◉মুনাফা বাড়ছে বিদেশি ৮টি ব্যাংকেরই
◉দেশীয় ব্যাংকের ব্যর্থতার প্রভাব
❖ দেশি ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতার কারণেই বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে -মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
❖ বিদেশি ব্যাংকের তুলনায় দেশি ব্যাংকের সম্পদের মান দুর্বল -সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
দেশীয় ব্যাংকের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় ভঙ্গুর দেশের অর্থনীতি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও মুনাফা বাড়িয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। দেশে চলমান ৯টি বিদেশি ব্যাংকের প্রায় সবগুলোই ২০২৩ সালের কার্যক্রমে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে। এসব ব্যাংক চলতি বছরও ভালো ব্যবসা করছে। দেশে কার্যক্রম চালানো বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রেকর্ড ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এর আগে কোনো ব্যাংকই এ পরিমাণ নিট মুনাফা করতে পারেনি। ২০২২ সালেও বহুজাতিক ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছিল ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪১ শতাংশ।
গত বছর উরি ব্যাংক ছাড়া সবক’টি ব্যাংকেরই মুনাফা বেড়েছে। এর মধ্যে এইচএসবিসি ব্যাংক গত বছর ৯৯৯ কোটি টাকা মুনাফা পেয়েছে; যা আগের বছর ছিল ৫৮৭ কোটি টাকা। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মুনাফা বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। গত বছর ব্যাংকটির বাংলাদেশ অফিস ৪৩৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে; যা আগের বছর ২৬৫ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করে। একই সময়ে ২৭৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে সিটিব্যাংক এনএ। ২০২২ সালে ব্যাংকটি ২৪৯ কোটি টাকা মুনাফা পায়। আর স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া নিট মুনাফা করেছে ২৩৪ কোটি টাকা; যা আগের বছর থেকে ৫৪ কোটি বেশি।
এদিকে পাকিস্তান ভিত্তিক হাবিব ব্যাংক ও আল ফালাহতেও মুনাফা প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বগামী। ২০২২ সালে আল ফালাহ ব্যাংকের মুনাফা ১৪ কোটি এবং ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৩৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এছাড়া হাবিব ব্যাংক ২০২২ সালে ১০ কোটি এবং ২০২৩ সালে ১৬ কোটি টাকা মুনাফা আহরণ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ৯টি বিদেশী ব্যাংক। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসির ব্যবসা ও কার্যক্রমই বেশি বিস্তৃত। এছাড়া শ্রীলংকার কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, যুক্তরাষ্ট্রের সিটিব্যাংক এনএ, দক্ষিণ কোরিয়ার উরি ব্যাংক ও ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ারও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কার্যক্রম রয়েছে। এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংক আল ফালাহ্ ও হাবিব ব্যাংক। এর মধ্যে দেশে ব্যাংক আল ফালাহ্র কার্যক্রম অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। আর খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এখন প্রায় দেউলিয়া দশায়।
উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে দেশি ব্যাংকগুলো। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে এমন মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে দেশী ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতার কারণেই বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী। তিনি বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ব্যয় সর্বনিম্ন। তাদের হাতে এখন বিনিয়োগযোগ্য পর্যাপ্ত তারল্যও রয়েছে। এ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিলবন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগ করলেও উচ্চ মুনাফা পাবে। কিন্তু দেশি ব্যাংকগুলোর সে অবস্থা নেই। তারল্য সংকটের কারণে তাদের উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আবার সুশাসনের ঘাটতি ও আস্থাহীনতার কারণে প্রথম প্রজন্মের অনেক ব্যাংকের অবস্থাও এখন নাজুক।
ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংক খাতের ‘কোমর ভেঙে দিয়েছে’ বলে মনে করেন রুমী আলী। তিনি বলেন, দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের মূলধন কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিদেশি ব্যাংকের তুলনায় দেশি ব্যাংকের সম্পদের মান দুর্বল। দেশি ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড বেশি কিন্তু ইল্ড কম। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড খুবই কম কিন্তু ইল্ড বেশি। অল্প কয়েকটি শাখা ও লোকবল নিয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো কাজ করে। এসব কারণে দেশি ব্যাংকের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা অনেক বেড়ে যাচ্ছে।






















