একসয় মায়ে আরেকসয় নাওয়ে (নৌকা) এমন প্রবাদ যে সত্যই জীবনে প্রতিফলিত
হবে একথা কখনই ভাবেনি নৌ শ্রমিকগণ। নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে নৌকা চালাতে না
পেয়ে চরম মানবেতন জীবন যাপন করছে গাইবান্ধার নৌ শ্রমিকরা। মা না থাকার কারণে যেমন
ছোট শিশুদের দূর্ভোগে পড়তে হয়, তেমনি নদীর নব্যতা সঙকটের কারণে চরম দূর্ভোগে পড়েছে
নৌ শ্রমিকগণ। অনেকে জীবিকার তাগিদে নৌ শ্রমিকের পেশা ছেড়ে অন্য পেশার সাথে জড়িত
হয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে। ১০ বছর আগে পাঁচটি নৌকা ছিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ
উপজেলার হরিপুর চরের নৌ শ্রমিক মন্টু মিয়ার। নৌকার আয়ে সংসারের খরচ চালাতেন। এখন মাত্র
একটি নৌকা আছে তাঁর। সেটিও বছরে চার মাসের মতো চালানো যায়। নদী ভরাট হওয়ায় এখন
চলাচল বন্ধ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাঝি-মাল্লারা বেকার হয়ে পড়েছে। নদী ড্রেজিং করলে
হয়তো তিস্তা তার পুরোনো নাব্য বা যৌবন ফিরে পাবে। নদীতে পানি না থাকায় বালুচরে পড়ে
থেকে নষ্ট হচ্ছে নৌকা। শীতের মাঝামাঝি সময়ে এসে তিস্তা নদীতে নাব্য সংকট তীব্র হয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পলি জমে ভরে গেছে নদী। ড্রেজিং, সংস্কার, শাসন ও সংরক্ষণ না করায়
এক সময়ের খরস্রোতা নদীটি এখন অনেক স্থানে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্য সংকটে ২০ রুটে
নৌ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছে হাজারও নৌ শ্রমিক ও জেলে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার
তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, কঞ্চিবাড়ি, চন্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে
প্রবাহিত হয়েছে তিস্তা নদী। ৫৩ বছরেও নদী ড্রেজিং করা হয়নি। এতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক
স্থানে এখন ফসলের চাষ হচ্ছে। গতিপথ পরিবর্তন করে অসংখ্য শাখা নদীতে বিভক্ত হয়েছে। বছরে
সর্বোচ্চ ছয় মাস মূল নদীতে নৌকা চলাচল করে। বাকি সময় হেঁটে চলাচল করে মানুষ। বেলকা
চরের জেলে হরিদাস বলেন, তিস্তা নদীতে এখন আর পানি থাকে না। পলি জমে নদী ভরে গেছে। এতে
মাছ ধরারও সুযোগ নেই। ১৫ বছর ধরে জেলেরা সেভাবে মাছ ধরতে পারছে না। এ জন্য অনেকে চাষের
মাছের ব্যবসা করছে। অনেকে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে। এক সময় উপজেলার হরিপুর,
বেলকা, মীরগঞ্জ ও তারাপুর খেয়াঘাট থেকে নৌযান চলাচল করত। পীরগাছা, কাউনিয়া, উলিপুর,
কুড়িগ্রাম, কাশিমবাজার, চিলমারী, রৌমারী, মোল্লারচর, ভূরুঙ্গামারী, দেওয়ানগঞ্জ, কামারজানি,
গাইবান্ধা, সাঘাটা, ফুলছড়ি, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, বালাসীঘাট, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও
ময়মনসিংহ রুটে এসব নৌকা চলত। নাব্য সংকটে সব রুট বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নৌ শ্রমিক
ও জেলেরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে জীবিকার জন্য অন্য
পথ বেছে নিয়েছে। বাদামের চরের ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী বলেন, জেলা ও উপজেলা শহর থেকে
কাপাসিয়া ইউনিয়নের বাদামের চরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়
এখন বিভিন্ন যানবাহনে জেলা ও উপজেলা শহর থেকে পণ্য এনে ব্যবসা করা কষ্টকর হচ্ছে। ঘোড়ার
গাড়ি ও হাঁটা ছাড়া অন্য উপায়ে চরে চলাচলের উপায় নেই। ১৫ বছর আগেও নৌপথে পণ্য আনা
নেওয়া করা যেত। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজির হোসেন বলেন, পলি জমে
তিস্তা নদী ভরাট হয়ে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। প্রতি বছর বন্যার সময় ভাঙনে বসতবাড়ি ও
হাজারো একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। ড্রেজিং করে মূল স্রোতে ফিরে আনলে ভাঙন
থেকে রক্ষা পাবে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী
মো.হাফিজুল হক বলেন, নদী ড্রেজিং ও সংরক্ষণ এবং স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ সরকারের উচ্চ মহল
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
শিরোনাম
নদীর নব্যতা সংকটে নৌ শ্রমিকদের মানবেতন জীবন যাপন
-
রংপুর ব্যুরো - আপডেট সময় : ১২:৪০:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫
- ।
- 37
জনপ্রিয় সংবাদ




















