০৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
লাখ টাকার ছাগলে খেলো কোটি টাকার সম্পদ

করের মতিউর এখন দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল’

◉ ৩১ বছরের চাকরি জীবনে বৈধ আয় সর্বোচ্চ দুই কোটি ৯০ কোটি ১৬ হাজার টাকা
◉ বাড়ি-গাড়ি, রিসোর্ট, জমি ও নগদ সম্পদ হাজার কোটি টাকার ওপরে
◉ সরকারি কর্মকর্তার অনৈতিক আয়ে সামাজিক কুপ্রভাব পড়ছে
◉ ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ বিএফআইইউ’র
◉ ছাগলকাণ্ডে দুই পদ হারালেন মতিউর রহমান

➢ সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়- ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

এক সময়ের পল্লী কর্মসংস্থান কর্মকর্তা বর্তমানে হাজার কোটি টাকার মালিক সদ্য সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমান। কগজে কলমে তার মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। যদিও শুরুতে আরও কম ছিলো। ৩১ বছরের চাকরি জীবনে তার বৈধ আয় দুই কোটি ৯০ কোটি ১৬ হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

১৯৯৩ সালে বাণিজ্য ক্যাডারে যোগদান করেন মতিউর রহমান। দুই বছরের মাথায় ক্যাডার পরিবর্তন করে বাণিজ্য ক্যাডারের ১১ ব্যাচ থেকে কাস্টমসের ১৩ ব্যাচের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। নতুন ক্যাডারে যুক্ত হওয়ার পরই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সম্পদ বাড়তে থাকে তার। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যুগ্ম কমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালে শুরু হয় এই উত্থান। সর্বশেষ তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে কাস্টম ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝে ১৫ বছরে নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। এই তালিকায় আছে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের অংশীদারত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, জমি ও বিনোদন পার্ক। কৌশলে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে গড়েছেন ডজনখানেক কোম্পানির মালিকানা।মতিউর রহমানের দাবি, তার বিপুল সম্পদের মূল উৎস পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। তবে সেখানেও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে রয়েছে কারসাজির অভিযোগ।

নানা কায়দা করে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি কোরবানির ঈদে ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল কিনতে গিয়ে ভাইরাল হন মতিউর পুত্র ইফাত। প্রশ্ন ওঠে ইফাত এত টাকা উৎস কী, কোথায় পান এতো টাকা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ইফাতের এই টাকার উৎস তার বাবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মতিউর রহমান। বাবার টাকায়ই তার এই বিলাসী জীবন। গত বছরও ঈদুল আজহার সময় রাজধানীর একটি খামার থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ছয়টি পশু কিনেছিলেন ইফাত। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে মতিউরের একের পর এক সম্পদের তথ্য। জানা গেছে ৩১ লাখ টাকার বেশি দামের রোলেক্স ঘড়ি পরেন মতিউর। রাজস্ব আয় বাড়ানোর গুরু দায়িত্বে থেকে সরকারকে রাজস্ববঞ্চিত করে গুছিয়েছেন নিজের আখের। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই সম্পদের পাহাড় গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। সব সরকারের আমলেই অবৈধ অর্থের দাপটে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন তিনি। বাগিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদও।

আলোচিত এই কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের নামে থাকা এখন পর্যন্ত ৬৫ বিঘা (২ হাজার ১৪৫ শতাংশ) জমি, ৮টি ফ্ল্যাট, ২টি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট এবং ২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে। তার নামে প্রায় ২৮ বিঘা জমি ও ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুরে একটি ভবনেই রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। কলেজশিক্ষক লায়লা কানিজ বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক।

জানা গেছে, মতিউর রহমান বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায় থাকেন। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসও ওই এলাকায়। এ ছাড়া মতিউর রহমানের ছেলে অর্ণবের নামে অর্ণব ট্রেডিং নামেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া তার মেয়ের ল্যাম্বারগিনি নামে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহারের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যার দাম প্রায় ৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি টাকা।

জানা গেছ, শুধু রাজধানী ঢাকা বা গাজীপুরে নয়, মতিউর রহমান অঢেল সম্পত্তি কিনেছেন শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীতেও। তার স্ত্রী লায়লা কানিজ আগে সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। এখন চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। আর প্রভাবশালী স্বামীর প্রভাবে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষক থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া লায়লার নামে পার্ক-রিসোর্ট থেকে শুরু করে রয়েছে বাণিজ্যিক এলাকায় কোটি কোটি টাকার জমি-প্লট। এ ছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরার ডি ব্লকের ৭/এ রোডের ৩৮৪ নম্বর বাড়িতে স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। বসুন্ধরার ডি ব্লকে রয়েছে ৫ কাঠায় ৭ তলা বাড়ি, যার দোতলায় মতিউর রহমান পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এ ছাড়াও গাজীপুর সদর, খিলগাঁও মৌজায় এসএ ১৭১ আরএস ২৮০ দাগে ১০ দশমিক ৫০ শতক; এসএ ১৭২ আরএস ২০১ দাগে ৩ দশমিক ৯০ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৫ দাগে ৭ দশমিক ৫০ শতক, এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৭ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; গাজীপুর থানার খিলগাঁও মৌজায় ৩৫৫৭ জোতে ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, জোত ৩৪৫০-এ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং জোত ৩৬৫২-এ ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব, স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে শূন্য দশমিক ৪৫১৬২৫ একর জমি রয়েছে। গ্লোবাল সুজ লিমিটেড কোম্পানির নামে জোত ১২৫-এ ৩৪৩৪৫ শতক, জোত ৭০-এ ২৮০০ শতক, জোত ৯০-এ শূন্য দশমিক ০৩৩০ শতক জমি রয়েছে। এই ৭টি খতিয়ান মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ৬০ শতাংশ। এ ছাড়াও সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩০৩৫ দাগ ১৭৬৩ ও ১৭৬২-এ ১২ দশমিক ৫৮ শতক জমি রয়েছে। লায়লা কানিজের নামে সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩৬৯৬-এ ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ জমি রয়েছে।

মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শত বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিসান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক। এসব পার্ক করতে গিয়ে জায়গা দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে গত রোববার মতিউর রহমানকে এনবিআর থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই দিন মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া মতিউরকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক থেকেও অব্যহতি দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় স্ত্রীর গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি: মতিউর রহমান দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। প্রায় ১০ বছর আগে সোনাগাজীতে শ্বশুরের ভিটায় শাশুড়িকে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি বানিয়ে দেন মতিউর রহমান। সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়। সরকারি বড় এই কর্মকর্তার দেশের রাজস্ব আয়ের গুরু দায়িত্ব থাকলেও তিনি হয়ে উঠেছেন নানা দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল হয়ে’। এনবিআরের একজন কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী-পরিজনদের এত বিপুল সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, মতিউর নিজের ছেলেকে অস্বীকার করে ন্যক্কারজনক কাজ করেছেন। সম্প্রতি যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে, তারা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। অর্থাৎ তারা দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। সরকারি কর্মচারিদের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের শামিল।

মতিউর পরিবারের ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ: এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান এবং তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসাব ও বেনিফিশিয়ারি অ্যাকাউন্ট (বিও হিসাব) স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি তাদের সব হিসাবের যাবতীয় তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি, লেনদেন বিবরণী ইত্যাদি তথ্য সরবরাহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

লিটন দাসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

লাখ টাকার ছাগলে খেলো কোটি টাকার সম্পদ

করের মতিউর এখন দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল’

আপডেট সময় : ০৬:১২:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ জুন ২০২৪

◉ ৩১ বছরের চাকরি জীবনে বৈধ আয় সর্বোচ্চ দুই কোটি ৯০ কোটি ১৬ হাজার টাকা
◉ বাড়ি-গাড়ি, রিসোর্ট, জমি ও নগদ সম্পদ হাজার কোটি টাকার ওপরে
◉ সরকারি কর্মকর্তার অনৈতিক আয়ে সামাজিক কুপ্রভাব পড়ছে
◉ ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ বিএফআইইউ’র
◉ ছাগলকাণ্ডে দুই পদ হারালেন মতিউর রহমান

➢ সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়- ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

এক সময়ের পল্লী কর্মসংস্থান কর্মকর্তা বর্তমানে হাজার কোটি টাকার মালিক সদ্য সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমান। কগজে কলমে তার মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। যদিও শুরুতে আরও কম ছিলো। ৩১ বছরের চাকরি জীবনে তার বৈধ আয় দুই কোটি ৯০ কোটি ১৬ হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

১৯৯৩ সালে বাণিজ্য ক্যাডারে যোগদান করেন মতিউর রহমান। দুই বছরের মাথায় ক্যাডার পরিবর্তন করে বাণিজ্য ক্যাডারের ১১ ব্যাচ থেকে কাস্টমসের ১৩ ব্যাচের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। নতুন ক্যাডারে যুক্ত হওয়ার পরই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সম্পদ বাড়তে থাকে তার। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যুগ্ম কমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালে শুরু হয় এই উত্থান। সর্বশেষ তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে কাস্টম ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝে ১৫ বছরে নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। এই তালিকায় আছে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের অংশীদারত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, জমি ও বিনোদন পার্ক। কৌশলে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে গড়েছেন ডজনখানেক কোম্পানির মালিকানা।মতিউর রহমানের দাবি, তার বিপুল সম্পদের মূল উৎস পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ। তবে সেখানেও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে রয়েছে কারসাজির অভিযোগ।

নানা কায়দা করে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি কোরবানির ঈদে ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল কিনতে গিয়ে ভাইরাল হন মতিউর পুত্র ইফাত। প্রশ্ন ওঠে ইফাত এত টাকা উৎস কী, কোথায় পান এতো টাকা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ইফাতের এই টাকার উৎস তার বাবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মতিউর রহমান। বাবার টাকায়ই তার এই বিলাসী জীবন। গত বছরও ঈদুল আজহার সময় রাজধানীর একটি খামার থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ছয়টি পশু কিনেছিলেন ইফাত। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে মতিউরের একের পর এক সম্পদের তথ্য। জানা গেছে ৩১ লাখ টাকার বেশি দামের রোলেক্স ঘড়ি পরেন মতিউর। রাজস্ব আয় বাড়ানোর গুরু দায়িত্বে থেকে সরকারকে রাজস্ববঞ্চিত করে গুছিয়েছেন নিজের আখের। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই সম্পদের পাহাড় গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। সব সরকারের আমলেই অবৈধ অর্থের দাপটে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন তিনি। বাগিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদও।

আলোচিত এই কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের নামে থাকা এখন পর্যন্ত ৬৫ বিঘা (২ হাজার ১৪৫ শতাংশ) জমি, ৮টি ফ্ল্যাট, ২টি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট এবং ২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে। তার নামে প্রায় ২৮ বিঘা জমি ও ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুরে একটি ভবনেই রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। কলেজশিক্ষক লায়লা কানিজ বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক।

জানা গেছে, মতিউর রহমান বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায় থাকেন। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসও ওই এলাকায়। এ ছাড়া মতিউর রহমানের ছেলে অর্ণবের নামে অর্ণব ট্রেডিং নামেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া তার মেয়ের ল্যাম্বারগিনি নামে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহারের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যার দাম প্রায় ৪ লাখ কানাডিয়ান ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি টাকা।

জানা গেছ, শুধু রাজধানী ঢাকা বা গাজীপুরে নয়, মতিউর রহমান অঢেল সম্পত্তি কিনেছেন শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীতেও। তার স্ত্রী লায়লা কানিজ আগে সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। এখন চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। আর প্রভাবশালী স্বামীর প্রভাবে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষক থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া লায়লার নামে পার্ক-রিসোর্ট থেকে শুরু করে রয়েছে বাণিজ্যিক এলাকায় কোটি কোটি টাকার জমি-প্লট। এ ছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরার ডি ব্লকের ৭/এ রোডের ৩৮৪ নম্বর বাড়িতে স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। বসুন্ধরার ডি ব্লকে রয়েছে ৫ কাঠায় ৭ তলা বাড়ি, যার দোতলায় মতিউর রহমান পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এ ছাড়াও গাজীপুর সদর, খিলগাঁও মৌজায় এসএ ১৭১ আরএস ২৮০ দাগে ১০ দশমিক ৫০ শতক; এসএ ১৭২ আরএস ২০১ দাগে ৩ দশমিক ৯০ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৫ দাগে ৭ দশমিক ৫০ শতক, এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; এসএ ১৬৩ আরএস ২৭৬ দাগে ৭ শতক; এসএ ১৭০ আরএস ২৭৯ দাগে ৬ শতক; গাজীপুর থানার খিলগাঁও মৌজায় ৩৫৫৭ জোতে ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, জোত ৩৪৫০-এ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং জোত ৩৬৫২-এ ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব, স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে শূন্য দশমিক ৪৫১৬২৫ একর জমি রয়েছে। গ্লোবাল সুজ লিমিটেড কোম্পানির নামে জোত ১২৫-এ ৩৪৩৪৫ শতক, জোত ৭০-এ ২৮০০ শতক, জোত ৯০-এ শূন্য দশমিক ০৩৩০ শতক জমি রয়েছে। এই ৭টি খতিয়ান মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ৬০ শতাংশ। এ ছাড়াও সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩০৩৫ দাগ ১৭৬৩ ও ১৭৬২-এ ১২ দশমিক ৫৮ শতক জমি রয়েছে। লায়লা কানিজের নামে সাভার থানার বিলামালিয়া মৌজায় খতিয়ান ১৩৬৯৬-এ ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ জমি রয়েছে।

মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শত বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিসান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক। এসব পার্ক করতে গিয়ে জায়গা দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে গত রোববার মতিউর রহমানকে এনবিআর থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই দিন মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া মতিউরকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক থেকেও অব্যহতি দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় স্ত্রীর গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি: মতিউর রহমান দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। প্রায় ১০ বছর আগে সোনাগাজীতে শ্বশুরের ভিটায় শাশুড়িকে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি বানিয়ে দেন মতিউর রহমান। সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়। সরকারি বড় এই কর্মকর্তার দেশের রাজস্ব আয়ের গুরু দায়িত্ব থাকলেও তিনি হয়ে উঠেছেন নানা দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল হয়ে’। এনবিআরের একজন কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী-পরিজনদের এত বিপুল সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বৈধ আয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, মতিউর নিজের ছেলেকে অস্বীকার করে ন্যক্কারজনক কাজ করেছেন। সম্প্রতি যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে, তারা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। অর্থাৎ তারা দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। সরকারি কর্মচারিদের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের শামিল।

মতিউর পরিবারের ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ: এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান এবং তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসাব ও বেনিফিশিয়ারি অ্যাকাউন্ট (বিও হিসাব) স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি তাদের সব হিসাবের যাবতীয় তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি। আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি, লেনদেন বিবরণী ইত্যাদি তথ্য সরবরাহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।