিন পর থেকে এই তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
ইউনিসেফের মতে, যখন টানা কয়েক দিন কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেশি হয়, তখন সে অঞ্চলের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে চলেছে বলে উল্লেখ করা হয়। সঙ্গে আর্দ্রতা থাকলে গরমের অনুভূতি যায় আরো বেড়ে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত তাপপ্রবাহ সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙায় ৪৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। এ বছরের এপ্রিল মাসের তাপপ্রবাহ শেষে মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহ আবারও তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ বেশি হচ্ছে। এতে যেসব অঞ্চলে গাছপালা কম, সেসব অঞ্চলের মানুষ বিপাকে পড়ছে বেশি। গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ বৃদ্ধির ফলে নানাভাবে বিপদে পড়ছে পৃথিবী। বায়ুমণ্ডলে থাকা এই গ্রিনহাউস গ্যাস তাপ ধরে রাখছে। আর এর ফলে তাপমাত্রা যাচ্ছে বেড়ে।
তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আছে শিশু ও বয়স্করা। নবজাতক, গর্ভবতী মা, বয়স্কদের মধ্যে যারা বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত তারাও বেশি ঝুঁকিতে আছে। ঝুঁকিতে আছে শ্রমজীবী মানুষ যারা প্রখর রোদে কাজ করেন।
এদিকে, তাপপ্রবাহ থেকে সুরক্ষার জন্য কী কী করতে হবে, তা জানিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় গাইডলাইন বা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ৫ মে এই নির্দেশিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় ১৭টি অধ্যায়ের মাধ্যমে গরম থেকে কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে, কেউ গরমজনিত অসুস্থতার শিকার হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কী করতে হবে, সে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ হয়ে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে কোন বয়সীদের জন্য চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা কী ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নেবেন, সে ব্যাপারে বলা হয়েছে।
তাপপ্রবাহে শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে ইউনিসেফ বাংলাদেশের উপপ্রতিনিধি এম্মা ব্রিগহাম বলেছেন, তাপপ্রবাহের কারণে অপরিণত শিশু জন্মের ঝুঁকি বেশি। তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে অপরিণত শিশু জন্মের ঝুঁকি ৫ শতাংশ বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সাড়ে ৩ কোটির বেশি শিশু তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হবে। ২০২০ সালে ২৬ লাখ শিশু এই ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছিল।
তাপপ্রবাহ প্রতিরোধে করণীয় প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে শরীর অনেক সময় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দেয়। এ সময় কলেরা, আমাশয়, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস, পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।
গাইডলাইনে তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার পরামর্শ হিসেবে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ প্রতিরোধে গরম থেকে দূরে থাকতে হবে ও মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নিতে হবে। সারা দিনে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে। প্রয়োজনে একবারের বেশি গোসল করতে হবে। ঢিলেঢালা পাতলা কাপড় পরতে হবে ও সম্ভব হলে রঙিন পোশাক এড়িয়ে যেতে হবে। অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যেমন ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে গরমের আগেই করণীয় সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রচণ্ড গরমে প্রয়োজন না হলে বয়স্ক, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গর্ভবতী মা ও শিশুদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দিনের প্রথম দিকে অথবা বিকালে যখন তাপমাত্রা কম থাকে, তখন নির্ধারণ করতে হবে। নবজাতককে নিয়মিত মায়ের দুধ পান করাতে হবে। শিশুদের তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)’র মতে, দেশে গরম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ গত ২৮ বছরে ঢাকা থেকে ২৪ বর্গকিলোমিটারের সমআয়তনের জলাধার এবং ১০ বর্গকিলোমিটারের সমপরিমাণ সবুজ কমে গেছে। এখন জেলা-উপজেলা পর্যায়েও পুকুর বা জলাধার ভরাট করে পরিকল্পনাহীন ভবন নির্মাণ চলছে। তাই নগরগুলোয় পরিকল্পিত ভবন এবং তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোয় ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করে ২৫-৩০ শতাংশ সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজেলচালিত গণপরিবহন কমিয়ে মেট্রো রেলের মতো বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ করতে হবে। শহরের সুবিধাগুলোকে শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে জনসংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। শীতাতপ যন্ত্রের ব্যবহার এবং কংক্রিটের পরিমাণ কমাতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে মাংসের পরিবর্তে সবজি এবং ফলের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। ভাজাপোড়া, দুগ্ধজাত ও চর্বিজাতীয় খাবার কমাতে হবে। কারণ এসব খাদ্যের উৎপাদন ও পরিবহনে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়। তাই হোটেল-রেস্টুরেন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ঘরে তৈরি খাবার খেতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক বলেন, গরমজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। শীতল জায়গায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। খুব প্রয়োজন ছাড়া রোদে যত কম থাকা যায় সেটা করতে হবে। কাপড় পরার সময় মনে রাখতে হবে যেন সাদা রঙয়ের কাপড় পরা হয়। সাদা রঙয়ের কাপড় লাইট রিফেøক্ট করে। ফলে তাপটা কম লাগে। আর যদি খুব বেশি কালো বা গাঢ় রঙয়ের পোশাক পরা হয় তাহলে গরমটা বেশি লাগে। সুতির কাপড়, সাদা ও হালকা রঙয়ের কাপড় পরতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন হিট স্ট্রোকের লক্ষণ প্রসঙ্গে বলেন, শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া, গরমে অচেতন হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরানো, তীব্র মাথা ব্যথা, ঘাম কমে যাওয়া, ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা ও পেশিতে টান অনুভব করা, বমি হওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাস কষ্ট হওয়া, মানসিক বিভ্রম, খিচুনি ইত্যাদি।
হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কারো হিট স্ট্রোক হলে বা অচেতন হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো- হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে নিয়ে যেতে হবে। রোগীর শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় কাপড় খুলে ফেলতে হবে, রোগীর শরীরে বাতাস করতে হবে, কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে গা মুছে ফেলতে হবে, শরীরের তাপমাত্রা কমাতে বগল, ঘাড়, পিঠ ও কুচকিতে আইসপ্যাক ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেছেন, গরমের তীব্রতা কমাতে গাছপালা রোপণের দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে।
রোববার থেকে বাড়বে তাপমাত্রা, কমবে বৃষ্টিঃ পুরো এপ্রিল মাসে তাপপ্রবাহ চলার পর কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবারও তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামীকাল ১২ এপ্রিল রোববার থেকে বর্তমান মেঘলা আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে ধীরে ধীরে তাপপ্রবাহের দিকে যাবে এমনটি ধারণা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ তাপপ্রবাহ ১৫ এপ্রিল থেকে ৩১ এপ্রিল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
গতকাল শুক্রবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে আগামী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমানে একটি লঘুচাপ চলছে। এর বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে কোথাও কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল। এসময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত ছিল। আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। দিনের ও রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আগামীকাল রোববার সকাল ৯টা থেকে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এসময় দিনে ও রাতে সারা দেশের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী পাঁচদিনের আবহাওয়ায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪.৮ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে; যা এই মৌসুমের স্বাভাবিক তাপমাত্রা।

























