০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হালদার জীববৈচিত্র্য ও মাছের পরিবেশ ধ্বংসের মুখে অবৈধ ইট ভাটা

  • নয়ন চৌধুরী
  • আপডেট সময় : ০৪:৪২:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৫
  • 111
 দক্ষিণ এশিয়ার মিঠাপানির মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র কেন্দ্র হালদা নদী। হালদার মা মাছ থেকে পাওয়া ডিম ও উৎপাদিত রেণু এবং সেই রেণু থেকে মাছ সব মিলিয়ে দেশের মৎস্য খাতে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে হালদা। জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান বছরে প্রায় ৮২১ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরো বিষয়টি এখন হুমকির মুখে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন ও চর কাটার ফলে কিছুদিন আগেও ভয়াবহ বন্যায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে পাইন্দং, ভুজপুরসহ পুরো ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারীর বিশাল এলাকা।
দেশের একমাত্র এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র  হালদা নদীর পরিবেশ ধ্বংস করছে হালদা পাড়ে গড়ে উঠা অবৈধ দুইটি ইটভাটা। এই দু’টি ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে নদীর পাড়ে মাটি ও  যান্ত্রিক নৌযানের আঘাতে মরছে মা মাছ, ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের মোকামিপাড়া এলাকার  অংশে হালদা নদীর পাড় ঘেঁষে এ আলী নামে একটি ইট ভাটায় ভেকু দিয়ে নদীর পাড় কাটার দৃশ্য চোখে পড়ে। একইভাবে উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামে শান্তি ব্রিকস নামের আরেকটি ইটভাটায় হালদা নদীর জেগে উঠা চর কেটে নৌকায় পরিবহন করে ইট তৈরি জন্য মাটি স্তূপ করে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ে। এভাবে এই দুইটি অবৈধ ইটভাটা ধ্বংস করছে হালদার পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তর এ.আলী ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেন। অভবযানের বেশ কিছুদিন পর পুনরায় এ. আলী ইটভাটা আবার চালু করা হয়। এই দু’টি ইটভাটার মাটি জোগানের জন্য নদীর পাড় কাটা, বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি আনা এবং প্রস্তুতকৃত ইট সরবরাহ কাজে যান্ত্রিক নৌযানের ব্যবহার, ইটভাটা শ্রমিকদের জন্য নদীর পাড়ে স্থাপনকৃত খোলা শৌচাগারসহ নানান কারণে হুমকির মুখে পড়েছে হালদা নদীর মা মাছ তথা জীববৈচিত্র্য। এ জন্য নদীপাড়ের ইটভাটা বন্ধে জোর দাবি জানিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। এ. আলী ব্রিকস ও শান্তি ব্রিকস নামে দুটি ইটভাটার মালিকরা রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কচুখাইন গ্রামের অংশে হালদার চর, উরকিরচর ইউনিয়নের পশ্চিম আবুরখীল এলাকায় পুরাতন হালদা নদীন চর থেকে মাটি কেটে যান্ত্রিক নৌযানে পরিবহন করে ইট ভটায় স্তুূপ করা হচ্ছে ইট তৈরির জন্য। এছাড়াও ভেকু দিয়েও কাটা হচ্ছে হালদার পাড়ের মাটি। মা মাছের প্রজনন রক্ষায় হালদা নদীতে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও হালদার পাড়ে গড়ে উঠা ইটভাটা মালিকেরা তা অমান্য করে চরের মাটি কেটে যান্ত্রিক নৌযানে পরিবহন করছে প্রতিনিয়ত। ফলে হালদার মা মাছ, ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট ভাটার কারণে এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বিপন্ন হচ্ছে নদীর পরিবেশ। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের ধ্বংস করা হলেও দেখার কেউ নেই। শান্তি ব্রিকসের অংশীজন প্রিয়তোষ বড়ুয়া বলেন, নদীর পাড় হলেও এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। তবে ইটভাটার কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।
এ. আলী ব্রিকস ইটভাটার মালিক রাশেদ বলেন, হালদা নদীর পাড় হলেও এসব জমি আমাদের নিজস্ব জায়গা। আমরা নদীর পাড়ে যে মাটি খনন করছি, তা পুনরায় ভরাট করে দেয়া হবে। তবে পরিবেশ দূষণের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো ধরনের মন্তব্য করেননি তিনি।
বিশিষ্ট হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক  ড. মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, হালদার পাড়ে গড়ে উঠা ইট ভাটাগুলো অবৈধ। এসব ইটভাটাগুলোর কারণে দূষিত হচ্ছে আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং হালদা নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্র। হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে এসব ইটভাটাগুলো বন্ধ করতে  প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।
এই গবেষক আরো বলছেন, হালদার পরিবেশ দিন দিন নাজুক হচ্ছে। হালদায় অবৈধ সব ব্যাপার হালদাকে ক্রমাগত মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে। অবৈধ দখল, নদীর উজানে অবৈধ রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। হালদার আশপাশের ছোট ছোট খালের বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিদিন এসে পড়ছে এ নদীতে। নদী তীরে গড়ে ওঠা ইটভাটা, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বাঁধ তৈরিতে মাছের খাবার কমে যাওয়া, ইঞ্জিনচালিত নৌকার তেলসহ নানা কারণে হালদার প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। হালদার ডলফিন সম্পর্কে ড. মো: শফিকুল ইসলাম প্রতিবেদককে আরো বলেন, বাংলাদেশে সাত প্রজাতির ডলফিন পাওয়া যায় (IUCN-Bangladesh-2015)। যার মধ্যে গাঙ্গেয় ডলফিন (Platanista gangetica) মিঠাপানির নদীর প্রধান ডলফিন। হালদা নদীতে বসবাসকারী গাঙ্গেয় ডলফিন বাংলাদেশের বিপন্ন প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণি। যা স্হানীয়ভাবে শিশু, শুশ, হুস, হুচ্চুম, শুশুক ও ডলফিন নামে পরিচিত। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গাঙ্গেয় ডলফিন সাধারণত (৭-৮) ফিট লম্বা এবং ওজন (৫১-৮৯) কেজি। স্বাভাবিক অবস্থায় বয়সকাল (২৮-৩০) বছর। ডলফিনের উপস্হিতি একটি নদীর জলজ বাস্ততন্থের স্বাস্হ্যের একটি  নির্ভরযোগ্য সূচক। নদীতে ডলফিনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সেই নদীর বাস্তুতন্থের  সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি নির্দেশ করে।  কিন্তু যদি সেই জনসংখ্যা হ্রাস পায়, তবে এটি সম্পূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি লাল পতাকা হিসাবে বিবেচিত। সারাবিশ্বে ডলফিন মৃত্যুর ৭০% কারণ হচ্ছে কারেন্ট জাল। ডলফিন চলাচলের সময় জালের অবস্থান প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নির্ণয় করতে পারেনা (জালের সুতা শব্দ তরঙ্গ শোষণ করে) । যার কারণে সহজে জালে জড়িয়ে পড়ে।  পাশাপাশি ডলফিনের বয়সবৃদ্বি, খাদ্যের অভাব, দুষণ, পানির গুনাবলি পরিবর্তন,ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পৃক্ত। গত ১৮ ডিসেম্বর বুধবার সকালে হালদা নদীর বাউজান অংশের আজিমারঘাটের একটু নিচের দিকে পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় একটি গাঙ্গেয় প্রজাতির মৃত্য ডলফিন উদ্ধার করা হয়। ডলফিনটির দৈর্ঘ্য ৪৫ ইঞ্চি এবং ওজন ১৩.৩৯০ কেজি। এই নিয়ে এই বছরে হালদায় ৩ টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে এবং হালদা নদীতে মোট মৃত উদ্ধার করা ডলফিনের সংখ্যা ৪২ টি। ডলফিনটি পঁচে যাওযায় এটি মাটি চাপা দেওয়া হয়। হালদার বাস্ততন্তুকে ডলফিনের নিরাপদ আবাসস্থল করতে  বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২  (ডলফিন ও তিমি আইন) সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এবিষয়ে হাটহাজারী  উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, হালদা নদীর মা মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে নদী থেকে মাছ ধরার জাল উদ্ধার করে ধ্বংস করা হয়। পাশাপাশি  ইটভাটা গুলোতে অভিযান চালানোর জন্য পাশ্ববর্তী রাউজান উপজেলা প্রশাসন ও নৌ পুলিশের সাথে সমন্বয় করে যৌথভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জনপ্রিয় সংবাদ

ভোটে দেখতে আসবেন প্রায় ৫০০ বিদেশি সাংবাদিক-পর্যবেক্ষক: ইসি সচিব আখতার

হালদার জীববৈচিত্র্য ও মাছের পরিবেশ ধ্বংসের মুখে অবৈধ ইট ভাটা

আপডেট সময় : ০৪:৪২:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৫
 দক্ষিণ এশিয়ার মিঠাপানির মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র কেন্দ্র হালদা নদী। হালদার মা মাছ থেকে পাওয়া ডিম ও উৎপাদিত রেণু এবং সেই রেণু থেকে মাছ সব মিলিয়ে দেশের মৎস্য খাতে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে হালদা। জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান বছরে প্রায় ৮২১ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরো বিষয়টি এখন হুমকির মুখে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন ও চর কাটার ফলে কিছুদিন আগেও ভয়াবহ বন্যায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে পাইন্দং, ভুজপুরসহ পুরো ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারীর বিশাল এলাকা।
দেশের একমাত্র এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র  হালদা নদীর পরিবেশ ধ্বংস করছে হালদা পাড়ে গড়ে উঠা অবৈধ দুইটি ইটভাটা। এই দু’টি ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে নদীর পাড়ে মাটি ও  যান্ত্রিক নৌযানের আঘাতে মরছে মা মাছ, ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের মোকামিপাড়া এলাকার  অংশে হালদা নদীর পাড় ঘেঁষে এ আলী নামে একটি ইট ভাটায় ভেকু দিয়ে নদীর পাড় কাটার দৃশ্য চোখে পড়ে। একইভাবে উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামে শান্তি ব্রিকস নামের আরেকটি ইটভাটায় হালদা নদীর জেগে উঠা চর কেটে নৌকায় পরিবহন করে ইট তৈরি জন্য মাটি স্তূপ করে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ে। এভাবে এই দুইটি অবৈধ ইটভাটা ধ্বংস করছে হালদার পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তর এ.আলী ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেন। অভবযানের বেশ কিছুদিন পর পুনরায় এ. আলী ইটভাটা আবার চালু করা হয়। এই দু’টি ইটভাটার মাটি জোগানের জন্য নদীর পাড় কাটা, বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি আনা এবং প্রস্তুতকৃত ইট সরবরাহ কাজে যান্ত্রিক নৌযানের ব্যবহার, ইটভাটা শ্রমিকদের জন্য নদীর পাড়ে স্থাপনকৃত খোলা শৌচাগারসহ নানান কারণে হুমকির মুখে পড়েছে হালদা নদীর মা মাছ তথা জীববৈচিত্র্য। এ জন্য নদীপাড়ের ইটভাটা বন্ধে জোর দাবি জানিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। এ. আলী ব্রিকস ও শান্তি ব্রিকস নামে দুটি ইটভাটার মালিকরা রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কচুখাইন গ্রামের অংশে হালদার চর, উরকিরচর ইউনিয়নের পশ্চিম আবুরখীল এলাকায় পুরাতন হালদা নদীন চর থেকে মাটি কেটে যান্ত্রিক নৌযানে পরিবহন করে ইট ভটায় স্তুূপ করা হচ্ছে ইট তৈরির জন্য। এছাড়াও ভেকু দিয়েও কাটা হচ্ছে হালদার পাড়ের মাটি। মা মাছের প্রজনন রক্ষায় হালদা নদীতে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও হালদার পাড়ে গড়ে উঠা ইটভাটা মালিকেরা তা অমান্য করে চরের মাটি কেটে যান্ত্রিক নৌযানে পরিবহন করছে প্রতিনিয়ত। ফলে হালদার মা মাছ, ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট ভাটার কারণে এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বিপন্ন হচ্ছে নদীর পরিবেশ। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের ধ্বংস করা হলেও দেখার কেউ নেই। শান্তি ব্রিকসের অংশীজন প্রিয়তোষ বড়ুয়া বলেন, নদীর পাড় হলেও এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। তবে ইটভাটার কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।
এ. আলী ব্রিকস ইটভাটার মালিক রাশেদ বলেন, হালদা নদীর পাড় হলেও এসব জমি আমাদের নিজস্ব জায়গা। আমরা নদীর পাড়ে যে মাটি খনন করছি, তা পুনরায় ভরাট করে দেয়া হবে। তবে পরিবেশ দূষণের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো ধরনের মন্তব্য করেননি তিনি।
বিশিষ্ট হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক  ড. মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, হালদার পাড়ে গড়ে উঠা ইট ভাটাগুলো অবৈধ। এসব ইটভাটাগুলোর কারণে দূষিত হচ্ছে আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং হালদা নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্র। হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে এসব ইটভাটাগুলো বন্ধ করতে  প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।
এই গবেষক আরো বলছেন, হালদার পরিবেশ দিন দিন নাজুক হচ্ছে। হালদায় অবৈধ সব ব্যাপার হালদাকে ক্রমাগত মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে। অবৈধ দখল, নদীর উজানে অবৈধ রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। হালদার আশপাশের ছোট ছোট খালের বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিদিন এসে পড়ছে এ নদীতে। নদী তীরে গড়ে ওঠা ইটভাটা, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বাঁধ তৈরিতে মাছের খাবার কমে যাওয়া, ইঞ্জিনচালিত নৌকার তেলসহ নানা কারণে হালদার প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। হালদার ডলফিন সম্পর্কে ড. মো: শফিকুল ইসলাম প্রতিবেদককে আরো বলেন, বাংলাদেশে সাত প্রজাতির ডলফিন পাওয়া যায় (IUCN-Bangladesh-2015)। যার মধ্যে গাঙ্গেয় ডলফিন (Platanista gangetica) মিঠাপানির নদীর প্রধান ডলফিন। হালদা নদীতে বসবাসকারী গাঙ্গেয় ডলফিন বাংলাদেশের বিপন্ন প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণি। যা স্হানীয়ভাবে শিশু, শুশ, হুস, হুচ্চুম, শুশুক ও ডলফিন নামে পরিচিত। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গাঙ্গেয় ডলফিন সাধারণত (৭-৮) ফিট লম্বা এবং ওজন (৫১-৮৯) কেজি। স্বাভাবিক অবস্থায় বয়সকাল (২৮-৩০) বছর। ডলফিনের উপস্হিতি একটি নদীর জলজ বাস্ততন্থের স্বাস্হ্যের একটি  নির্ভরযোগ্য সূচক। নদীতে ডলফিনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সেই নদীর বাস্তুতন্থের  সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি নির্দেশ করে।  কিন্তু যদি সেই জনসংখ্যা হ্রাস পায়, তবে এটি সম্পূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি লাল পতাকা হিসাবে বিবেচিত। সারাবিশ্বে ডলফিন মৃত্যুর ৭০% কারণ হচ্ছে কারেন্ট জাল। ডলফিন চলাচলের সময় জালের অবস্থান প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নির্ণয় করতে পারেনা (জালের সুতা শব্দ তরঙ্গ শোষণ করে) । যার কারণে সহজে জালে জড়িয়ে পড়ে।  পাশাপাশি ডলফিনের বয়সবৃদ্বি, খাদ্যের অভাব, দুষণ, পানির গুনাবলি পরিবর্তন,ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পৃক্ত। গত ১৮ ডিসেম্বর বুধবার সকালে হালদা নদীর বাউজান অংশের আজিমারঘাটের একটু নিচের দিকে পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় একটি গাঙ্গেয় প্রজাতির মৃত্য ডলফিন উদ্ধার করা হয়। ডলফিনটির দৈর্ঘ্য ৪৫ ইঞ্চি এবং ওজন ১৩.৩৯০ কেজি। এই নিয়ে এই বছরে হালদায় ৩ টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে এবং হালদা নদীতে মোট মৃত উদ্ধার করা ডলফিনের সংখ্যা ৪২ টি। ডলফিনটি পঁচে যাওযায় এটি মাটি চাপা দেওয়া হয়। হালদার বাস্ততন্তুকে ডলফিনের নিরাপদ আবাসস্থল করতে  বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২  (ডলফিন ও তিমি আইন) সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এবিষয়ে হাটহাজারী  উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, হালদা নদীর মা মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে নদী থেকে মাছ ধরার জাল উদ্ধার করে ধ্বংস করা হয়। পাশাপাশি  ইটভাটা গুলোতে অভিযান চালানোর জন্য পাশ্ববর্তী রাউজান উপজেলা প্রশাসন ও নৌ পুলিশের সাথে সমন্বয় করে যৌথভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে।