▶ঈদযাত্রায় টিকিটের তুলনায় ৬ গুণ চাহিদা
▶লাভের মুখ দেখলেও বন্ধ কক্সবাজার স্পেশাল
অনলাইনে টিকিট ব্যবস্থাপনা শুরুর পর থেকে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি কমেছে রেলযাত্রীদের। স্টেশনে টিকিট পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দুর্ভোগ, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে ভোগান্তির দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না আগের মতো। ঈদযাত্রাসহ সারা বছর রেলের টিকিট অনলাইনে পাওয়া স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে যাত্রীদেরও। আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে আগাম টিকিট বিক্রি কার্যক্রমে প্রতিদিন ৩৩ হাজার টিকিটের বিপরিতে চাহিদা ছিল ২ লক্ষ। চাহিদার তুলনায় খুব নগন্য সংখ্যক মানুষকেই সেবা দিতে পারছে রেলওয়ে। তবে চাহিদা থাকলেও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারছে না সরকারি এই পরিবহন সেবা। সেবার পরিসর বাড়ানো হলে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে রেল এমনটায় বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলের আয় ছিল ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা আর ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ রেলের মোট লোকসান হয় ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা।
টিকিট প্রত্যাশীদের চাপ সামলাতে গত বছর ঈদযাত্রার সময় থেকে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু করে রেলওয়ে। এ পর্যন্ত চার ঈদে এভাবে বিক্রি করা হচ্ছে টিকিট। ফলে ফাঁকা থাকে রেল স্টেশনের কাউন্টার, আর চাপ বাড়ে অনলাইনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে অপেক্ষা করেও কাঙ্খিত টিকিট মেলে না যাত্রীদের। গত রোজার ঈদে বিভিন্ন গন্তব্যে দৈনিক সাড়ে ৩৩ হাজার টিকিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবারেও বরাদ্দ একই। সব মিলিয়ে ঈদযাত্রায় বরাদ্দ থাকে প্রায় দুই লাখ টিকিট। যদিও টিকিটের জন্য সার্ভারে এই সময়ে দৈনিক অন্তত এক কোটি হিট হয়ে থাকে।
এবারেও গেল দোসরা জুন থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঈদযাত্রার আগাম টিকিট বিক্রি করেছে রেলওয়ে। আর ফিরতি টিকিট বিক্রি হবে ১০ই জুন থেকে ১৪ই জুন পর্যন্ত। ঈদুল আজহার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। দিনে সব মিলিয়ে সাড়ে ৩৩ হাজার অগ্রিম টিকিট বিক্রি হলেও টিকিটপ্রত্যাশী ছিলেন কমপক্ষে ২ লাখ করে। টিকিটের চেয়ে চাহিদা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় অভিযোগেরও শেষ নেই।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, এবার ঈদুল আজহায় ঢাকা ছাড়বে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ট্রেনে ঢাকা ছাড়তে পারবে বড়জোর ৮ লাখ মানুষ। বাংলাদেশ রেলওয়ে বলছে, অনলাইনে টিকিট বিক্রি হওয়ায় স্টেশনে ভিড় ও দালালদের দৌরাত্ম্য কমেছে। আসনের চেয়ে চাহিদা বেশি থাকলে সবাই টিকিট পাবেন না, এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার শাহাদাৎ আলী জানান, এবার ঈদে টিকিটের চাহিদা কোটির ওপর, তবে রেলওয়ে দিতে পারবে দেড় লাখের কিছু বেশি। তবে নিয়মিত, বিশেষ ট্রেন এবং অতিরিক্ত বগি যুক্ত করে দুই লাখের কাছাকাছি যাত্রী বহনের সক্ষমতা আছে।
রেলওয়ে বলছে, ঈদের আগে পাঁচ দিন প্রতিদিন রাজধানী থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে ৪৩টি আন্তনগর ট্রেন। দিনে সব মিলিয়ে এগুলোতে আসনসংখ্যা সাড়ে ৩৩ হাজার। লোকাল, মেইল, কমিউটারসহ সব মিলিয়ে ট্রেন চলবে ৬৯টি। এ ছাড়া ১০ জোড়া বিশেষ ট্রেন চলবে। আন্তনগর ছাড়া বাকি ট্রেনগুলোর টিকিট যাত্রার আগে বিক্রি হয়। যাত্রার দিন আন্তনগর ট্রেনের নন-এসি ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট স্টেশনের কাউন্টারে বিক্রি হয়।
রেলের টিকিট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সহজ সূত্র বলছে, হিট বলতে যাত্রীসংখ্যা নয়। একজন টিকিটপ্রত্যাশী একটি টিকিটের জন্য যে চেষ্টা করেন, সেটাকেই সহজের সার্ভারে হিট কাউন্ট ধরা হয়। একজন ব্যক্তি মোবাইল বা ল্যাপটপে কয়েকটি ব্রাউজার খোলা রেখে টিকিটের জন্য চেষ্টা করেন। তাঁর প্রতিটি চেষ্টাই একেকটি হিট গণ্য হয়। তিনি বলেন, অনলাইনে প্রতি মিনিটে এক থেকে দেড় লাখ লোক টিকিট কাটার চেষ্টা করেন।
এদিকে সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচল করা কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করে দিয়েছে রেলওয়ে। দেশের সবচেয়ে লাভজনক কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি দেশের সবচেয়ে লাভজনক ছিল বলে পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগ জানায়, ট্রেনটিতে প্রতি মাসে আয় ছিল ৬৫ লাখ টাকার বেশি, যা দেশে চলা অন্যান্য ট্রেনের চেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন, সুবর্ণসহ অন্য আন্তনগর ট্রেনের সঙ্গে তুলনা করলে এই কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের আয় বেশি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাস মালিকদের প্রেসক্রিপশনে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন বন্ধ করা হচ্ছে। ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথ নির্মাণের পরে শুধু রাজধানীবাসীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে কক্সবাজার দুটি ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জনগণ জমিজমা, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নদী-নালা, খাল-বিল বিলীন করে রেলপথের জায়গা জন্য ছেড়ে দিলেও এই ট্রেন সার্ভিস চালুর পর থেকে তারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে যাতায়াতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সার্বিক বিষয়ে রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম বলেন, রেলের যাত্রীবাহী ট্রেনের দৈনিক গড় আয় যেখানে সাড়ে তিন লাখ টাকা, সেখানে একটি মালবাহী ট্রেনের গড় আয় প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা। তবে ৩৫০টির অধিক যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করলেও মালবাহী ট্রেন মাত্র ২০-২৫টি চলাচল করে বিধায় রেলের আয় কিছুটা কম হচ্ছে। দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৩টি জেলায় রেল সংযোগ রয়েছে। বাকি ২১টি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা প্রক্রিয়াধীন।






















