পাঁচ মাস আগে ক্ষমতা হারানোর পর ধীরে ধীরে আবারও মাঠে ফেরার পথ খুঁজছে নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ। পালিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিতে সরব হচ্ছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এরই অংশ হিসেবে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলাতেও ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আর আত্মগোপনে থেকেও নিজ দলের ‘অস্তিত্ব’ জানান দিতে কাজ সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন সাবেক এমপি আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন।
গত শনিবার (১৮ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগসহ বেশকিছু দাবিতে হরতাল আহ্বান করে আওয়ামী লীগ। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৮ জানুয়ারি সকালে হরতাল উপলক্ষ্যে নিজ এলাকায় কিছুক্ষণের জন্য সড়ক অবরোধ করেন তুহিনের কর্মী-সমর্থকরা। এমনকি তুহিন নিজেই সমস্ত কার্যক্রম তদারকি করেন। সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে তারা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো অবস্থান করে এবং নানারকম সরকারবিরোধী স্লোগান দেয় তারা। এরপর বেলা দুইটার দিকে কর্মসূচি পালনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করেন তিনি। এমনকি সেই ভিডিওতে ক্যাপশন দেন “এভাবেই গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। শেখ হাসিনা অবশেষ আসবে ফিরে বীরের বেশে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।”
এদিকে আত্মগোপনে থেকে আবারও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হয়েও সাবেক এমপি তুহিনের সক্রিয় অংশগ্রহণে দলটি আবারও ধ্বংসযজ্ঞের রাজনীতি শুরু করায় প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন তারা।
মেহেদী হাসান সুমন নামক উপজেলা বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের এক কর্মী বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে আমাকে সাতটি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে এমপি তুহিন। শুধুমাত্র বিএনপি রাজনীতি পছন্দ করি বলে আমার মতো সাধারণ একজন কর্মীর নামে যদি সাতটি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এমন সারা নান্দাইলে শত শত বিএনপির নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে তারা। অথচ আওয়ামী লীগ কিছুদিন আগেও হাজারও মানুষকে হত্যা করে আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, যেখানে আওয়ামী লীগ কিছুই করতে পারে না, সেখানে নান্দাইল কীভাবে কিছুদিন পর পর কর্মসূচি পালন করে আমাদের বুঝে আসে না। এক্ষেত্রে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা আমাদের হতাশ করে।
নান্দাইল উপেজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকর্মী রাফিউল ইসলাম বলেন, তুহিন বিগত দিনে নান্দাইলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছে। এখন দেখছি সে আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তার নেতাকর্মীদের দিয়ে হরতাল পালন করেছে, এমনকি আমরা যারা আন্দোলনে ছিলাম আমাদেরকে নিয়মিত হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে। এতো হত্যাকাণ্ড চালানোর পরও যদি দলটি আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসে, তাহলে এরচেয়ে লজ্জা আর হতাশার কিছু থাকে না। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত হাতে তাদেরকে দমন করবে। আবারও যদি তারা কোন কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে, তাহলে আমরা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবো।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ দেশে যে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্টা করেছিলো, তা আগামী দিনেও যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের জন্য শিক্ষনীয় হবে বলে আশা করি। আমরা যারা দেশকে নতুনরূপে স্বাধীন করেছি, আমরা আবারও চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী আর লুটপাটের রাজনীতি দেখতে চােই না।
এদিকে সাবেক এমপি তুহিনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু বিরোধী নেতাকর্মীদেরই নয়। খোদ একাধিক নেতাকর্মীরও অভিযোগ এমপি থাকাকালীন বিগত দশ বছর আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে মূল্যায়ন করেননি তুহিন। তাদের দাবি, টাকার বিনিময়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পাইয়ে দিয়েছেন তুহিন। কেন্দ্র থেকে দেওয়া নৌকার প্রার্থী পছন্দ না হলে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, তুহিনের বাড়িটিকে ঘিরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। দলের ত্যাগী নেতারা ছিলেন কোণঠাসা। এ নিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মীদের মধ্যেই চাপা অসন্তোষ ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ নির্বাচিত হন আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন। এরপর ২০১৮ সালে আ’লীগের পাতানো নির্বাচনে দ্বিতীয় বার সংসদ সদস্য হন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় ঈগল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তবে মেজর আব্দুস সালামের নৌকা প্রতীকের কাছে হেরে কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকেন। সর্বশেষ গত ৫ আগষ্টের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনকে প্রতিহত করতে নান্দাইলে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল মিটিং করেন তুহিন। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।
আরও জানা গেছে, ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ নির্বাচিত হয়ে নান্দাইল উপজেলায় পোষ্ট অফিস রোডের তিনতলা একটি বাড়ি কিনেন তুহিন। এরপর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাড়িটি হয়ে উঠেছিল সব ক্ষমতার কেন্দ্র। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পুড়িয়ে দেওয়া হয় সেই বাড়িটি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এমপি তুহিনের নামে আগেই দুর্নীতির মামলা ছিলো। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ আরও একাধিক মামলা হয়। কিছুদিন আগে দিনাজপুরে নিকটাত্মীয়ের (দাদা শ্বশুরের বাসা) বাসায় আত্মগোপনে থাকার খবরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায়। তবে আগেই সেখান থেকে সটকে পড়েন তিনি। এখন আত্মগোপনে থেকে তার নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচির পোস্ট দিচ্ছেন।




















