➤ অধিকাংশ ফার্মেসিতে নেই ফ্রিজ-এসি
➤ হ্রাস পাচ্ছে ওষুধের কার্যক্ষমতা, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
➤ নিবন্ধিত ২ লক্ষাধিক ফার্মেসির মধ্যে কোল্ড চেইনে মাত্র ৫২৮টি
➤ ক্রেতা-বিক্রেতাকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ
মাঝে দু’দিন বিরতির মধ্যে টানা তিন সপ্তাহ ধরে সারা দেশে চলছে তাপপ্রবাহ। এ অবস্থায় দোকানে নির্দেশিত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন ফার্মেসি ও দোকানে থাকা ওষুধের গুণগতমান কমে যাচ্ছে। অনুমোদন ছাড়াই যেখানে-সেখানে খোলা হচ্ছে ওষুধের দোকান। ওষুধ কিভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, সেই নিয়ম-নীতিও জানেন না রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ফার্মেসির মালিক-কর্মচারীরা। এরমধ্যে অধিকাংশ ফার্মেসিতে নেই ওষুধের মান রক্ষায় ব্যবহৃত ফ্রিজ বা এসি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি তাপমাত্রার কারণে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক, অয়েন্টমেন্ট, জেল জাতীয় ওষুধ ও ইনসুলিনসহ গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ ওষুধই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এসব ওষুধ ব্যবহারে পাশর্^প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে মানবদেহে আরও জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। এর ফলে হুমকির মুখে রয়েছে জনস্বাস্থ্য। এমন বাস্তবতায় ওষুধের গুণগত মান ধরে রাখতে হলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, দেশে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে মাত্র ৫২৮টিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে বেশিরভাগ দোকানে সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। সংস্থাটি বলছে, সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন ওষুধের দোকান সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ ওষুধের নির্দেশিকায় বা মোড়কে ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহের তাপপ্রবাহে নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওষুধ সংরক্ষণ করতে পারছেন না ওষুধ ব্যবসায়ীরা। কিছু মডেল ফার্মেসি ছাড়া বেশিরভাগ ফার্মেসিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের (এসি) ব্যবস্থা নেই। বাকিগুলোতে ফ্যান ও রেফ্রিজারেটর ছাড়া ওষুধ সংরক্ষণে কোল্ড চেইন ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন, টিকা, জেল, অয়েন্টমেন্ট, সাপোজিটর, ফুড সাপ্লিমেন্ট, ডায়াগনোসিস কিটের মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। এমনকি ওষুধ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) এলাকা, চানখাঁরপুল, লালবাগ, আজিমপুর মাতৃসদন সংলগ্ন বেবি আইসক্রীম মোড়, আজিমপুর, ছাপড়া মসজিদ, আজিমপুর বটতলা, নবাবগঞ্জ সেকশন পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে ম্যাটাডোর ডায়াগনস্টিকের বিপরীতে, বিজিবি ৩ নম্বর গেট, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মিটফোর্ড, মগবাজার, বাংলামোটর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, শ্যামলী, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে কোল্ড চেইন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে শতাধিক দোকানে এ ব্যবস্থা নেই। কামরাঙ্গীরচরের বিস্তীর্ণ জনপদে অলি-গিলিতে ব্যাঙের ছাড়ার মতো গড়ে উঠেছে ফার্মেসি। অধিকাংশ ফার্মেসির নেই ড্রাগ লাইসেন্স। বিক্রেতা ও মালিকের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। লাইসেন্স ও ওষুধ সংরক্ষণের বিষয়ে কথা হয় বেশকিছু ফার্মেসির মালিক-কর্মচারীর সঙ্গে। তারা জানান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশন থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ওষুধের দোকান পরিচালনা করছেন।
বিভিন্ন নামি-দামি কোম্পানির কথিত বিক্রয় প্রতিনিধিরা মোটরসাইকেল-বাইসাইকেলযোগে দোকানে দোকানে চাহিদার ওষুধ সরবরাহ করছেন। ওইসব ওষুধের মান যাচাইয়ের মতো সময় ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। একই সঙ্গে দেখা যায়, অধিকাংশ ওষুধের দোকানে সঠিক মাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণের নিয়মনীতিও জানেন না দোকানিরা। জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ভেজাল ওষুধ ধরতে অভিযানে আসছে ভ্রাম্যমাণ আদালত, এমন খবরে গোটা এলাকার সবকটি ওষুধের দোকান সকাল থেকে বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেন মালিক-কর্মচারীরা। দিনভর বন্ধ রাখলেও অফিসের সময় শেষ হওয়ায় সন্ধ্যার দিকে আবার খুলে যায় ওইসব দোকান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), বারডেম-১-২ সংলগ্ন ফার্মেসিতেও একই অবস্থা।
অনেক দোকানের কর্মীরা জানেনই না যে, ওষুধ সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন আছে। তবে রেফ্রিজারেটর ব্যবস্থা রয়েছে অধিকাংশ দোকানির। ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ গেট সংলগ্ন মেডিসিন কর্নারের স্বত্বাধিকারী মো. শওকত আলী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ওষুধ নিয়ে রোগীদের কোনো অভিযোগ নেই। ওষুধের মোড়কের গায়ে ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ কথা বলা থাকলেও নষ্ট হয়ে যাবে এমনটা কোম্পানি থেকে বলা হয়নি। এই গরমে ২৪ ঘণ্টা ফ্যান ছাড়াই আছে। সাপোজিটর জাতীয় কিছু ওষুধ রেফ্রিজারেটরে রাখা হয়। অনেক সময় রোগীরাও এসে অনুরোধ করে সাপোজিটর ফ্রিজে রাখতে। আমরা এর বিনিময়ে কোনও অর্থ নেই না। বিএসএমএমইউ সংলগ্ন ইউনাইটেড ড্রাগসের বিক্রয়কর্মী শরীফ উদ্দিন বলেন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ না করলে গুণগত মান কমতে পারে, বিষয়টি আমরা জানি। কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে কেউ খরচ বাড়াতে চায় না। তাই কোল্ড চেইন ব্যবস্থা বা এসি স্থাপন করে খরচ বাড়াতে চাই না। তবে সংবেদনশীল ওষুধ ফ্রিজে রাখি।
এ বিষয়ে মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আলমগীর দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, নির্ধারিত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা না হলে এর গুণগত মান নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা থাকে। কিছু ওষুধ অনেক বেশি স্পর্শকাতর, যেগুলো রেফ্রিজারেটর করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক, বিভিন্ন ধরনের হরমোন, ব্লাড প্রডাক্ট, যেগুলো বায়োসিমিউলেশন প্রডাক্ট অর্থাৎ বায়োমলিকুলার ওষুধগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হয়ে যায়। তাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। যে কারণে ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানে প্রশাসনের তদারকি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। তিনি বলেন, অনেকে বেশি ওষুধ কিনে ঘরে রাখে। সেগুলোও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে ওষুধের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে জনগণ, রোগী, ভুক্তভোগী সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ফার্মাসিউটিক্যাল প্রফেশনালসের (বিএসপিপি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক আনসারুল ইসলাম বলেন, ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ওষুধের গুণগতমান ঠিক রাখতে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন পর্যায়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যথাযথ নির্দেশনা অনুসরণ করে। বাজারের ৯০ শতাংশ ওষুধের গায়ে ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তার মতে, সমস্যাটি হয় ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান পর্যায়ে। ওষুধের দোকানিরা কোল্ড চেইন ব্যবস্থা রাখছেন না। দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকলে ওষুধের গুণগত মান কমে যায় বা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো তদারকির দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। তিনি বলেন, অতিরিক্ত গরমে অনেক সময় মেয়াদ থাকলেও ওষুধের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়, এমনকি গলে যায়। এক্ষেত্রে বিক্রেতাদের সঙ্গে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। যেসব দোকানে ওষুধের সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভালো নয়, সেসব ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। জনবল কম থাকায় দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সঠিকভাবে তদারকি করতে পারে না। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা খুব জরুরি। হাসপাতাল থেকে শুরু করে কোনোখানেই সেটির শতভাগ অনুসরণ করা হয় না। গরমে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কার্যকারিতা কমে যাওয়া ওষুধ আবার শীতেও বিক্রি হচ্ছে। যে কারণে মানুষের শরীরে ওষুধ কাজ করছে না। সেক্ষেত্রে আরও বেশি ওষুধ সেবনে মানুষ মারা যাবে। তাই এ ধরনের ফার্মেসি বন্ধ করে দিতে হবে। সাধারণ জনগণেরও এ ধরনের দোকান থেকে ওষুধ কেনা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, ফার্মেসি কাউন্সিল, ওষুধ মালিক সমিতি, কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি মিলে মাঠপর্যায়ে ওষুধের সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানের সংখ্যা ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে মাত্র ৫২৮টিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে বেশিরভাগ দোকানে সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। জাতীয় ওষুধ নীতি-২০১৬-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক ওষুধের দোকানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং রেফ্রিজারেটর ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের উপ-পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিনিয়ত বাজার তদারকি করি। এখনও গুরুতর কোনো সমস্যা বা কারো কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। মাঠ পর্যায়ে অফিসাররা কাজ করছে। টিনের তৈরি ওষুধের দোকানগুলোকে ইতোমধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। ফ্যান চালু রাখলেও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বর্তমানে মেডিসিন লাইসেন্সের কয়েকটি শর্তের মধ্যে শীতাতপসহ অন্য বিষয়গুলো গুরুত্ব দিচ্ছি।






















