০৫:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পথশিশুদের অনিশ্চিত ও অন্ধকার জীবনের কথা সবাই জানি তাই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

 

২ অক্টোবর, বিশ্ব পথশিশু দিবস ২০২৩। পথশিশু অর্থাৎ ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসন তথা তাদের জীবনমান উন্নত করার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষে দিবসটি পালিত হয়।

পথশিশু শব্দটি সেই সব শিশুদের প্রকাশ করে, যাদের কাছে রাস্তাই (বিস্তৃত অর্থে বস্তি, পতিত জমি ইত্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত) তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান অথবা জীবিকা নির্বাহের উৎস হয়ে উঠেছে এবং তারা দায়িত্বশীল কোনো প্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃক সুরক্ষিত, পথ নির্দেশনা প্রাপ্ত ও পরিচালিত নয়।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। মায়ের কোল হলো তাদের নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু পথশিশুরা স্কুলে যায় না। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে বা অন্য কাজ করে তারা। এর কারণ তাদের বাবা-মা কাজ করতে অক্ষম বা তাদের উপার্জন অতি সামান্য, যা তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট নয়।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের জন্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতির জনক ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করেন। জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণার ১৫ বৎসর পূর্বে ১৯৭৪ সালে বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের অধিকার সুরক্ষার জন্য শিশু আইন প্রনয়ণ করেন। সদ্য স্বাধীন দেশে শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা ও উন্নয়নে কল্যাণকর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

২০১৭ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদেও জায়গা করে নেয় পথশিশুরা। নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। এতে শিশুরা প্রশিক্ষণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, উম্মুক্ত স্কুল, বিনোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি বেসরকারি সংগঠন ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’-এর সহায়তায় ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মে মাস থেকে পরিচালিত ছয়টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে দুস্থ ও পথশিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা ‘শিশু হেল্প লাইন-১০৯৮’-এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি শিশুকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শহুরে শিশুদের বাল্যবিয়ে থেকে মুক্ত রাখা, শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন শর্তে ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১১টি জেলা শহরে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা সুবিধা পাচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, তাদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশ, একাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা, ভরণ-পোষণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনে স্বাবলম্বী করে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ।বাংলাদেশ শিশু আইন, ২০১৩’-এর ৮৯ অনুচ্ছেদে ১৬টি ক্যাটেগরিতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কথা বলা হয়েছে। ‘বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ, ২০১৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পথশিশু পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিশুরা কেন রাস্তায় ঘুরবে? একটা শিশুও রাস্তায় ঘুরবে না। একটা শিশুও এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করবে না।’ এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে একযোগে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। এই নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে একটি জরিপের কাজ কর

ধারণা করা হয় যে বাংলাদেশে ছয় লাখের বেশি পথশিশু বসবাস করছে এবং এদের ৭৫ ভাগই রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। মানব উন্নয়ন সূচকে ১৩৮তম স্থানে থাকা একটি দেশ, যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সেখানে এই শিশুরা সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে।
ঢাকা ও দেশের আটটি বিভাগের হটস্পটে (যেসব স্থানে পথশিশুর আনাগোনা বেশি) ৫-১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর কাছে সরাসরি গিয়ে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জরিপে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশু মোট সংখ্যা না থাকলেও ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক হতে পারে।

যেসব শিশু তাদের পরিবারসহ বা পরিবার ছাড়া বসবাস বা জীবিকা অর্জনের জন্য তাদের বেশির ভাগ সময় রাস্তায় কাটায় তাদের রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এ শিশুদের বেশির ভাগই ছেলে (৮২ শতাংশ) এবং তাদের বেশির ভাগ দারিদ্র্যের কারণে বা কাজের সন্ধানে রাস্তায় আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ৬ শতাংশ শিশু এতিম অথবা তাদের বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা তা তাদের জানা নেই।

এ শিশুদের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন (৩০ শতাংশের বেশি) জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন ঘুমানোর জন্য বিছানা এবং নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় এমন একটি ঘর থেকে বঞ্চিত। তারা পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরো বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে।

প্রায় ৭ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ একা ঘুমায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু কয়েকজন একসঙ্গে মিলে ঘুমানোর মাধ্যমে সুরক্ষা ও স্বস্তি খোঁজে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার প্রতি তিনটি ঘটনার একটি (৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) রাতে তাদের ঘুমের সময় ঘটে থাকে।

রাস্তায় বসবাসকারী শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় পথচারীদের দ্বারা। জরিপে অংশ নেয়া শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে।জাতিসংঘ শিশুসনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগই শিশু।

যেসব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন বা উভয়হীন, মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা বাবা-মা সংসার চালাতে পারছে না সেসব শিশু ঘরের বাহিরে চলে আসে রাস্তায় বসবাস শুরু করে, তাহাকে পথ শিশু বলে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোকই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এরা সঠিকভাবে শিশুদের গড়ে তুলতে পারে না। তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থকে। তারা ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রদানে ব্যর্থ হয়।

ছিন্নমূল এসব শিশুরাই তখন জীবন সংগ্রামে নেমে বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কুলি, হকার, রিকশা শ্রমিক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুননকর্মী, মাদকবাহক, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক প্রভৃতি। তাছাড়া বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদের নিয়োজিত করা হয়। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হয়ে রাতের অনেকটা সময়জুড়ে ওরা কাজ করে। একটু ভুল হলেই মালিকের হাতে মার খেতে হয়। কখনো কখনো তাকে চাকরি হারাতে হয়। সারাদিনে কাজের ধরন বুঝে ২/৩ বেলা খাবার পায় এই শিশুশ্রমিকরা। দিনশেষে ২০ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা পেয়ে থাকে, যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। মালিক পক্ষের কাছে কোনো দাবি তুললেই চাকরিচ্যুত হতে হয়। এভাবেই চলছে তাদের যাপিত কষ্টময় জীবন। এই বিপুল-সংখ্যক পথশিশুদের একটা বিশাল-সংখ্যক অংশই জড়িয়ে পড়ে নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

এছাড়া মিছিল মিটিং, বিভিন্ন রাজনৈতিক শোডাউনে কিংবা হরতালের পিকেটিংয়ে অহরহ পথশিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে কিংবা একবেলা পেটপুরে খাওয়ার বিনিময়ে এসব দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে এসব শিশুরা। শোডাউন ছাড়াও পিকেটিং, ভাঙচুর কিংবা ককটেল নিক্ষেপের মতো বিপজ্জনক কাজেও ব্যবহার হচ্ছে।

আশঙ্কাজনক হারে বাংলাদেশে বেড়ে চলেছে পথশিশুর সংখ্যা। এদের বেশির ভাগই অপুষ্টি, যৌনরোগ ও মাদকের নেশায় আক্রান্ত। মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পথশিশু।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও আট শতাংশ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে এবং মেয়ে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশের পথ শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিবছর আমাদের দেশে পালিত হয় পথ শিশু দিবস। আর পথশিশুরা কারও না কারও সন্তান, আত্মীয়-স্বজন। আল্লাহর সৃষ্টি সেরা জীব মানুষ হওয়ার কারণে পথশিশুদেরও রয়েছে ন্যায্য অধিকার। স্বাধীন দেশে এ পথশিশুদেরও সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হওয়ার অধিকার আছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এ মৌলিক চাহিদাগুলো যথোপযুক্তভাবে পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। পথিশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারে পালিত হোক জাতীয় পথশিশু দিবস।

লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল, drmazed96@gmail com

শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে নোয়াখালীতে বিক্ষোভ মিছিল

পথশিশুদের অনিশ্চিত ও অন্ধকার জীবনের কথা সবাই জানি তাই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে

আপডেট সময় : ০৬:৫৮:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০২৩

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

 

২ অক্টোবর, বিশ্ব পথশিশু দিবস ২০২৩। পথশিশু অর্থাৎ ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসন তথা তাদের জীবনমান উন্নত করার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষে দিবসটি পালিত হয়।

পথশিশু শব্দটি সেই সব শিশুদের প্রকাশ করে, যাদের কাছে রাস্তাই (বিস্তৃত অর্থে বস্তি, পতিত জমি ইত্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত) তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান অথবা জীবিকা নির্বাহের উৎস হয়ে উঠেছে এবং তারা দায়িত্বশীল কোনো প্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃক সুরক্ষিত, পথ নির্দেশনা প্রাপ্ত ও পরিচালিত নয়।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। মায়ের কোল হলো তাদের নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু পথশিশুরা স্কুলে যায় না। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে বা অন্য কাজ করে তারা। এর কারণ তাদের বাবা-মা কাজ করতে অক্ষম বা তাদের উপার্জন অতি সামান্য, যা তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট নয়।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের জন্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতির জনক ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করেন। জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণার ১৫ বৎসর পূর্বে ১৯৭৪ সালে বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের অধিকার সুরক্ষার জন্য শিশু আইন প্রনয়ণ করেন। সদ্য স্বাধীন দেশে শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা ও উন্নয়নে কল্যাণকর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

২০১৭ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদেও জায়গা করে নেয় পথশিশুরা। নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। এতে শিশুরা প্রশিক্ষণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, উম্মুক্ত স্কুল, বিনোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি বেসরকারি সংগঠন ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’-এর সহায়তায় ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মে মাস থেকে পরিচালিত ছয়টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে দুস্থ ও পথশিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা ‘শিশু হেল্প লাইন-১০৯৮’-এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি শিশুকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শহুরে শিশুদের বাল্যবিয়ে থেকে মুক্ত রাখা, শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন শর্তে ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১১টি জেলা শহরে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা সুবিধা পাচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, তাদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশ, একাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা, ভরণ-পোষণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনে স্বাবলম্বী করে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ।বাংলাদেশ শিশু আইন, ২০১৩’-এর ৮৯ অনুচ্ছেদে ১৬টি ক্যাটেগরিতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কথা বলা হয়েছে। ‘বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ, ২০১৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পথশিশু পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিশুরা কেন রাস্তায় ঘুরবে? একটা শিশুও রাস্তায় ঘুরবে না। একটা শিশুও এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করবে না।’ এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে একযোগে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। এই নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে একটি জরিপের কাজ কর

ধারণা করা হয় যে বাংলাদেশে ছয় লাখের বেশি পথশিশু বসবাস করছে এবং এদের ৭৫ ভাগই রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। মানব উন্নয়ন সূচকে ১৩৮তম স্থানে থাকা একটি দেশ, যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সেখানে এই শিশুরা সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে।
ঢাকা ও দেশের আটটি বিভাগের হটস্পটে (যেসব স্থানে পথশিশুর আনাগোনা বেশি) ৫-১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর কাছে সরাসরি গিয়ে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জরিপে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশু মোট সংখ্যা না থাকলেও ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক হতে পারে।

যেসব শিশু তাদের পরিবারসহ বা পরিবার ছাড়া বসবাস বা জীবিকা অর্জনের জন্য তাদের বেশির ভাগ সময় রাস্তায় কাটায় তাদের রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এ শিশুদের বেশির ভাগই ছেলে (৮২ শতাংশ) এবং তাদের বেশির ভাগ দারিদ্র্যের কারণে বা কাজের সন্ধানে রাস্তায় আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ৬ শতাংশ শিশু এতিম অথবা তাদের বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা তা তাদের জানা নেই।

এ শিশুদের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন (৩০ শতাংশের বেশি) জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন ঘুমানোর জন্য বিছানা এবং নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় এমন একটি ঘর থেকে বঞ্চিত। তারা পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরো বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে।

প্রায় ৭ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ একা ঘুমায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু কয়েকজন একসঙ্গে মিলে ঘুমানোর মাধ্যমে সুরক্ষা ও স্বস্তি খোঁজে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার প্রতি তিনটি ঘটনার একটি (৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) রাতে তাদের ঘুমের সময় ঘটে থাকে।

রাস্তায় বসবাসকারী শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় পথচারীদের দ্বারা। জরিপে অংশ নেয়া শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে।জাতিসংঘ শিশুসনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগই শিশু।

যেসব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন বা উভয়হীন, মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা বাবা-মা সংসার চালাতে পারছে না সেসব শিশু ঘরের বাহিরে চলে আসে রাস্তায় বসবাস শুরু করে, তাহাকে পথ শিশু বলে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোকই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এরা সঠিকভাবে শিশুদের গড়ে তুলতে পারে না। তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থকে। তারা ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রদানে ব্যর্থ হয়।

ছিন্নমূল এসব শিশুরাই তখন জীবন সংগ্রামে নেমে বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কুলি, হকার, রিকশা শ্রমিক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুননকর্মী, মাদকবাহক, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক প্রভৃতি। তাছাড়া বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদের নিয়োজিত করা হয়। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হয়ে রাতের অনেকটা সময়জুড়ে ওরা কাজ করে। একটু ভুল হলেই মালিকের হাতে মার খেতে হয়। কখনো কখনো তাকে চাকরি হারাতে হয়। সারাদিনে কাজের ধরন বুঝে ২/৩ বেলা খাবার পায় এই শিশুশ্রমিকরা। দিনশেষে ২০ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা পেয়ে থাকে, যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। মালিক পক্ষের কাছে কোনো দাবি তুললেই চাকরিচ্যুত হতে হয়। এভাবেই চলছে তাদের যাপিত কষ্টময় জীবন। এই বিপুল-সংখ্যক পথশিশুদের একটা বিশাল-সংখ্যক অংশই জড়িয়ে পড়ে নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

এছাড়া মিছিল মিটিং, বিভিন্ন রাজনৈতিক শোডাউনে কিংবা হরতালের পিকেটিংয়ে অহরহ পথশিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে কিংবা একবেলা পেটপুরে খাওয়ার বিনিময়ে এসব দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে এসব শিশুরা। শোডাউন ছাড়াও পিকেটিং, ভাঙচুর কিংবা ককটেল নিক্ষেপের মতো বিপজ্জনক কাজেও ব্যবহার হচ্ছে।

আশঙ্কাজনক হারে বাংলাদেশে বেড়ে চলেছে পথশিশুর সংখ্যা। এদের বেশির ভাগই অপুষ্টি, যৌনরোগ ও মাদকের নেশায় আক্রান্ত। মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পথশিশু।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও আট শতাংশ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে এবং মেয়ে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশের পথ শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিবছর আমাদের দেশে পালিত হয় পথ শিশু দিবস। আর পথশিশুরা কারও না কারও সন্তান, আত্মীয়-স্বজন। আল্লাহর সৃষ্টি সেরা জীব মানুষ হওয়ার কারণে পথশিশুদেরও রয়েছে ন্যায্য অধিকার। স্বাধীন দেশে এ পথশিশুদেরও সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হওয়ার অধিকার আছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এ মৌলিক চাহিদাগুলো যথোপযুক্তভাবে পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। পথিশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারে পালিত হোক জাতীয় পথশিশু দিবস।

লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল, drmazed96@gmail com