০৪:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাংস, মাছ—প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাজারে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এই পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, আগের মতো ক্রেতার ভিড় আর নেই। রামপুরা উলন বাজারের পপুলার স্টোরের স্বত্তাধিকারি মো. আসান উল্লাহ জানান, এখন আর আগের মতো ব্যাগ ভরে মানুষ কেনাকাটা করছে না। তার বড় ভাই সেলিম, মোল্লা সল্ট ও প্রাণের ডিলার, জমজ ভাই আমান উল্লাহ কনডেন্স মিল্ক ও নাম্বার ওয়ান-এর ডিলার তিনি ঘি, দুধ ও চাপাতা বিভিন্ন দোকানে হোলসেল দিয়ে ব্যবসা চালান। তিনিও জানান, আগের মতো দোকানে চাহিদা না থাকায় বাজারের চিত্র কেবল তাদের ব্যবসার জন্যই নয়, সমগ্র ঢাকার বাজারের জন্যই উদ্বেগজনক।

 

সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থের অভাব দেখা দিয়েছে, যার কারণে ক্রেতারা এখন কম কিনছেন। মাছ ও মাংসের দাম লাগামছাড়া, শীত মৌসুমে সবজির সরবরাহ কম থাকলেও গত দুই সপ্তাহে সব ধরনের সবজির দাম চড়া। চাল, ডাল, চা, ব্রয়লার মুরগি এবং অন্যান্য মৌসুমি পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও ডিমের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও তা ক্রেতাদের ব্যয়ভার কমাতে যথেষ্ট নয়।

বাজারে শুধু হোলসেল নয়, খুচরা দোকানেও চড়া দাম নেমে এসেছে। রাজধানী ঢাকার খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজি, আলু, ফুলকপি, বেগুন, লাউ, শিম ও টমেটোর দাম আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

আলু: ২০–২৫ টাকার পরিবর্তে ৩০–৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ফুলকপি: ২৫–৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০–৫০ টাকায়।

লাউ: ৫০–৬০ টাকার পরিবর্তে ৭০–৮০ টাকায়।

বেগুন: ৬০–১০০ টাকা, বাজার ও মানভেদে।

শিম: ৩০–৮০ টাকার মধ্যে।

টমেটো: ৮০–১০০ টাকা প্রতি কেজি।

বাঁধাকপি: ৩৫–৪০ টাকায় কিছুটা সহনীয়।

গাজর: ৪০–৫০ টাকার মধ্যে।

মুরগি ও ডিমের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। ফার্মের ডিম কমে ১১০–১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে ১৭৫–১৮০ টাকার মধ্যে। সোনালি মুরগির দাম অপরিবর্তিত, ২৪০–২৮০ টাকা প্রতি কেজি। মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম কমেছে, ৫০–৭০ টাকার মধ্যে।

 

ক্রেতারা জানান, সবকিছুই এখন তাদের সাধ্যের বাইরে। লুবনা আক্তার নামের এক গৃহিনী বলেন, স্বামীর বেতনের অর্ধেই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। তার পর সন্তানদের কলেজ খরচ, গৃহশিক্ষকের বেতন ও যাতায়াত খরচ মেটাতেই বাকীও শেষ এর পরে যে কিভাবে চলে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানেন না। তিনি বলেন, পরিবারের কোন সদস্যের যদি কোন অসুখ-বেসুখ হয় তাহলে সমস্যার আর শেষ থাকে না।
অন্যদিকে, আসমা আক্তার নামে অন্য এক গৃহবধূ বলেন, মাসের বেতনটা হাতে পেতেই পাওনাদারদের পাওনা শোধ করতেই প্রায় সব শেষ হয়ে যায়। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। কথা হয় মধ্যবয়সী তাহিমনা আক্তার নামে একজন বেসরকারী চাকরিজীর সঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের মানুষ ভালো নেই। আমরা আর পারছি না। খেয়ে-না খেয়ে জীবন চালাতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে হোটেল ব্যবসায়ী মাসুদ হোসেন জানান, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। গ্যাসের উচ্চমূল্য—সব মিলিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন দুঃসাধ্য। ১৩০৬ টাকার গ্যাস বাজারে ২০০০–২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে চালু ঋণ, বিনিয়োগের অভাব, বেসরকারি খাতের কম ক্রয়ক্ষমতা এবং শীতকালীন সরবরাহের সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব দেশের সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়েছে। শিক্ষার্থী, গৃহিনী, ছোট ব্যবসায়ী—প্রতিটি পরিবারই বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখীতা অনুভব করছে। সরকারের কার্যকর নীতি, বাজারের স্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।

এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

আপিল শুনানির অষ্টম দিনে ৪৫ আবেদন মঞ্জুর করল ইসি

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

আপডেট সময় : ০৯:৩৮:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাংস, মাছ—প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাজারে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এই পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, আগের মতো ক্রেতার ভিড় আর নেই। রামপুরা উলন বাজারের পপুলার স্টোরের স্বত্তাধিকারি মো. আসান উল্লাহ জানান, এখন আর আগের মতো ব্যাগ ভরে মানুষ কেনাকাটা করছে না। তার বড় ভাই সেলিম, মোল্লা সল্ট ও প্রাণের ডিলার, জমজ ভাই আমান উল্লাহ কনডেন্স মিল্ক ও নাম্বার ওয়ান-এর ডিলার তিনি ঘি, দুধ ও চাপাতা বিভিন্ন দোকানে হোলসেল দিয়ে ব্যবসা চালান। তিনিও জানান, আগের মতো দোকানে চাহিদা না থাকায় বাজারের চিত্র কেবল তাদের ব্যবসার জন্যই নয়, সমগ্র ঢাকার বাজারের জন্যই উদ্বেগজনক।

 

সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থের অভাব দেখা দিয়েছে, যার কারণে ক্রেতারা এখন কম কিনছেন। মাছ ও মাংসের দাম লাগামছাড়া, শীত মৌসুমে সবজির সরবরাহ কম থাকলেও গত দুই সপ্তাহে সব ধরনের সবজির দাম চড়া। চাল, ডাল, চা, ব্রয়লার মুরগি এবং অন্যান্য মৌসুমি পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও ডিমের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও তা ক্রেতাদের ব্যয়ভার কমাতে যথেষ্ট নয়।

বাজারে শুধু হোলসেল নয়, খুচরা দোকানেও চড়া দাম নেমে এসেছে। রাজধানী ঢাকার খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজি, আলু, ফুলকপি, বেগুন, লাউ, শিম ও টমেটোর দাম আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

আলু: ২০–২৫ টাকার পরিবর্তে ৩০–৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ফুলকপি: ২৫–৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০–৫০ টাকায়।

লাউ: ৫০–৬০ টাকার পরিবর্তে ৭০–৮০ টাকায়।

বেগুন: ৬০–১০০ টাকা, বাজার ও মানভেদে।

শিম: ৩০–৮০ টাকার মধ্যে।

টমেটো: ৮০–১০০ টাকা প্রতি কেজি।

বাঁধাকপি: ৩৫–৪০ টাকায় কিছুটা সহনীয়।

গাজর: ৪০–৫০ টাকার মধ্যে।

মুরগি ও ডিমের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। ফার্মের ডিম কমে ১১০–১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে ১৭৫–১৮০ টাকার মধ্যে। সোনালি মুরগির দাম অপরিবর্তিত, ২৪০–২৮০ টাকা প্রতি কেজি। মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম কমেছে, ৫০–৭০ টাকার মধ্যে।

 

ক্রেতারা জানান, সবকিছুই এখন তাদের সাধ্যের বাইরে। লুবনা আক্তার নামের এক গৃহিনী বলেন, স্বামীর বেতনের অর্ধেই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। তার পর সন্তানদের কলেজ খরচ, গৃহশিক্ষকের বেতন ও যাতায়াত খরচ মেটাতেই বাকীও শেষ এর পরে যে কিভাবে চলে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানেন না। তিনি বলেন, পরিবারের কোন সদস্যের যদি কোন অসুখ-বেসুখ হয় তাহলে সমস্যার আর শেষ থাকে না।
অন্যদিকে, আসমা আক্তার নামে অন্য এক গৃহবধূ বলেন, মাসের বেতনটা হাতে পেতেই পাওনাদারদের পাওনা শোধ করতেই প্রায় সব শেষ হয়ে যায়। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। কথা হয় মধ্যবয়সী তাহিমনা আক্তার নামে একজন বেসরকারী চাকরিজীর সঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের মানুষ ভালো নেই। আমরা আর পারছি না। খেয়ে-না খেয়ে জীবন চালাতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে হোটেল ব্যবসায়ী মাসুদ হোসেন জানান, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। গ্যাসের উচ্চমূল্য—সব মিলিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন দুঃসাধ্য। ১৩০৬ টাকার গ্যাস বাজারে ২০০০–২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে চালু ঋণ, বিনিয়োগের অভাব, বেসরকারি খাতের কম ক্রয়ক্ষমতা এবং শীতকালীন সরবরাহের সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব দেশের সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়েছে। শিক্ষার্থী, গৃহিনী, ছোট ব্যবসায়ী—প্রতিটি পরিবারই বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখীতা অনুভব করছে। সরকারের কার্যকর নীতি, বাজারের স্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।

এমআর/সবা