◉ ৩০৫০ কোটি টাকার বীমা দাবি অমীমাংসিত
◉ পলিসির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে টাকা দিতে গড়িমসি
◉ জমানো টাকা তুলতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন গ্রাহকরা
◉ আইডিআরএ অভিযোগ করেও মিলছে না সুরাহ
◉ বিমা দাবির বিপরীতে নিষ্পত্তির হার অনেক কম
◉ ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি বিধান মানছে না কোম্পনি
➤ সময় মতো বীমা দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক- এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ
➤ সাধারণ সমস্যা হচ্ছে লাইফ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ নেই- মোহাম্মদ জয়নুল বারী, চেয়ারম্যান, আইডিআরএ
সুশানের ঘাটতি, মূলধনে অপর্যাপ্ততা, উচ্চ ব্যবস্থপনা ব্যয়ে ডুবতে যাচ্ছে বীমা খাত। শুধু তাই নয়, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোতে স্বচ্চতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সঞ্চয়ী হিসাবের মেয়াদপূর্তি হলেও টাকা দিতে পারছে না দেশের অধিকাংশ বিমা কোম্পানি। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ দিয়েও মিলছে না সুরাহা। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তারল্য সংকটের কারণে দেশের ২৯ জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান অর্থ পরিশোধ না করায় অন্তত ১০ লাখ গ্রাহকের বিমা দাবি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। আইডিআরএ এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে গ্রাহকদের দুই হাজার ৭০ কোটি টাকার বিমা দাবি নিষ্পত্তি করেছে দেশের বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো। এটি মোট বিমা দাবির ৪০ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে আরও মোট তিন হাজার ৫০ কোটি টাকার বিমা দাবি অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
বীমা পলিসির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না পিরোজপুরের নাজমুল। তাই তিনি ঢাকার মতিঝিলে আইডিআরএ আসেন টাকা উদ্ধার করতে। তার পরিবারে দুটি পলিসির মেয়াদ শেষ হবার পর এ টাকার পেছনে তিনি ঘুরছেন প্রায় দুই বছর ধরে। নাজমুল বলছেন, পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যখন তারা টাকা তুলে নিতে চান, তখন স্থানীয় বিমা কোম্পানির অফিস থেকে চাপ দেয়া হয় টাকাটা একই কোম্পানিতে ডিপিএস করে রাখতে। কিন্তু আমরা ডিপিএস করতে চাই নাই। আমরা টাকা চেয়েছিলাম। পরে হঠাৎ একদিন শুনি আমাদের অনুমিতি ছাড়াই তারা ডিপিএস করে ফেলেছে। আমরা যখন এর প্রতিবাদ করি এবং হেড অফিসে জানাই তখন বলা হয় যে, টাকা ফেরত দেবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুশাসনের অভাব ও অনিয়ম করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। তারা বলছেন, বিমা সম্পর্কে মানুষের মাঝে একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। যে কারণে পুরো খাতের ওপর মানুষ বিশ্বাস এবং আস্থা হারাচ্ছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে ১০ বছরের মেয়াদি পলিসি নেন কামরুল নামে বেসরকারি এক কর্মজীবী। এরপর ২০২০ সালে তার বিমার মেয়াদ পূর্ণ হয়। মেয়াদ শেষে পাওয়ার কথা মোট এক লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু, মেয়াদপূর্তির পরও কামরুল টাকা পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। ৬৩ বছর বয়সী দিনমজুর সুজন জানান, তার বিমার মেয়াদ তিন বছর আগে পূর্ণ হয়েছে। তারপরও তারা টাকা দিচ্ছে না। তিনি বলেন, এত কষ্টের টাকা ধীরে ধীরে জমিয়েছি। এখন এই টাকা পাবো কি না, জানি না। বিমা আইন ২০১০ অনুসারে, পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের কাছে সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিমা দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে। আইডিআরএর তথ্য অনুসারে, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিমা দাবি নিষ্পত্তির হার পাঁচ শতাংশ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ছয় শতাংশ ও গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৪ শতাংশ। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের অমীমাংসিত বিমা দাবির পরিমাণ দুই হাজার ৬৪ কোটি টাকা। বিমা দাবির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি গত ৪ বছরে ১৩৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির মালিকরা জেলে থাকা অবস্থায় বিমা দাবির অনেক টাকা জমে গেছে । তিনি বলেন, বিমা দাবি দিতে না পারায় কোম্পানির অনেক বদনাম হয়েছে। ফলে, নতুন করে আর কেউ পলিসি খুলছেন না। এতে করে বিমা দাবি পরিশোধের জন্য নগদ অর্থেরও সংকট তৈরি হয়েছে। আইডিআরএর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বিমা প্রতিষ্ঠান থেকে দুই হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং ৪৩২ কোটি টাকার হিসাব অনিয়মও ধরা পড়েছে।
এর আগে অনিয়মের অভিযোগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। এ দিকে, গত ৪ বছরে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্সের অমীমাংসিত বিমা দাবির পরিমাণ ১৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। একই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি সাত কোটি ২৭ লাখ টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই বিমা কোম্পানিতে নানা অনিয়ম হয়েছে। এরপর থেকে দিন দিন বিমা দাবি কেবল জমতে শুরু করে। তিনি বলেন, এ ছাড়া, গত কয়েক বছরে নতুন পলিসি বিক্রি কমায় প্রতিষ্ঠানটির আয়ও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকদের বিমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা না হলে তা এই খাত সম্পর্কই মানুষের কাছে খারাপ বার্তা দেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাইন উদ্দিন বলেন, বিমা কোম্পানি সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি হয়ে গেলে ভালো কোম্পানিগুলোর জন্যও ব্যবসা চালানো এবং টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। সরকার কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ খাত ভালো অবস্থানে ফিরবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম মন্তব্য করেন, সময় মতো বিমা দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, এর ফলে মানুষ ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখার ব্যাপারে আস্থা হারাবে। সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাত বড় ধাক্কা খাবে। আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান সময়মতো বিমা দাবি পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের সবার একটি সাধারণ সমস্যা হচ্ছে লাইফ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। তিনি আরও বলেন, এদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত সীমার বেশি খরচ করেছে এবং নানাভাবে অর্থ অপচয় করেছে।















