১০:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অচলাবস্থার মুখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

◉ সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে শিক্ষকরা
◉ পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ প্রত্যাহারে অনড় অবস্থান
◉ ভয়াবহ সেশন জটের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা
◉ পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর
◉ বিরোধিতার মধ্যেই আজ চালু হচ্ছে প্রত্যয়

দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবার পুরোপুরি অচলাবস্থার মুখে পড়ছে দেশের পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলো। সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিমের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সুপার গ্রেডে অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর দাবিতে আজ থেকে সব ধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে লাগাতার বিরতিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনভুক্ত শিক্ষকরা। এর ফলে অচল হয়ে পড়বে সব বিশ্ববিদ্যালয়। আর শিক্ষকদের এই আন্দোলনে নির্ধারিত ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি সেশন জটের কবলে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরইমধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলাভবন ও কার্জনহল পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুষ্ঠেয় সব পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষকদের এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
জানা গেছে, গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচিতে দাবি আদায় না হওয়ায় গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের মূল ফটকে এক সংবাদ সম্মেলনে আজ থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতির এ ঘোষণা দেন ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া। এ ছাড়া গতকাল পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা।

নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, গত ১৩ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে আমরা বিবৃতি, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, প্রতীকী কর্মবিরতি, স্মারকলিপি প্রদান এবং অবস্থান কর্মসূচি, কর্মবিরতি পালন করেছি। তবে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আমরা এখনও আশা করি, সরকার অনতিবিলম্বে এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেবেন যাতে আমরা ক্লাসে ফিরে যেতে পারি। অন্যথায় ১লা জুলাই থেকে সারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালিত হবে।

এদিকে বিরোধিতার মধ্যেই আজ ১ জুলাই চালু হচ্ছে নতুন পেনশন কর্মসূচি ‘প্রত্যয়’। এটি চালু করতে অনড় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুলাই থেকেই প্রত্যয় কর্মসূচি চালু হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত সংস্থায় ১ জুলাই থেকে যারা নতুন চাকরিতে যোগ দেবেন, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যয় পেনশন কর্মসূচিতে যোগ দিতে হবে। এসব সংস্থার নতুন চাকরিজীবীরা অবসরে যাওয়ার পর প্রচলিত পদ্ধতিতে পেনশন পাবেন না।

ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, এই প্রত্যয় স্কিম চরম অপরিপক্ব হাতের কাজ। এরমাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘প্রত্যয় স্কিম’ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, যারা আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আসতে আগ্রহী, তারাও এর ভুক্তভোগী হবেন। আমাদের আন্দোলন আগামী দিনের তরুণ সমাজের স্বার্থরক্ষার পক্ষে এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের চক্রান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে অংশ নেবেন না শিক্ষকরা : আজ ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এতে অংশ নেবেন না শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিনাত হুদা বলেন, এই সর্বজনীন পেনশন স্কিম আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা হনন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না।

এদিকে প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ৯টি কর্মসূচি দিয়েছে। এগুলো হলো অনলাইন, সান্ধ্যকালীন ক্লাস, শুক্র ও শনিবারের প্রফেশনাল কোর্সের ক্লাসসহ সব ধরনের ক্লাস বন্ধ থাকবে, সকল পরীক্ষা বর্জন-মিডটার্ম, ফাইনাল ও ভর্তি পরীক্ষাসহ কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না; বিভাগীয় চেয়ারম্যান বিভাগীয় অফিস, সেমিনার, কম্পিউটার ল্যাব ও গবেষণাগার বন্ধ রাখবেন; একাডেমিক কমিটি, সমন্বয় ও উন্নয়ন কমিটি, প্রশ্নপত্র সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে না।
অনুষদের ডিনরা ডিন অফিস, ভর্তি পরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখবেন; নবীনবরণ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি গ্রহণ করা যাবে না; কোনো সিলেকশন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে না; কোনো সেমিনার, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপের কর্মসূচি গ্রহণ করবেন না; হলের প্রাধ্যক্ষগণ প্রাধ্যক্ষ অফিস বন্ধ রাখবেন এবং প্রধান গ্রন্থাগারিক কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি বন্ধ রাখবেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোতাহার হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রমুখ। এদিকে রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তারা। তারা প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহারের দাবিতে প্রশাসনিক ভবন থেকে মিছিল নিয়ে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করেছে। এতে শিক্ষকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারাও ১ জুলাই থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

সূত্রমতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত মার্চের মাঝামাঝি প্রত্যয় চালুর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রত্যয় চালুর বিরোধিতা করে আসছেন। তবে পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রত্যয় চালুর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। শুধু স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত নয়; সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা ও তাদের অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতেও যারা ১ জুলাই থেকে যোগদান করবেন, তাদের জন্য প্রত্যয় প্রযোজ্য হবে। চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট, যা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। এবারের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন আরেকটি কর্মসূচি চালু হবে।

 

শিক্ষকদের আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয় অচল হলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এ আন্দোলনের দিকে নজর রাখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে যথাসময়ে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন পেনশনের আওতায় কারা আসবে, সেটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটার সঙ্গেই আছে। শিক্ষকরা দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে জানাচ্ছেন, সরকারই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখানে কিছু করার নেই। মন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা হচ্ছে সেটাও নয়। সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ পেনশনের আওতায় আসবেন। হয়তো এ বছর শিক্ষকরা আসছেন, আগামী বছর অন্যরা আসবেন। তবে পর্যায়ক্রমে সবাই আসবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে বসেছিলেন। তারা প্রচলিত পদ্ধতি এবং সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সেটা আমরা দেখেছি। তবে এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত বা এখতিয়ারে না থাকায় আমরা তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দিইনি। দেওয়াটা আমাদের জন্য সমীচীনও নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

অচলাবস্থার মুখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট সময় : ০৭:৩৮:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ জুলাই ২০২৪

◉ সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে শিক্ষকরা
◉ পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ প্রত্যাহারে অনড় অবস্থান
◉ ভয়াবহ সেশন জটের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা
◉ পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর
◉ বিরোধিতার মধ্যেই আজ চালু হচ্ছে প্রত্যয়

দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবার পুরোপুরি অচলাবস্থার মুখে পড়ছে দেশের পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়গুলো। সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিমের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সুপার গ্রেডে অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর দাবিতে আজ থেকে সব ধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে লাগাতার বিরতিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনভুক্ত শিক্ষকরা। এর ফলে অচল হয়ে পড়বে সব বিশ্ববিদ্যালয়। আর শিক্ষকদের এই আন্দোলনে নির্ধারিত ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি সেশন জটের কবলে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরইমধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলাভবন ও কার্জনহল পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুষ্ঠেয় সব পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষকদের এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
জানা গেছে, গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচিতে দাবি আদায় না হওয়ায় গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের মূল ফটকে এক সংবাদ সম্মেলনে আজ থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতির এ ঘোষণা দেন ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া। এ ছাড়া গতকাল পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা।

নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, গত ১৩ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে আমরা বিবৃতি, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, প্রতীকী কর্মবিরতি, স্মারকলিপি প্রদান এবং অবস্থান কর্মসূচি, কর্মবিরতি পালন করেছি। তবে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আমরা এখনও আশা করি, সরকার অনতিবিলম্বে এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেবেন যাতে আমরা ক্লাসে ফিরে যেতে পারি। অন্যথায় ১লা জুলাই থেকে সারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালিত হবে।

এদিকে বিরোধিতার মধ্যেই আজ ১ জুলাই চালু হচ্ছে নতুন পেনশন কর্মসূচি ‘প্রত্যয়’। এটি চালু করতে অনড় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুলাই থেকেই প্রত্যয় কর্মসূচি চালু হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত সংস্থায় ১ জুলাই থেকে যারা নতুন চাকরিতে যোগ দেবেন, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যয় পেনশন কর্মসূচিতে যোগ দিতে হবে। এসব সংস্থার নতুন চাকরিজীবীরা অবসরে যাওয়ার পর প্রচলিত পদ্ধতিতে পেনশন পাবেন না।

ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, এই প্রত্যয় স্কিম চরম অপরিপক্ব হাতের কাজ। এরমাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘প্রত্যয় স্কিম’ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, যারা আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আসতে আগ্রহী, তারাও এর ভুক্তভোগী হবেন। আমাদের আন্দোলন আগামী দিনের তরুণ সমাজের স্বার্থরক্ষার পক্ষে এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের চক্রান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে অংশ নেবেন না শিক্ষকরা : আজ ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এতে অংশ নেবেন না শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিনাত হুদা বলেন, এই সর্বজনীন পেনশন স্কিম আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা হনন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না।

এদিকে প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ৯টি কর্মসূচি দিয়েছে। এগুলো হলো অনলাইন, সান্ধ্যকালীন ক্লাস, শুক্র ও শনিবারের প্রফেশনাল কোর্সের ক্লাসসহ সব ধরনের ক্লাস বন্ধ থাকবে, সকল পরীক্ষা বর্জন-মিডটার্ম, ফাইনাল ও ভর্তি পরীক্ষাসহ কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না; বিভাগীয় চেয়ারম্যান বিভাগীয় অফিস, সেমিনার, কম্পিউটার ল্যাব ও গবেষণাগার বন্ধ রাখবেন; একাডেমিক কমিটি, সমন্বয় ও উন্নয়ন কমিটি, প্রশ্নপত্র সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে না।
অনুষদের ডিনরা ডিন অফিস, ভর্তি পরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখবেন; নবীনবরণ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি গ্রহণ করা যাবে না; কোনো সিলেকশন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে না; কোনো সেমিনার, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপের কর্মসূচি গ্রহণ করবেন না; হলের প্রাধ্যক্ষগণ প্রাধ্যক্ষ অফিস বন্ধ রাখবেন এবং প্রধান গ্রন্থাগারিক কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি বন্ধ রাখবেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোতাহার হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রমুখ। এদিকে রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তারা। তারা প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহারের দাবিতে প্রশাসনিক ভবন থেকে মিছিল নিয়ে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করেছে। এতে শিক্ষকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারাও ১ জুলাই থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

সূত্রমতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত মার্চের মাঝামাঝি প্রত্যয় চালুর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রত্যয় চালুর বিরোধিতা করে আসছেন। তবে পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রত্যয় চালুর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। শুধু স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত নয়; সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা ও তাদের অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতেও যারা ১ জুলাই থেকে যোগদান করবেন, তাদের জন্য প্রত্যয় প্রযোজ্য হবে। চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট, যা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। এবারের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন আরেকটি কর্মসূচি চালু হবে।

 

শিক্ষকদের আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয় অচল হলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এ আন্দোলনের দিকে নজর রাখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে যথাসময়ে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন পেনশনের আওতায় কারা আসবে, সেটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটার সঙ্গেই আছে। শিক্ষকরা দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে জানাচ্ছেন, সরকারই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখানে কিছু করার নেই। মন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা হচ্ছে সেটাও নয়। সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ পেনশনের আওতায় আসবেন। হয়তো এ বছর শিক্ষকরা আসছেন, আগামী বছর অন্যরা আসবেন। তবে পর্যায়ক্রমে সবাই আসবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে বসেছিলেন। তারা প্রচলিত পদ্ধতি এবং সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সেটা আমরা দেখেছি। তবে এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত বা এখতিয়ারে না থাকায় আমরা তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দিইনি। দেওয়াটা আমাদের জন্য সমীচীনও নয়।