◉চলছে নানামুখী চাপ, সাংবিধানিক সংকটের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
◉ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা
◉ ‘জন আকাক্সক্ষার আলোকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার চাইলে করতেই পারে’
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অনেক মন্ত্রী-এমপি। অনেকে আছেন আত্মগোপনে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি বহাল তবিয়তে আছেন বঙ্গভবনে। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সহ অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ অস্বস্তি দেখা দেয়। তবে সম্প্রতি শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দীনের দেওয়া বক্তব্যে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তার পদত্যাগ বা অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ এবং আলটিমেটাম দেয় শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশ বিপাকে পড়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। কারণ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হবে নাকি তিনি পদত্যাগ করবেনÑ এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সরকার।
রাষ্ট্রপতির অপসারণের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হলেও তাতে কিছুটা বাধা পায় প্রধান দল বিএনপির ভূমিকায়। কারণ দলটি এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চায় না। দলটি মনে করে, রাষ্ট্রপতি পদে শূন্যতা হলে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে। তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে সাংবিধানিক সংকট দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সম্ভব নয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ হলে সেটিও হবে সংবিধানের বাইরে। আর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আগে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি বলে মনে করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বলেও মনে করেন ছাত্র নেতারা।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদে মো. সাহাবুদ্দিনের থাকা না-থাকার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বহুল আলোচিত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয় নিয়ে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা করা হয়।
এ বিষয়ে বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রশ্নে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতেই বিষয়টাতে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনার মধ্যে বুধবার দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের তিন নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। দলটি এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চায় না। বিএনপি মনে করে, রাষ্ট্রপতি পদে শূন্যতা হলে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক প্রমাণ নেই বলে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের মন্তব্য সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই মন্তব্যকে ঘিরে বিভিন্ন মহল থেকে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি তুলে গত মঙ্গলবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করে। ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে মঙ্গলবার রাতে বঙ্গভবনের সামনেও বিক্ষোভ করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায়ও বঙ্গভবনের সামনের রাস্তা আটকে কতিপয় যুবক ও কিশোরকে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে দুই তিনজন নারীও ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বঙ্গভবনের সামনের রাস্তা বন্ধ করে দেন ওই বিক্ষোভকারীরা।
এর আগে গত সোমবার রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের ব্যাপারে সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাননি, এটা হচ্ছে মিথ্যাচার এবং এটা হচ্ছে ওনার শপথ লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, তিনি নিজেই ৫ আগস্ট রাত ১১টা ২০ মিনিটে পেছনে তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং উনি তা গ্রহণ করেছেন।’
এদিকে গত কয়েক দিনে মো. সাহাবুদ্দিনকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে নতুন মুখ খুঁজতে সরকারের তরফ থেকে নানামুখী তৎপরতার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের কাছে রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি রাজি হননি, এমন খবরও বেরিয়েছে সংবাদমাধ্যমে। তবে রাষ্ট্রপতির বিষয়ে গতকালই প্রথম অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা করা হয়। একাধিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ব্যাপারে ছাত্রদের দাবি রয়েছে। অন্যদিকে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বলছে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে এবং সেটা তারা চায় না। এ পরিস্থিতি আলোচনা করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। এর ফলে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এ ব্যাপারে সমাধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সংকট তৈরির অপচেষ্টা চলছে : বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতি দুই ধরনের বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে থাকার নৈতিকতাকে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তারপরও এই মুহূর্তে কোনো সংকট তৈরি কাম্য নয়, একটি মহল পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। আমরা সন্ত্রাসী ও গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করায় স্বাগত জানাই।
নেতৃদ্বয় বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকবেন কি থাকবেন না এই প্রশ্নটি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কোনো আইনি বা সাংবিধানিক প্রশ্ন নয়। এটি একেবারেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।


























