০৩:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বজনীন পেনশন

প্রত্যয়ের প্রভাব পড়ার শঙ্কা অন্য স্কিমেও

  • রকীবুল হক
  • আপডেট সময় : ০২:৫২:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুলাই ২০২৪
  • 165

► প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আমলাদের দুষছেন শিক্ষকরা
► সরকারি কর্মজীবীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
► আন্দোলনে অনড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
► এতে দুষ্টু চক্রের ষড়যন্ত্র দেখছেন সংশ্লিষ্টরা 

সর্বজনীন পেনশনের নতুন এবং আলোচিত নাম ‘প্রত্যয় স্কিম’। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তীব্র আপত্তির মধ্যেই গত ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। তবে এটি কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই তা প্রত্যাহারের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে গেছেন শিক্ষকরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এতে গত ৮ দিন ধরে ৪০ টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকরা বলছেন-সরকারি অন্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কোন আলোচনা ছাড়াই পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয় স্কিমে’ যুক্ত করা হয়েছে। এটা একটি দুষ্ট চক্রের ষড়যন্ত্রের অংশ। এতে অবসরপরবর্তী জীবনে তারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একই সঙ্গে উচ্চ শিক্ষাখাতে মেধাবীদের আগ্রহ কমে যাবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈষম্যও বাড়বে। এই স্কিম কোনভাবেই তারা মানবেন না।

এদিকে প্রত্যয় স্কিমবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন ও সমালোচনার কারণে সর্বজনীন পেনশনের অন্যান্য স্কিুমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এরইমধ্যে চালু হওয়া বিভিন্ন স্কিমে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে খুব বেশি সাড়া পড়েনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া সাধারণ স্কিমে সাড়া ফেলতে হোচট খাওয়ার কারণেই সরকার প্রত্যয় স্কিমে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের যুক্ত হতে বাধ্য করছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

যদিও বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রত্যয়বিরোধী এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক মনে করছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিম বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন অযৌক্তিক। প্রত্যয় স্কিম নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলনের কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে প্রত্যয়বিরোধী শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রভাব অন্যান্য স্কিমে পড়বে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান কবিরুল ইজদানী খান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, এটা নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করে গত ২ জুলাই একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, কন্ট্রিবিউটরি পেনশন সিস্টেমে অংশগ্রহণকারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এককালীন নয় বরং মাসিক পেনশনের যুক্তিসংগত পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আনুতোষিকের ব্যবস্থা রাখা হয়নি বরং মাসিক পেনশনেরও কয়েকগুণ বেশি কাটা হলেও, একই পরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠান জমা দেবে। ফলে ৩০ বছর পর একজন পেনশনার প্রতি মাসে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬০ টাকা হারে আজীবন পেনশন পাবেন। তার নিজ আয়ের মোট জমা করা অর্থের পরিমাণ ১৮ লাখ টাকা এবং তিনি যদি ১৫ বছর ধরে পেনশন পান সেক্ষেত্রে তিনি মোট ২ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা পাবেন, যা তার জমার প্রায় সাড়ে ১২ গুণ বেশি। তাছাড়া পেনশনে যাবার পর কেউ ৩০ বছর জীবিত থাকলে, তার জমার প্রায় ২৫ গুণ অর্থ পেনশন পাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। পরে গত ১৩ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত, স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং এদের অধীনস্থ অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য ‘প্রত্যয়’ নামে স্কিম ঘোষণা করা হয়। ব্যাপক বিরোধিতার মধ্যেই গত ১ জুলাই এই স্কিম চালু হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সেবক নামে আরেকটি স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

গত ১০ জুন পর্যন্ত বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরে পেনশন কর্তৃপক্ষ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কার্যক্রম শুরুর ১০ মাসের মাথায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ১৭৬। এরমধ্যে সমতা স্কিমে ২,২৪,১৬৪, প্রগতি স্কিমে ২১,২৯৪, সুরক্ষা স্কিমে ৫৬,৯১৯ এবং প্রবাস স্কিমে ৭৯৯ জন নিবন্ধিত হয়ে সর্বমোট ৩,০৩,১৭৬ জন মাসিক সাবস্ক্রিপশন প্রদান করছেন।

প্রত্যয় স্কিম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জানান, বিদ্যমান পেনশন স্কিম অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে পেনশন পান সে জন্য বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। নতুন স্কিমে মূল বেতনের ১০ শতাংশ কাটা হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কেউ অধ্যাপক পদ থেকে অবসরে গেলে গ্র্যাচুইটি পান ৮০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, নতুন স্কিমে সেটি পাওয়া যাবে না। অবসরে গেলে অধ্যাপকরা এখন পেনশন বাবদ মাসে ৪৫ হাজার ৭৯০ টাকা পান; যার বিপরীতে বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। প্রত্যয় স্কিমে বেতন থেকে কেটে ও প্রতিষ্ঠানের টাকায় মানে পেনশন পাওয়া যাবে ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এককালীন কোনো টাকা পাবেন না পেনশনাররা। বর্তমানে প্রতি বছর পেনশনে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট হয়, প্রত্যয় স্কিমে সেটি বাড়বে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫ বছরে, কর্মকর্তারা ৬২ এবং কর্মচারীরা ৬০ বছরে অবসরে যান। নতুন ব্যবস্থায় সবাইকে অবসরে যেতে হবে ৬০ বছর বয়সে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শিক্ষকরা অর্জিত ছুটির বিপরীতে টাকা পেলেও সেই ব্যবস্থা নেই নতুন পেনশন স্কিমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীরা চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ও বৈশাখী ভাতা কিংবা এলপিআর সুবিধা পান। কিন্তু নতুন পেনশন স্কিমে সেটি থাকবে কি না স্পষ্ট করা নেই।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, বৈষম্যমূলক ও মর্যাদাহানিকর প্রত্যয় স্কিম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাহার, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনস্কেল প্রবর্তন এবং প্রতিশ্রুত সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আমলাদের দিকে আঙুল তুলছে বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। সংগঠনটির মহাসচিব ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, সরকারের ভেতর থেকে একটি পক্ষ বাধ্য করেছে এই প্রত্যয় স্কিমটা চালু করার জন্য। একটি দেশে একেক জনের জন্য একেক রকম সুবিধা কেন হবে? সরকারি সুযোগ-সুবিধা আপনারাও চান, আমরাও চাই। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে না দিলে আমাদের বেতন স্কেল দেন, আমরা আমাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকি। এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, সচিবদের সঙ্গে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো তুলনাই হয় না। তারা কোনোভাবেই মুখোমুখি পর্যায়ে অবস্থান করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো তৈরি করা উচিত।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সিন্ডিকেট সদস্য আবুল মনসুর আহাম্মদ বলেন, একটি দুষ্টু চক্র সরকারকে ষড়যন্ত্র করে বিপথে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে, প্রত্যয় স্কিম সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ স্কিমের মাধ্যমে বৈষম্যের শিকার হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করবো সরকার এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর প্রথমেই হোঁচট খেয়ে এখন বিভিন্ন পেনশন সুবিধাভোগীদের বাধ্যতামূলকভাবে এর আওতায় আনছে। বিশেষ করে স্বায়ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. হাসিনা খান বলেন, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো উচিত। তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘প্রত্যয়’ স্কিমের সবচেয়ে অমানবিক এবং নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রকাশ হলো নমিনির পেনশনের সুযোগ বন্ধ করা।

এদিকে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যয় স্কিম প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, এটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অংশ। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা পক্ষে-বিপক্ষে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়টি আবারও পর্যালোচনা করা যায় কী না, সেটি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে।

সর্বজনীন পেনশন

প্রত্যয়ের প্রভাব পড়ার শঙ্কা অন্য স্কিমেও

আপডেট সময় : ০২:৫২:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুলাই ২০২৪

► প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আমলাদের দুষছেন শিক্ষকরা
► সরকারি কর্মজীবীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
► আন্দোলনে অনড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
► এতে দুষ্টু চক্রের ষড়যন্ত্র দেখছেন সংশ্লিষ্টরা 

সর্বজনীন পেনশনের নতুন এবং আলোচিত নাম ‘প্রত্যয় স্কিম’। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তীব্র আপত্তির মধ্যেই গত ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। তবে এটি কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই তা প্রত্যাহারের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে গেছেন শিক্ষকরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এতে গত ৮ দিন ধরে ৪০ টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকরা বলছেন-সরকারি অন্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কোন আলোচনা ছাড়াই পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয় স্কিমে’ যুক্ত করা হয়েছে। এটা একটি দুষ্ট চক্রের ষড়যন্ত্রের অংশ। এতে অবসরপরবর্তী জীবনে তারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একই সঙ্গে উচ্চ শিক্ষাখাতে মেধাবীদের আগ্রহ কমে যাবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈষম্যও বাড়বে। এই স্কিম কোনভাবেই তারা মানবেন না।

এদিকে প্রত্যয় স্কিমবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন ও সমালোচনার কারণে সর্বজনীন পেনশনের অন্যান্য স্কিুমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এরইমধ্যে চালু হওয়া বিভিন্ন স্কিমে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে খুব বেশি সাড়া পড়েনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া সাধারণ স্কিমে সাড়া ফেলতে হোচট খাওয়ার কারণেই সরকার প্রত্যয় স্কিমে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের যুক্ত হতে বাধ্য করছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

যদিও বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রত্যয়বিরোধী এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক মনে করছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিম বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন অযৌক্তিক। প্রত্যয় স্কিম নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলনের কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে প্রত্যয়বিরোধী শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রভাব অন্যান্য স্কিমে পড়বে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান কবিরুল ইজদানী খান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, এটা নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করে গত ২ জুলাই একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, কন্ট্রিবিউটরি পেনশন সিস্টেমে অংশগ্রহণকারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এককালীন নয় বরং মাসিক পেনশনের যুক্তিসংগত পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আনুতোষিকের ব্যবস্থা রাখা হয়নি বরং মাসিক পেনশনেরও কয়েকগুণ বেশি কাটা হলেও, একই পরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠান জমা দেবে। ফলে ৩০ বছর পর একজন পেনশনার প্রতি মাসে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬০ টাকা হারে আজীবন পেনশন পাবেন। তার নিজ আয়ের মোট জমা করা অর্থের পরিমাণ ১৮ লাখ টাকা এবং তিনি যদি ১৫ বছর ধরে পেনশন পান সেক্ষেত্রে তিনি মোট ২ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা পাবেন, যা তার জমার প্রায় সাড়ে ১২ গুণ বেশি। তাছাড়া পেনশনে যাবার পর কেউ ৩০ বছর জীবিত থাকলে, তার জমার প্রায় ২৫ গুণ অর্থ পেনশন পাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চারটি আলাদা কর্মসূচি (স্কিম) নিয়ে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। প্রগতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য। সমতা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য। প্রবাস শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। আর সুরক্ষা রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। পরে গত ১৩ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত, স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং এদের অধীনস্থ অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য ‘প্রত্যয়’ নামে স্কিম ঘোষণা করা হয়। ব্যাপক বিরোধিতার মধ্যেই গত ১ জুলাই এই স্কিম চালু হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সেবক নামে আরেকটি স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

গত ১০ জুন পর্যন্ত বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরে পেনশন কর্তৃপক্ষ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কার্যক্রম শুরুর ১০ মাসের মাথায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ১৭৬। এরমধ্যে সমতা স্কিমে ২,২৪,১৬৪, প্রগতি স্কিমে ২১,২৯৪, সুরক্ষা স্কিমে ৫৬,৯১৯ এবং প্রবাস স্কিমে ৭৯৯ জন নিবন্ধিত হয়ে সর্বমোট ৩,০৩,১৭৬ জন মাসিক সাবস্ক্রিপশন প্রদান করছেন।

প্রত্যয় স্কিম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জানান, বিদ্যমান পেনশন স্কিম অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে পেনশন পান সে জন্য বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। নতুন স্কিমে মূল বেতনের ১০ শতাংশ কাটা হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কেউ অধ্যাপক পদ থেকে অবসরে গেলে গ্র্যাচুইটি পান ৮০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, নতুন স্কিমে সেটি পাওয়া যাবে না। অবসরে গেলে অধ্যাপকরা এখন পেনশন বাবদ মাসে ৪৫ হাজার ৭৯০ টাকা পান; যার বিপরীতে বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। প্রত্যয় স্কিমে বেতন থেকে কেটে ও প্রতিষ্ঠানের টাকায় মানে পেনশন পাওয়া যাবে ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এককালীন কোনো টাকা পাবেন না পেনশনাররা। বর্তমানে প্রতি বছর পেনশনে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট হয়, প্রত্যয় স্কিমে সেটি বাড়বে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫ বছরে, কর্মকর্তারা ৬২ এবং কর্মচারীরা ৬০ বছরে অবসরে যান। নতুন ব্যবস্থায় সবাইকে অবসরে যেতে হবে ৬০ বছর বয়সে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শিক্ষকরা অর্জিত ছুটির বিপরীতে টাকা পেলেও সেই ব্যবস্থা নেই নতুন পেনশন স্কিমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীরা চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ও বৈশাখী ভাতা কিংবা এলপিআর সুবিধা পান। কিন্তু নতুন পেনশন স্কিমে সেটি থাকবে কি না স্পষ্ট করা নেই।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, বৈষম্যমূলক ও মর্যাদাহানিকর প্রত্যয় স্কিম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাহার, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনস্কেল প্রবর্তন এবং প্রতিশ্রুত সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আমলাদের দিকে আঙুল তুলছে বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। সংগঠনটির মহাসচিব ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, সরকারের ভেতর থেকে একটি পক্ষ বাধ্য করেছে এই প্রত্যয় স্কিমটা চালু করার জন্য। একটি দেশে একেক জনের জন্য একেক রকম সুবিধা কেন হবে? সরকারি সুযোগ-সুবিধা আপনারাও চান, আমরাও চাই। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে না দিলে আমাদের বেতন স্কেল দেন, আমরা আমাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকি। এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, সচিবদের সঙ্গে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো তুলনাই হয় না। তারা কোনোভাবেই মুখোমুখি পর্যায়ে অবস্থান করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো তৈরি করা উচিত।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সিন্ডিকেট সদস্য আবুল মনসুর আহাম্মদ বলেন, একটি দুষ্টু চক্র সরকারকে ষড়যন্ত্র করে বিপথে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে, প্রত্যয় স্কিম সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ স্কিমের মাধ্যমে বৈষম্যের শিকার হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করবো সরকার এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী সবুজ বাংলাকে বলেন, সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর প্রথমেই হোঁচট খেয়ে এখন বিভিন্ন পেনশন সুবিধাভোগীদের বাধ্যতামূলকভাবে এর আওতায় আনছে। বিশেষ করে স্বায়ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. হাসিনা খান বলেন, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো উচিত। তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘প্রত্যয়’ স্কিমের সবচেয়ে অমানবিক এবং নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রকাশ হলো নমিনির পেনশনের সুযোগ বন্ধ করা।

এদিকে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যয় স্কিম প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, এটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অংশ। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা পক্ষে-বিপক্ষে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়টি আবারও পর্যালোচনা করা যায় কী না, সেটি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে।