◉ এক বছরে তুলে নিয়েছেন ৪৯৫ কোটি ২৬ লাখ ৯১ হাজার টাকা
◉ এক দশক ধরে বৃদ্ধির পর কমতে শুরু করেছে বাংলাদেশিদের আমানত
◉ ২০২২ সালে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৫২ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা নেমে এসেছে ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ-তে
গ্রাহকদের নাম-পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখায় বিশ্বে ধনীদের অর্থ গোপনে গচ্ছিত রাখার জন্য বহুদিনের খ্যাতি আছে সুইস ব্যাংকের। তাই অবৈধ আয় আর কর ফাঁকি দিয়ে জমানো টাকার ঠাঁই হয় ব্যাংকটিতে। প্রায় এক দশক ধরে বৃদ্ধির পর গত দুই বছরে ব্যাংকটিতে কমতে শুরু করেছে বাংলাদেশিদের আমানত। বাংলাদেশিরা সুইস ব্যাংকে জমানো টাকা তোড়জোড় করে সরিয়ে ফেলছেন। বাংলাদেশি আমানতকারীরা ২০২২ থেকে ২০২৩ সালÑ এই এক বছরে তুলে নিয়েছেন ৪৯৫ কোটি ২৬ লাখ ৯১ হাজার টাকা। তুলে নেওয়া এই অর্থের পরিমাণ মোট আমানতের প্রায় ৬৮ শতাংশ। তবে কেন টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ব্যাংকটি। গত বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৫২ লাখ সুইস ফ্রাঁ। গত বছর যা নেমে এসেছে ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ-তে। বছর ব্যবধানে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। সুইস ব্যাংক এক সময় বাংলাদেশিদের কাছে নিরাপদ স্থান ছিল। হঠাৎ করে এ নিয়ে টানা দুই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের রাখা অর্থের পরিমাণ কমেছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুইস ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়ার মানে এই নয় যে, দেশ থেকে অবৈধভাবে পুঁজি পাচার বন্ধ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশ থেকে এখনো প্রতি বছর অর্থ পাচার বাড়ছে। যা দেশের অন্যতম সমস্যা। তবে পাচারের এই অর্থ আগে সুইস ব্যাংকে গোপনে রাখার সুযোগ পেলেও এখন আর সেই সুযোগ পাচ্ছে না পাচারকারীরা। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে সুইস ব্যাংকের কাছে রাখা অর্থের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা সেটা প্রকাশ করে। আবার সুইস ব্যাংক নিজেও সেই তথ্য প্রকাশ করে থাকে। তাই পাচারকারীরা গোপনীয়তা রক্ষা করে এমন কোন জায়গায় যেমন কানাডা বা দুবাই বা অন্য কোনো দেশে তাদের অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৮৭২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছায়। যা দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা। তবে ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ তার আগের বছরের তুলনায় কম ছিল। ওই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকার বেশি। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্রাঁ। ২০১৮ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। আর ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
এদিকে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে শুধু যে বাংলাদেশিদের অর্থ কমেছে, তা নয়। ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ জমার পরিমাণও কমেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সুইস ব্যাংকে অর্থ আমানতের হার ২০২৩ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। গত চার বছরের মধ্যে ভারতীয়দের আমানতের পরিমাণ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে ২০২৩ সালে। আমানত হ্রাস পাওয়ার পরও সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের অর্থের পরিমাণ ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে; যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৭৭১ কোটি রুপি। এ নিয়ে সুইস ব্যাংকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের আমানত টানা দ্বিতীয়বারের মতো কমেছে।






















