◉ আইন লঙ্ঘনের দৌড়ে এগিয়ে মোটরসাইকেল-অটোরিকশা
◉ যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করছে গণপরিবহন
◉ চিত্রনায়ক রুবেলসহ আহত ১০, অসতর্কতায় পথচারী নিহত ৬১ শতাংশ
◉ ডিএমপিতে তিনদিনে ৪০৯০ মামলায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা
➥‘ফুটপাত ব্যবহারের সুযোগ থাকলে কেউ মূল সড়কে হাঁটত না, দুর্ঘটনাও কমে যেত’
অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান, সাবেক পরিচালক, দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট
রাজধানীতে যানজট নিরসনে ও যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিরলস কাজ করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু ট্রাফিক আইনের কোনোই তোয়াক্কা করছেন না চালকরা। নিজেদের ইচ্ছেমতো যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করছেন গণপরিবহনের চালক-হেলপাররা। যানজট এড়াতে ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে উল্টোপথেও ছুটছে সরকারি-বেসরকারি পরিবহন। প্রায়ই দেখা যায়, পথচারীদের হাঁটাচলার জন্য নির্মিত ফুটপাত দিয়েও ছুটে চলছে রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষুদ্র যানবাহন। এর মধ্যে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দৌড়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে মোটরসাইকেল ও অবৈধ ইজিবাইক এবং অটোরিকশা। এদিকে গতকাল মাদারীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন চিত্রনায়ক রুবেলসহ ১০ জন। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে প্রতিদিনই পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ মামলা ও জরিমানা আদায় করলেও থামছেই না ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অসম প্রতিযোগিতা। পাল্লা দিয়ে প্রধান সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অযান্ত্রিক বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র যানবাহন। সড়কের দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা দুটি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞের মতে, চলাচলের ক্ষেত্রে অসতর্কতার কারণে শতকরা ৬১ শতাংশ পথচারী প্রাণ হারাচ্ছেন সড়কে। ফুটপাত ও ব্রিজ ব্যবহারে যথাযথ সুযোগ থাকলে, কেউ মূল সড়কে হাঁটত না। দুর্ঘটনাও কমে যেত। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যানজট নিরসনে জনগণকেও আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সড়কে যানজট নিরসনে ও যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিনিয়তই তৎপর রয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। গত দু’দিনে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৯০টি মামলায় প্রায় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানায় পুলিশ। গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই কলেজশিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তৎকালীন সরকারি সংস্থাগুলো বলেছিল, শিশুদের এই আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সড়কে চলমান বিশৃঙ্খলা আর অনিয়ম বন্ধে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ, ছিল নানা প্রতিশ্রুতিও। তবে চোখ খুলে দেওয়ার পরও সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। প্রতিদিন যত পথচারী নিহত হন তার ৬১ শতাংশ হচ্ছে অসাবধানতার কারণে। তার প্রধান কারণ হলো নিয়ম না মেনে রাস্তায় চলা। তাছাড়া প্রতিটি রেল লাইনের দুই পাশে ১০ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক হলেও এখন সেগুলোও দখল হয়ে আছে। বিভিন্ন ভাসমান ও স্থায়ী বসতির কারণে অনেক সময় শোনা যায় দুর্ঘটনার কথা। তা ছাড়া রেল লাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটার কারণেও এসব দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় দেখা যায়, রেল ক্রসিংগুলোতে বাধা থাকার পরও দ্রুত পারাপারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন চালকরা। অন্যদিকে যানবাহন চালকরাও ফোনে কথা বলা অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে এবং মোটরসাইকেলগুলো ফুটপাতে উঠে চলতে গিয়ে অনেক বেশি দুর্ঘটনার জন্ম দেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তা দিয়ে চলার সময় ট্রাফিক আইন না মেনে নিজের মতো চলার প্রবণতা বেড়েছে অনেকগুণ। তাছাড়া ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত উঁচু করে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হতেও দেখা যায় অনেককে। অধিকাংশ পথচারী ফুটপাত ব্যবহার না করে মূল সড়ক ধরেই চলেন। এতেকরে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়ার ঘটনা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বেশিরভাগ পথচারীই ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেন না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, বিগত ১১ বছরে দেশে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৮ জন নিহত ও ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন আহত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছেন ১৪ হাজার ৯২৮ জন চালক, ১৭ হাজার ১৫০ জন পথচারী, ৭ হাজার ৩৩২ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮ হাজার ৮০১ জন শিক্ষার্থী, ১ হাজার ৫৯৩ জন শিক্ষক, ৫১৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ১২ হাজার ১০৯ জন নারী, ৮ হাজার ৬৭ জন শিশু, ৫৫৯ জন সাংবাদিক, ৪৩০ জন চিকিৎসক, ২৯৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৫৫ জন শিল্পী, ৩৬১ জন আইনজীবী, ৩৩০ জন প্রকৌশলী ও ৩ হাজার ৪১৬ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৯২৮টি। নিহত ৬ হাজার ৭৭ জন এবং আহত ১ হাজার ৪৩৮ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২২৩ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৭৫৫ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে চালক ও পথচারীরা বেশি দায়ী। এদিকে গতকাল সকালে মাদারীপুরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সমাদ্দার এলাকায় মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা লেগে একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেলসহ ১০ জন।
এসব বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, যানবাহনের অতিরিক্ত গতির কারণে পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হন ৩৯ শতাংশ। আর ৬১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে পথচারীদের অসচেতনতার কারণে। তাদের অধিকাংশ হেডফোন ব্যবহার, অন্যদিকে তাকিয়ে, ট্রাফিক আইন না মানাসহ অসতর্কতার কারণে পথচারীরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি আরও বলেন, পথচারীদের মাঝে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম চালানো খুবই জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থী মারা গেছে। শিক্ষার্থীরা সচেতন হলে সবাইকে এই বিষয়ে সতর্ক করতে পারবে। রাজধানীতে বাসস্টপেজ ও জেব্রাক্রসিংয়ের নিয়ম কেউ মানছে না। অধিকাংশ যানবাহন বাসস্টপেজে থামছে না, জেব্রাক্রসিংয়ের ওপর এমনকি যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী ওঠা-নামা করছেন গণপরিবহনের চালকরা। অধিকাংশ ফুটপাত বেদখলের ফলে সাধারণ মানুষ মূল সড়ক ধরে চলাচল করে। যেখানে ফুট ওভারব্রিজ থাকার কথা সেখানে না থাকায় কেউ ব্যবহার করে না।
এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান প্রজন্ম মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব সড়কে চলতে গিয়েও দেখা যায়। অনেক সময় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ব্যবহার করছে। এতে করে নিজের জীবন যেমন ঝুঁকিতে ফেলছে তেমনই অন্যের জীবনও হুমকিতে পড়ে। কারণ গাড়ি খুব কাছে চলে আসলে হঠাৎ কোনো বাহন থামানো যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটেই যায়। এ ক্ষেত্রে যেমন আইন প্রয়োগ দরকার তেমনই সচেতনতাও জরুরি। চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয় আরও জোরদার করতে হবে। আর কেউ যেন ফোন ব্যবহার ও আইন না মেনে রাস্তা পার হতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অসাবধানতা বা অসতর্কতাকে বিক্ষিপ্তভাবে দেখা যাবে না। পুরো বিষয়টি হচ্ছে আমাদের পারিপার্শ্বিক পদ্ধতির একটি অংশ। এই পদ্ধতি অনেকটাই অকার্যকর হয়ে গেছে। ট্রাফিক আইন না মানার কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। আমাদের আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। ফলে এটি এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটপাথ ব্যবহারের সুযোগ থাকলে কেউ মূল সড়কে হাঁটত না। এতো দুর্ঘনাও ঘটতো না। তিনি বলেন, ঢাকাতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ হেঁটে কর্মস্থলে যায়। কিন্তু ফুটপাতের পরিমাণ অনেক কম। রাজধানীতে ৩ হাজার কিলোমিটার রোডম্যাপ থাকলেও মাত্র ৪০০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। পথচারীরা সিগন্যালের জন্য দাঁড়ানোর মতো জায়গাটুকু পান না। ফুটওভার ব্রিজগুলো রাস্তা থেকে ৬ মিটার উচ্চতার কারণে অনেকেই ব্যবহার করতে চান না। আমাদের দেশে পরিকল্পনাতেই দুর্বলতা রয়েছে। ফলে এভাবে কখনো পরিবর্তন সম্ভব না। ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, আমরা মোটরসাইকেলকে উৎসাহ দিয়েছি ও সরবরাহ করেছি। এর পাশাপাশি যা করণীয় ছিল তা করিনি। এখন জীবিকার সঙ্গে মোটরসাইকেল সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সরাসরি এই বাহনের ওপর নির্ভরশীল। মোটরসাইকেল এখন যে কোনো চার চাকার যানের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এদিকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের বরাত দিয়ে ডিএমপির মিডিয়া সেলের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যানজট নিরসনে জনগণকেও আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সড়কে যানজট নিরসনে ও যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিনিয়তই তৎপর রয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। গত তিনদিনে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৯০টি মামলায় ১ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও অভিযানে ৩৮৪টি গাড়ি ডাম্পিং ও ১৪৩টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান ডিসি তালেবুর রহমান।

























