০৩:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভাইরাল অডিওতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি ,নান্দাইলে ডিলার নিয়োগে ‘টাকার খেলা’

• প্রজ্ঞাপন জারির পর ‘নতুন তালিকা’ প্রকাশ
• লটারি ছাড়াই নাম পরিবর্তন
• অডিও ফাঁসে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত
• তদন্ত রিপোর্ট অপ্রকাশিত
• ইউএনওর নিরব ভূমিকা
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় সরকার পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকার অনিয়ম- বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে,যা নিয়ে সরগরম পুরো উপজেলা।শুরুতে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগের ঘোষণা এলেও পরে হঠাৎ বদলে যায় চিত্র,বাদ পড়ে পুরনো নাম,সেইসঙ্গে ঢুকে নতুন মুখ।এ নিয়েই যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড়,ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এক অডিও-যেখানে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাকে ঘুষ লেনদেনের বিষয় স্পষ্ট স্বীকার করতে শোনা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের জন্য ৫০টি ডিলার পদের বিজ্ঞপ্তি দেয় উপজেলা খাদ্য অফিস।এতে আবেদন করেন ২৩২ জন।যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সভায় ৫০ জনের নাম চূড়ান্ত করে গত ২ মার্চ তারিখে তালিকা প্রকাশ করা হয়।কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র একদিনের মাথায় শুরু হয় নাটক। অভিযোগ ওঠে-যোগ্যদের বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে নতুন তালিকা বানানো হয়েছে।
লটারি না দিয়েই গোপনে নাম বাদ দেওয়া হয়,যুক্ত হয় অন্য নাম।এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাদ পড়া প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হন,স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেন।
অডিও ফাঁসে বেরিয়ে আসে ভেতরের কথা
নিয়োগ বাণিজ্যের সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য আসে একটি অডিও ক্লিপ থেকে,যেখানে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনকে বলতে শোনা যায়-“আমি হইলাম প্রধান অস্ত্র..অভিযোগ করছো উপরে?ওরা তদন্ত টিম বানাবে,আমি ওই ঝামেলায় যামু না। উপরে টাকা খাইছে,আমাকেও দিতে হইছে…ইউএনও স্যারও বলছে,আমরা দিতেও পারি, নিতে পারি।”এসময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক অভিযোগকারী বলেন,“স্যার,যা গেছে গেছে,আর লাগলে দিবো।”
এই অডিও ছড়িয়ে পড়তেই চাঞ্চল্য ছড়ায় স্থানীয় মহলে।তবে তাদের কথোপকথন প্রসঙ্গে খাদ্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন,“আমি প্রতিবন্ধী মানুষ।কারও সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হয়তো কিছু কথা মুখ ফসকে গেছে।”
ডিলার বাতিল করে‘সেটিংয়ের তালিকা’
নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ পড়েন ৭ নম্বর ক্রমিকে থাকা প্রার্থী আবুল কালাম। তার পরিবর্তে নিয়োগ পান মো. ফখরুল ইসলাম। আবুল কালাম অভিযোগ করেন,ফখরুল যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তা সরকারি জমি। বিষয়টি লিখিতভাবে জানালে জেলা খাদ্য অফিসকে তদন্তের অনুরোধ করা হয়।
এদিকে,২০ নম্বর ক্রমিকে নির্বাচিত ডিলার মো.অলি উল্লাহর নামও পরে বাতিল করে তালিকায় জায়গা দেওয়া হয় সাইফুল ইসলামকে।অলি উল্লাহ জানান,ইউএনও অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।জেলা প্রশাসক তদন্তের নির্দেশ দিলেও মাঠে নেই কোনো অগ্রগতি।
স্থানীয়দের ক্ষোভ,ভুক্তভোগীদের হতাশা
স্থানীয়রা বলছেন,ডিলার নিয়োগের নামে একদল প্রভাবশালী লক্ষ লক্ষ টাকার কারসাজি করেছে।অভিযোগ করেও কেউ বিচার পাচ্ছে না।উল্টো যারা প্রশ্ন তোলে, তাদের বিরুদ্ধে হুমকি ধামকির অভিযোগও আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী এক প্রার্থী বলেন,“তালিকা তো আগেই ঠিক ছিল,হঠাৎ করে কেন পাল্টানো হলো?সবাই জানে টাকা ছাড়া ডিলার হওয়া যায় না।শুধু অভিযোগ করলেই হবে না,তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।”
প্রশাসনের ‘নীরবতা’ ঘিরে প্রশ্ন
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো,এতসব অভিযোগ,অডিও ফাঁস,তালিকা পরিবর্তন-সবকিছুর পরও উপজেলা প্রশাসন কার্যত নীরব।বারবার যোগাযোগের পরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি সারমিনা সাত্তারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ফোন রিসিভ না করলেও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা নুসরাত বিনতে আনিস জানান,“সরেজমিন তদন্ত করেছি, প্রতিবেদন দেবো। তবে দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”
স্থানীয়রা বলছেন এতসব অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী হয়,সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি কি সত্যিই দরিদ্র মানুষের জন্য,নাকি শুধুই বিত্তবানদের ভাগ বাটোয়ারার জায়গা?
জনপ্রিয় সংবাদ

ভাইরাল অডিওতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি ,নান্দাইলে ডিলার নিয়োগে ‘টাকার খেলা’

আপডেট সময় : ০৫:৪৩:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ মে ২০২৫
• প্রজ্ঞাপন জারির পর ‘নতুন তালিকা’ প্রকাশ
• লটারি ছাড়াই নাম পরিবর্তন
• অডিও ফাঁসে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত
• তদন্ত রিপোর্ট অপ্রকাশিত
• ইউএনওর নিরব ভূমিকা
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় সরকার পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকার অনিয়ম- বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে,যা নিয়ে সরগরম পুরো উপজেলা।শুরুতে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগের ঘোষণা এলেও পরে হঠাৎ বদলে যায় চিত্র,বাদ পড়ে পুরনো নাম,সেইসঙ্গে ঢুকে নতুন মুখ।এ নিয়েই যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড়,ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এক অডিও-যেখানে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাকে ঘুষ লেনদেনের বিষয় স্পষ্ট স্বীকার করতে শোনা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের জন্য ৫০টি ডিলার পদের বিজ্ঞপ্তি দেয় উপজেলা খাদ্য অফিস।এতে আবেদন করেন ২৩২ জন।যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সভায় ৫০ জনের নাম চূড়ান্ত করে গত ২ মার্চ তারিখে তালিকা প্রকাশ করা হয়।কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র একদিনের মাথায় শুরু হয় নাটক। অভিযোগ ওঠে-যোগ্যদের বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে নতুন তালিকা বানানো হয়েছে।
লটারি না দিয়েই গোপনে নাম বাদ দেওয়া হয়,যুক্ত হয় অন্য নাম।এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাদ পড়া প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হন,স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেন।
অডিও ফাঁসে বেরিয়ে আসে ভেতরের কথা
নিয়োগ বাণিজ্যের সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য আসে একটি অডিও ক্লিপ থেকে,যেখানে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনকে বলতে শোনা যায়-“আমি হইলাম প্রধান অস্ত্র..অভিযোগ করছো উপরে?ওরা তদন্ত টিম বানাবে,আমি ওই ঝামেলায় যামু না। উপরে টাকা খাইছে,আমাকেও দিতে হইছে…ইউএনও স্যারও বলছে,আমরা দিতেও পারি, নিতে পারি।”এসময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক অভিযোগকারী বলেন,“স্যার,যা গেছে গেছে,আর লাগলে দিবো।”
এই অডিও ছড়িয়ে পড়তেই চাঞ্চল্য ছড়ায় স্থানীয় মহলে।তবে তাদের কথোপকথন প্রসঙ্গে খাদ্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন,“আমি প্রতিবন্ধী মানুষ।কারও সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হয়তো কিছু কথা মুখ ফসকে গেছে।”
ডিলার বাতিল করে‘সেটিংয়ের তালিকা’
নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ পড়েন ৭ নম্বর ক্রমিকে থাকা প্রার্থী আবুল কালাম। তার পরিবর্তে নিয়োগ পান মো. ফখরুল ইসলাম। আবুল কালাম অভিযোগ করেন,ফখরুল যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তা সরকারি জমি। বিষয়টি লিখিতভাবে জানালে জেলা খাদ্য অফিসকে তদন্তের অনুরোধ করা হয়।
এদিকে,২০ নম্বর ক্রমিকে নির্বাচিত ডিলার মো.অলি উল্লাহর নামও পরে বাতিল করে তালিকায় জায়গা দেওয়া হয় সাইফুল ইসলামকে।অলি উল্লাহ জানান,ইউএনও অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।জেলা প্রশাসক তদন্তের নির্দেশ দিলেও মাঠে নেই কোনো অগ্রগতি।
স্থানীয়দের ক্ষোভ,ভুক্তভোগীদের হতাশা
স্থানীয়রা বলছেন,ডিলার নিয়োগের নামে একদল প্রভাবশালী লক্ষ লক্ষ টাকার কারসাজি করেছে।অভিযোগ করেও কেউ বিচার পাচ্ছে না।উল্টো যারা প্রশ্ন তোলে, তাদের বিরুদ্ধে হুমকি ধামকির অভিযোগও আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী এক প্রার্থী বলেন,“তালিকা তো আগেই ঠিক ছিল,হঠাৎ করে কেন পাল্টানো হলো?সবাই জানে টাকা ছাড়া ডিলার হওয়া যায় না।শুধু অভিযোগ করলেই হবে না,তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।”
প্রশাসনের ‘নীরবতা’ ঘিরে প্রশ্ন
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো,এতসব অভিযোগ,অডিও ফাঁস,তালিকা পরিবর্তন-সবকিছুর পরও উপজেলা প্রশাসন কার্যত নীরব।বারবার যোগাযোগের পরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি সারমিনা সাত্তারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ফোন রিসিভ না করলেও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা নুসরাত বিনতে আনিস জানান,“সরেজমিন তদন্ত করেছি, প্রতিবেদন দেবো। তবে দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”
স্থানীয়রা বলছেন এতসব অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী হয়,সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি কি সত্যিই দরিদ্র মানুষের জন্য,নাকি শুধুই বিত্তবানদের ভাগ বাটোয়ারার জায়গা?