◉ পরিচালনা পর্ষদের আইন বিরোধী অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত
◉ স্থায়ী চাকরি থেকে জোরপূর্বক অবসায়ন করে ফের নিয়োগ
◉ মানা হচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা
◉ নিয়মবহির্ভূত পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের অভিযোগ
নানা অনিয়ম-দুর্নীতে আক্রান্ত কমার্স ব্যাংকে ছাঁটাইকৃত কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। হঠাৎ চাকরিচ্যুত করায় বিপাকে পড়েছে শতাধিক কর্মী। গত ২০ বছর যাবৎ বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে (বিসিবি) ড্রাইভার পদে নিয়মিত কর্মরত আছেন আলী হোসেন (ছদ্ম নাম)। নিয়মিত কর্মচারী হওয়ায় নিজ কর্মস্থল কমার্স ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করেছেন বাড়ি নির্মাণ, যেটির নিয়মিত কিস্তি প্রদান করছেন। মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ আলীর পরিবারে ৬ সদস্য হলেও, তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দুই সন্তানের একজন পড়ছেন স্কুলে, অপরজন কলেজে। গত রমজানের ঈদের মাত্র দুই দিন আগে কোনো বেতন বোনাস ছাড়াই হঠাৎ চাকরিচ্যুতির নোটিসে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কিভাবে শোধ করবেন বাড়ির ব্যাংক লোন, আর কিভাবেই বা চলবে সংসার। বন্ধ হওয়ার উপক্রম দুই সন্তানের লেখাপড়া। কোনো নিয়মনীতির ধার না ধেরে চিরচেনা প্রতিষ্ঠানটির এমন অমানবিক নির্দেশে শুধু আলী হোসেনই নয়, প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ শ্রেণীর আরো ১১৯ জন কর্মচারী পড়েছেন দুর্ভোগে। পরপর দুইটি ঈদ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মেলেনি সুরাহা। এদিকে চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব কর্মচারী ও তাদের উপর নির্ভর পরিবার। এ বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশনাও পাত্তা পাচ্ছে না কমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে। বরং নিয়মিত কর্মচারীদের পুনরায় কর্মে যোগদানের সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে ওইসব পদে নতুন করে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে। আর এতে শেষ আশাটুকুও ফিকে হয়ে যাচ্ছে অনিয়মের শিকার চতুর্থ শ্রেণীর এসব কর্মচারীদের।
জানা গেছে, গত ঈদুল ফিতরের মাত্র দুই দিন আগে কমার্স ব্যাংকের শতাধিক কর্মচারীকে নিয়মভেঙে চাকরিচ্যুত ও স্থায়ী চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে অবনমন করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ওইসব কর্মচারীকে পুনরায় চাকরিতে বহাল ও নিয়মিতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি শোকজ করা হয় কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে। কিন্তু এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না বিসিবি। এদিকে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় ভবিষ্যৎ শঙ্কায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকটির ১২০ জন কর্মচারী ও তাদের পরিবার। করছেন মানবেতর জীবনযাপন।
সূত্র জানায়, গত ৮ ও ৯ এপ্রিল হঠাৎ চিঠি দিয়ে বিসিবি’র ১২০ জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে (ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড, পিয়ন, ক্লিনার) চাকরি থেকে ছাঁটাই করে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ। চিঠিতে ৫৫ বছর বয়সসীমার ৩৪ জন কর্মচারীকে চাকরি থেকে অবসায়ন এবং ৮৬ জনকে নিয়মিত চাকরি বাতিল করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে আবেদন করতে বলা হয়। অথচ দেশের কোন আইনেই নিয়মিত চাকরিরতদের ছাঁটাই করে চুক্তিতে নিয়োগ বা ৫৫ বছর বয়সে চাকরি থেকে অবসায়ন করার নিয়ম নেই।
তাৎক্ষণিক এমন নোটিসের প্রেক্ষিতে গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে চাকরিচ্যুত হওয়া এসব কর্মচারী। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। কিন্তু কর্মের অধিকার ফিরে পেতে মানববন্ধন করলে সেখানেও আইনি ঝামেলায় ফেলার ইঙ্গিত দেয় বিসিবি কর্তৃপক্ষ। মানববন্ধনকারীদের পুলিশ দিয়ে তাড়িয়ে দিতে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। একইসঙ্গে ব্যাংকের সংস্থাপন বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) তৌহিদুল ইসলামের মাধ্যমে শাহবাগ থানায় করা হয় সাধারণ ডায়েরি। এসব কর্মচারী বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে শেষ সম্বল অবসরোত্তর টাকাও পাবে না বলে হুমকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা।
এদিকে গত ১৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বিষয়টির যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়। ডিওএস’র চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন নং- ১৮/২০১৮ অনুচ্ছেদ ২(খ) এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, বিসিবি’র ৩৮৬তম পর্ষদ সভায় কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা ৫৯ থেকে ৫৫ বছর করার বিষয়টি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ উক্ত প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর বয়সসীমা সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুরূপ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই পরিচালনা পর্ষদের পরবর্তী সভায় আবশ্যিকভাবে চাকরির প্রবিধানামালায় কর্মচারীদের অবসরগ্রহণের বয়সসীমা পুনঃসংশোধন করতে পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া ৫৫ বছর হিসেবে যেসব কর্মচারীকে ইতোমধ্যে কর্মচ্যুত করা হয়েছে তাদের অবসর বাতিল করে কেন চাকরিতে পুনর্বহাল করা হবে না তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। আবার স্থায়ী কর্মচারীদের অস্থায়ী চাকরিতে স্থানান্তরের বিষয়টি ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে এমনটা জানিয়ে পরিচালনা পর্ষদকে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে যতদূর জানা গেছে, এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে জবাব দিতে এক মাস সময় চেয়েছে কমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জবাব প্রদানের সময় চাইলেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ। পূর্বের কর্মচারীদের নিয়োগ বাতিল বা বহালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ কয়েকবার এটেনডেন্ট পদে কর্মচারী নিয়োগের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার প্রায় ২০-৩০ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সময় আবেদন চেয়ে এই সুযোগে লোক নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণে ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকলকে সমান সুযোগ ও অধিকার দিয়ে চাকরিতে নিয়োগ পেতে বহুল প্রচলিত দুইটি (বাংলা ও ইংরেজি) জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই নিয়োগ সংক্রান্ত লিংক থাকলেও তাতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, নিজেদের পছন্দমতো লোক নিয়োগ দিতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই ব্যক্তিগতভাবে এসব লোকের নিয়োগ সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে।















