পানি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পাঠ্যসূচিতে পানি এবং নদী বিষয়ে শিখন-পঠনে সকলকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা এবং দেশের নদী ও নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজ করার প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে পর্দা নামল এবারের ‘১০ম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের’।
সোমবার পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত দু’দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপনী দিনে এসব প্রস্তাবনার কথা জানানো হয়।
সম্মেলনের প্রাপ্তি নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, “দু’দিনের আলোচনায় আমরা পানি এবং নদী বিষয়ে অনেক সুন্দর আলোচনা এবং প্রস্তাবনা পেয়েছি। আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করবো এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তা তুলে ধরবো। এবারের সম্মেলনে আমরা ‘হাইড্রো ডিপ্লোমেসি এবং সমুদ্রের ভবিষ্যৎ’কে প্রাধান্য দিয়েছি। এ নিয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে, আমরা সেগুলো আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ নিয়ে আলোচনায় তুলতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করবো।”
পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিতের দাবিসহ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সোমবার আলোচ্যসূচিতে ছিল ‘পানি বিষয়ক শিক্ষাকে মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ’, ‘সহযোগিতার ভূ-রাজনীতি এবং সমুদ্র ও পানিসম্পদ রক্ষা এবং সমুদ্রের ভবিষ্যতে’র মত বিষয়গুলো।
দু’দিনের আলোচনায় সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ ছাড়াও বক্তব্য রাখবেন নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. সৈয়দ শাহজাহান আহমেদ বলেন, “নদী এবং পানি রক্ষায় তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা, পড়াশোনা এবং গবেষণায় জোর দিয়ে সরকার কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতিসংঘের এসডিজিতে রয়েছে, যেখানে পানি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমরাও তা সংযুক্ত করবো। প্রয়োজনে পাঠ্যসূচিতেও তা যুক্ত করতে আমরা কাজ করবো।”
পানিভিত্তিক সম্পর্কের আলোচনায় সম্মেলনের শেষদিনেও গুরুত্ব পায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ন্যায্য বণ্টন বিষয়টি।
সোমবার সমাপনী পর্বে আলোচনায় অংশ নেন ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষক জয়ন্ত বসু। তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমবণ্টন নীতি হওয়া উচিৎ। সেক্ষেত্রে প্রমাণ-ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত তাদের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারে।”
সম্মেলনের শেষ দিনে দেশের নদী-উপনদীগুলো আলোচনায় উঠে আসে নদী ও পানি বিষয়ক নানান সংকট এবং করণীয়সমূহ। আলোচনায় প্রয়োজনে ভারতের পাশাপাশি চীন এবং নেপালকেও সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, বলেন, “দেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর নাব্যতা এবং প্রবাহ নিশ্চিতে প্রয়োজনে নদীর উৎস দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানে যেতে পারে।”
দু’দিনব্যাপী সেশনগুলোত প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে টেকসই, জলবায়ু সহনশীল, বিশুদ্ধ পানির উৎসে এবং সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকারের আহ্বান জানানো হয়। এক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, ভূ-গর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ এবং পানি পরিশোধন ব্যবস্থায় বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়। এছাড়াও শেষ দিনের আলোচনায় জোর দেওয়া হয় কার্যকরী নীতি গ্রহণেও। সেজন্য ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, পানির ঘাটতি এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যের প্রভাব মোকাবেলায় নীতির কথা বলা হয়।
এছাড়াও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত এবং নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রচারণায় গুরুত্ব আরোপ করেন আলোচকরা। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এসব খাতে ভর্তুকির আহ্বান জানানো হয়েছে সম্মেলনজুড়ে।
দ্বিতীয় দিন সকালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর ঘুরে দেখেন সম্মেলনে আগত দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। পরে পানি জাদুঘর জনপ্রিয়করণ এবং আরও বেশি জন সম্পৃক্তকরণেও জোর দেওয়া হয় সম্মেলন থেকে।
দু’দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশ নেন অস্ট্রেলিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের পানি, জ্বালানি এবং জলবায়ু বিষয়ক লিড স্পেশালিষ্ট ড. জন ডোর, সিঙ্গাপুরের ঢাকা সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি ঢানভা লিনগেশ, ভারতের ডিসট্রিক্ট রেইনওয়াটার হাসভেস্ট মিশন-এর পরিচালক ড. জস. সি. রাফায়েল, নেপালের রেজিওনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড কোলাবোরেশন-এর পলিসি অ্যানালিস্ট আভাস পান্ডেসহ দেশ-বিদেশ থেকে আগত শিক্ষাবিদ, গবেষক, সুশীল সমাজ, পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিসহ দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা।




















