► মানসিক অসুস্থ বা মাদকাসক্ত না হলে কেউ এমনটি করেনা : ডা. তাজুল ইসলাম
► জাতিকে ঠিক রাখতে পুলিশকে নৈতিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে : ডা. আবুল হোসাইন ভূঁইয়া
রাজধানীতে দায়িত্বপালনকালে সহকর্মীর গুলিতে সহকর্মী পুলিশের মৃত্যুর ঘটনায় বিস্ময় ও হতবাক হয়ে পড়েছে পুরো জাতি। কেন এমনটি ঘটল এটি বোঝার চেষ্টা করছে সবাই। মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটার কারণ উদঘাটন করাটা জরুরি। সেকি মাদকাসক্ত ছিল নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল তা নির্ণয় করা জরুরি। পাশাপাশি, পুলিশের নৈতিক প্রশিক্ষণ দেয়াটা জরুরি। যেন তারা জাতিকে সঠিক সেবা দিতে পারে। এদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার আসামি অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য কাওসার আলীর ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
গতকাল রোববার তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠুতদন্তের জন্য তাকে দশ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাকিল আহাম্মদ এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের এমন আচরণ সাধারণ মানুষসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যন্য সদস্যদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুতরাং কাউন্সেলিং করে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করার বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। জবাবদিহিতারও আওতায় আনতে হবে।
জানা যায়, গত ৮ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর গুলশানের বারিধারায় ফিলিস্তিন দূতাবাসের সামনে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত পুলিশ সদস্য মনিরুলকে গুলি করে হত্যা করে তারই সহকর্মী কাওসার আলী। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই যে পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে সহকর্মীকে গুলি করে হত্যা করল এর মোটিফটা জানতে হবে। তারা চারপাশের তথ্য নিতে হবে। কেন সে হত্যা করল এটা জানা জরুরি। মানুষতো অনেক মানুষকেই হত্যা করে। সরাসরি হত্যা করে। টাকা পয়সার জন্য হত্যা করে। অথবা ভাড়াটে হয়ে হত্যা করে। ব্যবসার কারণে হত্যা করতে পারে।
কোন না কোন রকমের রেষারেষি থাকতে হবে। আর না হলে মাদকাসক্ত হতে পারে। মাদকাসক্ত রোগীরা যেকোন কাজ করতে পারে বা মানসিক রোগ হতে পারে। যদি কোন মোটিফ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ব্রেইন তার কাজ করেনি। অথবা মাদকাসক্ত ছিল। আর মোটিভ থাকলে বুঝতে হবে তার স্বার্থের হানি হয়েছে অথবা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত দিক হতে পারে। অথবা মেয়েঘটিত ব্যাপার হতে পারে। অথবা অন্য কেউ ব্যবহার করে তাকে দিয়ে এই কাজটা করাতে পারে।
তিনি বলেন, মা ছেলেকে হত্যা করছে, ছেলে মাকে হত্যা করছে। এটা তো সহকর্মীকে হত্যা। এটা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা না। এটার ২/১ দিনের মধ্যেই রহস্য উদঘাটন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ডিন ও সমাজবিজ্ঞানী ড. আবুল হোসাইন ভূঁইয়া দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বের নৈতিকতা যদি নিচে নেমে যায় তখন তারা অনেক বেআইনী কাজ করে। এই কাজটা যেমন করল, তেমন অন্যান্য কাজও করে। আমরা কিন্তু পুলিশের সমালোচনা করি, আবার আমরা পুলিশের কাছে সাহায্যের জন্যও যাই। পুলিশের নৈতিকতা নিচের দিকে নেমে গেলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তখন তাদেরকে ব্যবহার করে। তখন তারা আর কন্ট্রোলে থাকে না। এখনও এক ধরণের কন্ট্রোল আছে। কিন্তু বিশেষ করে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পুলিশের ঘটনায় আরও হয়ত অনেক পদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত আছেন। এটা শুধু আমরা জানতে পারি যদি সাংবাদিকরা আমাদের বলেন।
পুলিশদের নৈতিক প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। এখন তো তারা একটা আলাদা এলিট শ্রেণি হয়ে গেছে। তারা নিয়ম তেমন মানে না, মানে কিন্তু কিছুটা কমে গেছে দেখেই তারা একে অপরকে মারার চেষ্টা করে। বা অনেক যায়গায় অনেক অপরাধ করে। এখানে তো একজনকে হত্যা করেছে। এর বাইরেও তারা অনেক অপরাধ করে। আমাদের জাতিকে ঠিক রাখতে হলে পুলিশকে অনেক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুদ্দিন বলেন, পুলিশের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু কিছু পুলিশ সদস্যের উগ্র আচরণ নিরাপত্তার বদলে মানুষকে আরও নিরাপত্তাহীন করে তোলে। মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণের পরিবর্তে অস্বাভাবিক আচরণ করা হচ্ছে। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক আছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটা নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিয়ত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।
প্রতিদিন দায়িত্ব বণ্টনের আগে কর্মকর্তারা পুলিশ সার্ভিসের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করার বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। থানা থেকে শুরু করে পুলিশ লাইনস, পুলিশ ক্যাম্প, বিভাগসহ সবখানেই কাউন্সেলিং করা হয়। কাউন্সেলিংকালে পুলিশ সদস্যদের কোথাও তল্লাশি চালাতে হলে কী নিয়ম মানতে হবে, কী ধরনের আচরণ করতে হবে, তা বুঝিয়ে বলা হয়। সাধারণ মানুষকে যেন সম্মান দেওয়া হয়, তাদের প্রতি যেন ভদ্র আচরণ করা হয়।
পুলিশের দায়িত্বে পরিবর্তন বা শৃঙ্খলায় আনতে হলে যথাযথ জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ব্যবস্থা করতে হবে। কাজের সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি অন্যায় কাজের জন্য ন্যায়সংগত বিচার করতে হবে। গুরুতর অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এসবের পাশাপাশি পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিষয়টি লক্ষ রাখতে হবে।




















