◉ একে একে ভেঙে দেয়া হচ্ছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ দলটির বিভিন্ন কমিটি
◉ তরুণদের পদোন্নতি ও সিনিয়রদের বসানো হচ্ছে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে
◉ কাউন্সিল ছাড়াই চেয়ারম্যানের বিশেষ ক্ষমতাবলে হচ্ছে এসব পুনর্গঠন
◉ পর্যায়ক্রমে তৃণমূল পর্যন্ত সব কমিটি ঢেলে সাজানোর টার্গেট
দীর্ঘদিন রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা দল বিএনপি যেন অনেকটাই অনিশ্চিত গন্তব্যে চলছে। নানা কারণে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে চরম হতাশা ও অস্থিরতা। বিশেষ করে গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দলের স্বাভাবিক গতি অনেকটাই থমকে গেছে। ওই নির্বাচন ঠেকানোসহ আন্দোলনে ব্যর্থতার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। নানা উদ্যোগ নিয়ে ধীরে ধীরে নেতাকর্মীদের চাঙা করার তৎপরতা চললেও সম্প্রতি দল পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কাউন্সিল ছাড়াই দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। একইসঙ্গে একের পর এক ভেঙে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি। সর্বশেষ গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলে সাবেক রাষ্ট্রদূতসহ তিনজনকে নতুন করে স্থান দেয়া হয়েছে। দলীয় কার্যক্রম জোরদার ও ভবিষ্যৎ আন্দোলন কর্মসূচিকে সামনে রেখেই এ পুনর্গঠন চলছে বলে জানা গেছে। এতে একদিকে যেমন নানা ব্যর্থতার কারণে সিনিয়র নেতাদের বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে, তেমননি অনেক তরুণ নেতাকে আবার পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট নেতা ও তাদের অনুসারীদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। কেন্দ্রের ধারবাহিকতায় তৃণমূলের বিভিন্ন কমিটিও একইভাবে ভেঙে দেয়া হবে। দলটির স্থায়ী কমিটির শূন্যপদগুলোও পূরণ করা হতে পারে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদে রদবদল করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে দলের মহাসচিব পদেও পরিবর্তনের গুঞ্জন চলছে। কাউন্সিল ছাড়াই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিশেষ ক্ষমতাবলে এসব কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে বলেও দলটি জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সরকার পতনের আন্দোলনের ব্যর্থতার অভিযোগ এনে দলটির বিভিন্ন স্তরে এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। পাশাপাশি বৈঠকে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের বিষয়েও আলোচনা হয়। এরই প্রেক্ষিতে কমিটিগুলো বিলুপ্ত ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদল করার সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবেই বিভিন্ন কমিটি বিলুপ্ত, পুনর্গঠন বা রদবদল করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাকি শূন্যপদগুলোও সামনে পূরণ করা হবে। পাশাপাশি সদ্য বিলুপ্ত হওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং যুবদলের কমিটিও শিগগিরই দেয়া হবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতে আরও রদবদল হবে কিনা, সেটা দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবেন। দলের গঠনতন্ত্রেও সেই নিয়ম রয়েছে।
সূত্রমতে, দীর্ঘ আট বছর আগে ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলন হয়েছিল। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর কাউন্সিল করার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেটা আট বছরেও হয়নি। অর্থাৎ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ প্রায় ৫ বছর আগেই শেষ হয়েছে। নতুন কাউন্সিল না হলেও মাঝে মাঝে শূন্য পদ পূরণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বড় রদবদল শুরু হয়েছে। গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারম্যানকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতাবলেই চেয়ারম্যান এটা করেছেন। বিএনপির নতুন কাউন্সিল শিগগিরই হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা কমিটিগুলো এবং অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন করা হবে। এরপর পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাউন্সিল করার কথা ভাবছে দলটি।
এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কাউন্সিলের জন্য আমরা কাজ করছি এবং চেষ্টাও করেছি। কিন্তু জাতীয় কাউন্সিলের আগে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো গঠন করতে হবে। এটা না হলে তো কাউন্সিল করা যাবে না। যেটা সরকারের নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে হয়নি, এক জায়গায় আমরা একত্রিত হতে পারি নাই। পরিবেশ ও পরিস্থিতি হলে অবশ্যই কাউন্সিলে হবে। গত ১৫ জুন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৪৫টি পদে রদবদল করা হয়। একই দিন বিদেশবিষয়ক দুটি (চেয়ারপার্সনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি এবং স্পেশাল এসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপার্সনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি) কমিটি গঠন করা হয়। এতে প্রধান করা হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। এদিনই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫৭ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটিও ঘোষণা করা হয় এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেলকে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক থেকে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর আগে গত ১৩ জুন সরকার পতনের একদফার আন্দোলনে ব্যর্থতার অভিযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল মহানগর বিএনপির চারটি আহ্বায়ক কমিটি এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। একই দিন ছাত্রদলের ঢাকা মহানগরের চারটি কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। যেকোনো সময় যুবদল, ঢাকা মহানগর ছাত্রদলসহ বিএনপির চার ইউনিটে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। সদ্য পদোন্নতি পাওয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, জাতীয় কাউন্সিলের জন্য দেশে বিদ্যমান পরিবেশ ও পরিস্থিতি নেই। একটা সভা করতেও অনুমতির জন্য বারবার প্রশাসনের কাছে যেতে হয়। তারপরও অনুমতি পাওয়া যায় না। যে কারণে কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি।
বিলুপ্ত হওয়া কমিটিগুলো গঠনের প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, নিশ্চয় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এটা খুব তাড়াতাড়ি হবে। এটা নিশ্চিত। তবে কবে নাগাদ হবে, এটা একমাত্র বিএনপির হাইকমান্ড বলতে পারবেন। বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীতে ৩ নতুন মুখ : আরও তিনজনকে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করে নিয়েছে বিএনপি। গতকাল দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। নতুন তিনজন হলেন- সাবেক রাষ্ট্রদূত সিরাজুল ইসলাম, দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ও কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি তাসভিরুল ইসলাম।
এর আগে গত ১৫ জুন ১০ জনকে উপদেষ্টা কাউন্সিলে সদস্য করে নিয়েছিল দলটি। সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন, মজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হারুন অর রশিদ, আসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুছ তালুকদার দুলু, সাখাওয়াত হাসান জীবন, সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বেবী নাজনীন এবং সহতথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক খালেদ হোসেন চৌধুরী পাইনকে তখন উপদেষ্টা করা হয়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং ৮১ সদস্যের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন করা হয়। এছাড়া বৈদেশিক সম্পর্ক দেখভাল করতে গত ১৫ জুন নতুন গঠিত ‘চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজারি কমিটি’তে আরও ১৭ জনকে অন্তুর্ভুক্ত করে বিএনপি। ওইদিন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রধান করে ১০ সদস্যের ‘চেয়ারপারসন ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজারি কমিটি’ এবং ১৮ সদস্যের ‘স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপার্সনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি’ গঠিত হয়। ১৭ জন নতুন যুক্ত হওয়ায় ‘স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপার্সনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি’র সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে।






















