১২:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফেনীতে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিখাত ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি পোষাতে ২৪ কোটি টাকার সরকারী প্রণোদনা

ফেনীতে স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতি ৫২৫ কোটি টাকা। সরকার  ক্ষতি পোষাতে ২৪ কোটি টাকার প্রণোদনাকে ‘অপ্রতুল’ মনে করছেন কৃষকরা। প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার প্রত্যাশা কৃষি বিভাগের।
বিগত ১৬ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ফেনীতে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষক পরিবার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ ৫২৫ কোটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্যায় কৃষকের ফসলি জমির আমন বীজতলা, আমন আবাদ, আউশ আবাদ, শরৎ সবজি, ফলবাগান, আদা, হলুদ ও আখসহ সব কিছুই নিচ্ছিহ্ন হয়ে যায়। দেশে খাদ্যশষ্য উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসূম আমনে ভয়াবহ এ বন্যায় জেলার অন্তত ৯৫ ভাগ কৃষক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এর কারণে জেলায় খাদ্যশষ্য উৎপাদন পরিস্থির উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই প্রভাব কাটিয়ে উঠে উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। বিগত বছরে এ খাতে বিতরণকৃত ৩ কোটি টাকার প্রণোদনাকে বাড়িয়ে কৃষকদের মাঝে এবার সাড়ে ২৪ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রণোদনার বীজ, সার ও নগদ টাকা বিতরণসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম শুরু করেছে কৃষি বিভাগ। কৃষকরা আবাদে মনোযোগী হলে আমন মৌসূমে উৎপাদনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। তবে কৃষকরা বলছেন, সরকার প্রণোদনা হিসেবে যে সহায়তা দিচ্ছে, তা কৃষকদের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। কৃষকদের ধারণা ছিলো; বন্যায় তারা যে পরিমান ফসলহানীর মুখে পড়েছে; সরকার তার ক্ষতিপূরণ দেবেন অথবা ক্ষতির পরিমান অনুযায়ী প্রণোদনা দেবেন। কিন্তুু কৃষকের সেই আশায় গুড়েবালি।
জানা যায়, বিগত ১৬ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ফেনীতে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যায় শিল্প-কারখানা, বাড়িঘর, অফিস-আদালত, ফসল, খামারসহ সর্বত্রই পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে করে জেলা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতির মুখে পড়ে। ওই সময়ে ফেনীতে ৩৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায়। যা জেলায় মোট ফসলী জমির প্রায় ৯৪ ভাগ। এতে কৃষিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষকের ক্ষতির পরিমান ৫২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। বন্যায় আমন বীজতলা, আমন আবাদ, আউশ আবাদ, শরৎ সবজি, ফলবাগান, আদা, হলুদ ও আখ চাষ নিচ্ছিহ্ন হয়ে যায়। জেলায় মৌসূমের শুরুতে বেঁধে দেওয়া আমন আবাদ কমে নেমে আসে ৪০ ভাগে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, ফেনী জেলায় ১৩৪টি কৃষি ব্লকে মোট ১ লাখ ৭৩ হাজার কৃষি পরিবার রয়েছে। আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ৭০ হাজার হেক্টর। বিগত ১ যুগের বেশি সময় ধরে এ জেলায় উদ্বৃত্ব খাদ্যশষ্য মজুদ রয়েছে। কিন্তুু উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসূম আমনে বন্যায় ধাক্কায় উৎপাদন নেমে এসেছে ৪০ ভাগেরও নিচে। এমতাবস্থায় জেলায় খাদ্য শষ্য উৎপাদন পরিসস্থিতি উদ্বৃত্ব থাকার জায়গায় উল্টো ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেই ঘাটতির চাপ কাটিয়ে উঠতেই এবার ব্যাপক হারে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, বিগত ২০২৩ সালে ফেনীতে ৪৮ হাজার ৮১০ কৃষককে ৪টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৭শ টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তুু এবার সেই প্রণোদনা বৃদ্ধি করে ৬টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে ২৪ কোটি ৫৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার ব্যায়ে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। হিসাব মতে জেলায় মোট কৃষকের ৯২ ভাগকে এ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সংগৃহিত তথ্য বলছে, বিগত বছর উফশী বোরো ধান উৎপাদনে ১০ হাজার কৃষককে ৭২ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু এবার তদস্থলে ৬০ হাজার কৃষককে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হচ্ছে। একই ভাবে গত বছর ১৬ হাজার কৃষককে হাইব্রিড বোরো চাষের জন্য ১ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। এবার তা বাড়িয়ে ২০ হাজার কৃষককে ১ কোট ৪৫ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও এবার বসতবাড়িতে ৮ প্রকারের সবজি চাষের জন্য ২৩ হাজার কৃষককে সাড়ে ৩ কোটি টাকার প্রণোদনা এবং মাঠে হাইব্রিড সবজি চাষের জন্য ৪৩ হাজার জন কৃষক পাচ্ছেন ১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার কৃষি প্রণোদনা। এর বাহিরে সমলয় পদ্ধতিতে উফশী বোরো চাষাবাদের জন্য ২টি প্রদর্শনীতে ব্যায় ধরা হয়েছে ২৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। তবে জেলায় তেল জাতীয় শষ্য উৎপাদনে বিগত বছর ২২ হাজার ৮১০ জনকে ২ লাখ ১২  লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হলেও এবার তা কমিয়ে ১২ হাজার কৃষককে ১ কোট ২১ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রণোদনার সার, বীজ ও আনুসাঙ্গিক খরচ বাবত নগদ টাকা বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এ প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে তেমন উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি।
এদিকে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকার প্রতিজন কৃষককে ১ বিঘায় চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার ও বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করছে। তাছাড়া ১জন কৃষক শুধুমাত্র ১ বিঘার জন্য প্রণোদনা পেলেও বাকী জমিতে ঋণ করেই চাষাবাদ করতে হচ্ছে। এতে করে ঋণ পরিশোধের চাপ কৃষকের উপর থেকেই যাচ্ছে। এসব কারণে সরকারী ভাবে প্রদানকৃত প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে কাংখিত মনোপরিবর্তনের কারণ হচ্ছেনা।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, আমার ১৮ বিঘা জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তুু উপজেলা থেকে আমাকে ১ বিঘা শীৎকালীন তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের জন্য প্রণোদনার সার ও বীজ দেয়া হচ্ছে। শীৎ মৌসূমে আমার বাকী ১৭ বিঘা জমির চাষাবাদ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। এ মৌসূমে চাষ করতে পারবো কিনা এখনো সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা।
আবু বকর নামের এক কৃষক জানান, কৃষি অফিস থেকে ৮ প্রকারের হাইব্রিড সবজি চাষের জন্য মরিচ, টমেটো, লাই, ব্রকলি, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপি সর্বমোট ৪০ গ্রাম বীজ ও সার দেয়া হচ্ছে। চারা উৎপাদন ও রোপনের জন্য ১ হাজার টাকা বিকাশে দেয়া হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তুু এ ধরনের সবজি দিয়েতো নিজের পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তুু সংসারের বাকী খরচ কিভাবে মেটাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। জেলাজুড়ে আবাদযোগ্য কৃষি জমির হিসাব করে পুরো জমির জন্য প্রণোদনা দেয়া হলে কৃষকরা উৎসাহী হয়ে উৎপাদনে ঝুঁকে পড়তো।  কিন্তুু সরকার যে পরিমান প্রণোদনা দিচ্ছে তাতে কৃষকদের মাঝে উৎপাদনে তেমন আগ্রহের সৃষ্টি হচ্ছেনা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিঠুন ভৌমিক জানান, বন্যায় ফেনীর ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষক পরিবারের অন্তত ৫২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূনর্বাসন ও উৎপাদনে উৎসাহী করে তোলার জন্য ২৪ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ৬ ধরনের প্রণোদনা ও পূনর্বাসন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ ফেনীর উপপরিচালক একরাম উদ্দিন বলেন, বিগত বছর ফেনীতে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার ৮১০ জন কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তুু এবার ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে ২৪ কোটি ৫৯ লাখ ১৫ হাজার ১শ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। জেলার মোট কৃষকের ৯২ ভাগকে এ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন কৃষক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা করতে পারলে আর কোন সমস্যা থাকবে না।
জনপ্রিয় সংবাদ

ফেনীতে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিখাত ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি পোষাতে ২৪ কোটি টাকার সরকারী প্রণোদনা

আপডেট সময় : ০৪:২৪:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৪
ফেনীতে স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতি ৫২৫ কোটি টাকা। সরকার  ক্ষতি পোষাতে ২৪ কোটি টাকার প্রণোদনাকে ‘অপ্রতুল’ মনে করছেন কৃষকরা। প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার প্রত্যাশা কৃষি বিভাগের।
বিগত ১৬ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ফেনীতে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষক পরিবার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ ৫২৫ কোটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্যায় কৃষকের ফসলি জমির আমন বীজতলা, আমন আবাদ, আউশ আবাদ, শরৎ সবজি, ফলবাগান, আদা, হলুদ ও আখসহ সব কিছুই নিচ্ছিহ্ন হয়ে যায়। দেশে খাদ্যশষ্য উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসূম আমনে ভয়াবহ এ বন্যায় জেলার অন্তত ৯৫ ভাগ কৃষক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এর কারণে জেলায় খাদ্যশষ্য উৎপাদন পরিস্থির উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই প্রভাব কাটিয়ে উঠে উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। বিগত বছরে এ খাতে বিতরণকৃত ৩ কোটি টাকার প্রণোদনাকে বাড়িয়ে কৃষকদের মাঝে এবার সাড়ে ২৪ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রণোদনার বীজ, সার ও নগদ টাকা বিতরণসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম শুরু করেছে কৃষি বিভাগ। কৃষকরা আবাদে মনোযোগী হলে আমন মৌসূমে উৎপাদনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। তবে কৃষকরা বলছেন, সরকার প্রণোদনা হিসেবে যে সহায়তা দিচ্ছে, তা কৃষকদের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। কৃষকদের ধারণা ছিলো; বন্যায় তারা যে পরিমান ফসলহানীর মুখে পড়েছে; সরকার তার ক্ষতিপূরণ দেবেন অথবা ক্ষতির পরিমান অনুযায়ী প্রণোদনা দেবেন। কিন্তুু কৃষকের সেই আশায় গুড়েবালি।
জানা যায়, বিগত ১৬ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ফেনীতে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যায় শিল্প-কারখানা, বাড়িঘর, অফিস-আদালত, ফসল, খামারসহ সর্বত্রই পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে করে জেলা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতির মুখে পড়ে। ওই সময়ে ফেনীতে ৩৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায়। যা জেলায় মোট ফসলী জমির প্রায় ৯৪ ভাগ। এতে কৃষিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষকের ক্ষতির পরিমান ৫২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। বন্যায় আমন বীজতলা, আমন আবাদ, আউশ আবাদ, শরৎ সবজি, ফলবাগান, আদা, হলুদ ও আখ চাষ নিচ্ছিহ্ন হয়ে যায়। জেলায় মৌসূমের শুরুতে বেঁধে দেওয়া আমন আবাদ কমে নেমে আসে ৪০ ভাগে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, ফেনী জেলায় ১৩৪টি কৃষি ব্লকে মোট ১ লাখ ৭৩ হাজার কৃষি পরিবার রয়েছে। আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ৭০ হাজার হেক্টর। বিগত ১ যুগের বেশি সময় ধরে এ জেলায় উদ্বৃত্ব খাদ্যশষ্য মজুদ রয়েছে। কিন্তুু উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসূম আমনে বন্যায় ধাক্কায় উৎপাদন নেমে এসেছে ৪০ ভাগেরও নিচে। এমতাবস্থায় জেলায় খাদ্য শষ্য উৎপাদন পরিসস্থিতি উদ্বৃত্ব থাকার জায়গায় উল্টো ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেই ঘাটতির চাপ কাটিয়ে উঠতেই এবার ব্যাপক হারে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, বিগত ২০২৩ সালে ফেনীতে ৪৮ হাজার ৮১০ কৃষককে ৪টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৭শ টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তুু এবার সেই প্রণোদনা বৃদ্ধি করে ৬টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে ২৪ কোটি ৫৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার ব্যায়ে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। হিসাব মতে জেলায় মোট কৃষকের ৯২ ভাগকে এ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সংগৃহিত তথ্য বলছে, বিগত বছর উফশী বোরো ধান উৎপাদনে ১০ হাজার কৃষককে ৭২ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু এবার তদস্থলে ৬০ হাজার কৃষককে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হচ্ছে। একই ভাবে গত বছর ১৬ হাজার কৃষককে হাইব্রিড বোরো চাষের জন্য ১ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। এবার তা বাড়িয়ে ২০ হাজার কৃষককে ১ কোট ৪৫ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও এবার বসতবাড়িতে ৮ প্রকারের সবজি চাষের জন্য ২৩ হাজার কৃষককে সাড়ে ৩ কোটি টাকার প্রণোদনা এবং মাঠে হাইব্রিড সবজি চাষের জন্য ৪৩ হাজার জন কৃষক পাচ্ছেন ১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার কৃষি প্রণোদনা। এর বাহিরে সমলয় পদ্ধতিতে উফশী বোরো চাষাবাদের জন্য ২টি প্রদর্শনীতে ব্যায় ধরা হয়েছে ২৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। তবে জেলায় তেল জাতীয় শষ্য উৎপাদনে বিগত বছর ২২ হাজার ৮১০ জনকে ২ লাখ ১২  লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হলেও এবার তা কমিয়ে ১২ হাজার কৃষককে ১ কোট ২১ লাখ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রণোদনার সার, বীজ ও আনুসাঙ্গিক খরচ বাবত নগদ টাকা বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এ প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে তেমন উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি।
এদিকে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকার প্রতিজন কৃষককে ১ বিঘায় চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার ও বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করছে। তাছাড়া ১জন কৃষক শুধুমাত্র ১ বিঘার জন্য প্রণোদনা পেলেও বাকী জমিতে ঋণ করেই চাষাবাদ করতে হচ্ছে। এতে করে ঋণ পরিশোধের চাপ কৃষকের উপর থেকেই যাচ্ছে। এসব কারণে সরকারী ভাবে প্রদানকৃত প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে কাংখিত মনোপরিবর্তনের কারণ হচ্ছেনা।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, আমার ১৮ বিঘা জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তুু উপজেলা থেকে আমাকে ১ বিঘা শীৎকালীন তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের জন্য প্রণোদনার সার ও বীজ দেয়া হচ্ছে। শীৎ মৌসূমে আমার বাকী ১৭ বিঘা জমির চাষাবাদ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। এ মৌসূমে চাষ করতে পারবো কিনা এখনো সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা।
আবু বকর নামের এক কৃষক জানান, কৃষি অফিস থেকে ৮ প্রকারের হাইব্রিড সবজি চাষের জন্য মরিচ, টমেটো, লাই, ব্রকলি, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপি সর্বমোট ৪০ গ্রাম বীজ ও সার দেয়া হচ্ছে। চারা উৎপাদন ও রোপনের জন্য ১ হাজার টাকা বিকাশে দেয়া হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তুু এ ধরনের সবজি দিয়েতো নিজের পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তুু সংসারের বাকী খরচ কিভাবে মেটাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। জেলাজুড়ে আবাদযোগ্য কৃষি জমির হিসাব করে পুরো জমির জন্য প্রণোদনা দেয়া হলে কৃষকরা উৎসাহী হয়ে উৎপাদনে ঝুঁকে পড়তো।  কিন্তুু সরকার যে পরিমান প্রণোদনা দিচ্ছে তাতে কৃষকদের মাঝে উৎপাদনে তেমন আগ্রহের সৃষ্টি হচ্ছেনা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিঠুন ভৌমিক জানান, বন্যায় ফেনীর ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষক পরিবারের অন্তত ৫২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূনর্বাসন ও উৎপাদনে উৎসাহী করে তোলার জন্য ২৪ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ৬ ধরনের প্রণোদনা ও পূনর্বাসন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ ফেনীর উপপরিচালক একরাম উদ্দিন বলেন, বিগত বছর ফেনীতে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার ৮১০ জন কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তুু এবার ১ লাখ ৫৮ হাজার কৃষককে ২৪ কোটি ৫৯ লাখ ১৫ হাজার ১শ টাকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। জেলার মোট কৃষকের ৯২ ভাগকে এ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন কৃষক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা করতে পারলে আর কোন সমস্যা থাকবে না।