১২:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মেয়ের মরদেহ বাড়িতে রেখে মামলা করতে ১২ ঘণ্টা ধরে থানায় বাবা

রংপুর নগরীর সরেয়ারতল এলাকায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে থানায় এসে এজাহার দিলেও পুলিশ মামলা নিতে রাজি হয়নি। ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে জানিয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মেয়ের মরদেহ বাড়িতে রেখে এসে মামলা করতে থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ভুক্তভোগীর বাবা ও তার স্বজনরা। আজ ১৪ জুন শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নগরীর মাহিগঞ্জ থানায় দেখা যায় গৃহবধূ রেজোয়ানার পরিবারের সদস্যরা থানার সামনে অপেক্ষা করছেন। জানা যায়, গত ৮ জুন রবিবার দুপুরে গৃহবধূ রেজোয়ানার গায়ে আগুন দেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে মারা যান। রাত ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে থানায় আসেন নিহতের পরিবার। শনিবার দুপুর পর্যন্ত থানায় অপেক্ষা করছেন তারা। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, ঈদের পরদিন দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে হাত বেঁধে গৃহবধূ রেজোয়ানা দিল আফরোজের গায়ে আগুন দেয় তার স্বামী আব্দুল করিম। এসময় রেজওয়ানার বাবা তার বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের অভিযোগ কয়েক মাস ধরে যৌতুকের ৬ লক্ষ টাকার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন স্বামী আব্দুল করিম। নিহতের বাবা রেজাউল করিম বলেন, ঈদের দিন রাতে মেয়ের বাড়িতে কোরবানির মাংস নিয়ে যান তিনি। পরদিন দুপুরে তিনি খাওয়া-দাওয়া করে রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এসময় তার মেয়ে, জামাই ও তার মা খেতে বসেন। তিনি শুনতে পান তার মেয়ে বলছিলেন আমার খেতে বসেও শান্তি নাই। তিনি ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন তার মেয়ে-জামাই সেখানে নেই। একটু পর ঘরের ভেতর থেকে তার মেয়ে চিৎকার করে আমাকে বাঁচাও। এসময় তিনি ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করলে দেখেন ভেতর থেকে লক করা। পরে বেলকনিতে গিয়ে গিয়ে দেখেন তার মেয়ের শরীরে আগুন জ্বলছে। তার মেয়ে নিজেকে বাঁচাতে সেখানে ঘুরছেন। পরে স্থানীয়রা এসে বেলকনির বাইরে থেকে পানি ঢেলে আগুন নিভিয়ে ফেলে। পরে তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠান। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার ভোরে তার মেয়ে মারা যান। পরে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহ নিয়ে আসার সময় ফোন করে পুলিশ তাদের নগরীর মাহীগঞ্জ থানায় ডাকেন। এসময় হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত তার জামাই আব্দুল করিম, তার বোন পারভীন ও দুলাভাই ফখরুল তাদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন। নিহত রেজোয়ানার মামা মনির হোসেন বলেন, রাত ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে থানায় আসার পর অভিযুক্ত তিনজনকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু আধাঘণ্টা পর পুলিশ পারভীন ও তার স্বামী ফখরুলকে ছেড়ে দেয়। পরে তারা থানার গেট থেকে তাদের আটক করে আবারও পুলিশের কাছে দেন। এঘটনায় মামলার এজাহার দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। পরিবারের লোকজন ১২ ঘণ্টা থেকে মামলা দিতে থানায় অবস্থান করছেন বলে জানান। নিহতের চাচা মুকুল মিয়া বলেন, ভাতিজির মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়ে শুক্রবার সকাল ১১টায় তিনি থানায় আসেন। এসময় থানায় ওসিকে না পেয়ে তাকে ফোনে কল দিয়ে মামলা করবেন বলে জানান। কিন্তু ওসি তাকে বলেন, তার ভাতিজি আত্মহত্যা করেছেন। এ মামলা নেওয়া যাবে না। তারা যেন আদালতে মামলা করেন। অভিযোগ অস্বীকার করেন মাহিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, এজাহারে কিছু ভুল থাকায় মামলা গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। তদন্তের আগে ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে এমন কথা তিনি কীভাবে জানলেন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। এসময় থানায় উপস্থিত সহকারী পুলিশ কমিশনার (মাহিগঞ্জ জোন) মারুফ আহমেদ বলেন, এঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। আটক তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হবে। ওসির বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমআর/সব

জনপ্রিয় সংবাদ

মেয়ের মরদেহ বাড়িতে রেখে মামলা করতে ১২ ঘণ্টা ধরে থানায় বাবা

আপডেট সময় : ০৫:৫৬:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

রংপুর নগরীর সরেয়ারতল এলাকায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে থানায় এসে এজাহার দিলেও পুলিশ মামলা নিতে রাজি হয়নি। ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে জানিয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মেয়ের মরদেহ বাড়িতে রেখে এসে মামলা করতে থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ভুক্তভোগীর বাবা ও তার স্বজনরা। আজ ১৪ জুন শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নগরীর মাহিগঞ্জ থানায় দেখা যায় গৃহবধূ রেজোয়ানার পরিবারের সদস্যরা থানার সামনে অপেক্ষা করছেন। জানা যায়, গত ৮ জুন রবিবার দুপুরে গৃহবধূ রেজোয়ানার গায়ে আগুন দেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে মারা যান। রাত ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে থানায় আসেন নিহতের পরিবার। শনিবার দুপুর পর্যন্ত থানায় অপেক্ষা করছেন তারা। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, ঈদের পরদিন দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে হাত বেঁধে গৃহবধূ রেজোয়ানা দিল আফরোজের গায়ে আগুন দেয় তার স্বামী আব্দুল করিম। এসময় রেজওয়ানার বাবা তার বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের অভিযোগ কয়েক মাস ধরে যৌতুকের ৬ লক্ষ টাকার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন স্বামী আব্দুল করিম। নিহতের বাবা রেজাউল করিম বলেন, ঈদের দিন রাতে মেয়ের বাড়িতে কোরবানির মাংস নিয়ে যান তিনি। পরদিন দুপুরে তিনি খাওয়া-দাওয়া করে রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এসময় তার মেয়ে, জামাই ও তার মা খেতে বসেন। তিনি শুনতে পান তার মেয়ে বলছিলেন আমার খেতে বসেও শান্তি নাই। তিনি ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন তার মেয়ে-জামাই সেখানে নেই। একটু পর ঘরের ভেতর থেকে তার মেয়ে চিৎকার করে আমাকে বাঁচাও। এসময় তিনি ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করলে দেখেন ভেতর থেকে লক করা। পরে বেলকনিতে গিয়ে গিয়ে দেখেন তার মেয়ের শরীরে আগুন জ্বলছে। তার মেয়ে নিজেকে বাঁচাতে সেখানে ঘুরছেন। পরে স্থানীয়রা এসে বেলকনির বাইরে থেকে পানি ঢেলে আগুন নিভিয়ে ফেলে। পরে তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠান। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার ভোরে তার মেয়ে মারা যান। পরে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহ নিয়ে আসার সময় ফোন করে পুলিশ তাদের নগরীর মাহীগঞ্জ থানায় ডাকেন। এসময় হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত তার জামাই আব্দুল করিম, তার বোন পারভীন ও দুলাভাই ফখরুল তাদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন। নিহত রেজোয়ানার মামা মনির হোসেন বলেন, রাত ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে থানায় আসার পর অভিযুক্ত তিনজনকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু আধাঘণ্টা পর পুলিশ পারভীন ও তার স্বামী ফখরুলকে ছেড়ে দেয়। পরে তারা থানার গেট থেকে তাদের আটক করে আবারও পুলিশের কাছে দেন। এঘটনায় মামলার এজাহার দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। পরিবারের লোকজন ১২ ঘণ্টা থেকে মামলা দিতে থানায় অবস্থান করছেন বলে জানান। নিহতের চাচা মুকুল মিয়া বলেন, ভাতিজির মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়ে শুক্রবার সকাল ১১টায় তিনি থানায় আসেন। এসময় থানায় ওসিকে না পেয়ে তাকে ফোনে কল দিয়ে মামলা করবেন বলে জানান। কিন্তু ওসি তাকে বলেন, তার ভাতিজি আত্মহত্যা করেছেন। এ মামলা নেওয়া যাবে না। তারা যেন আদালতে মামলা করেন। অভিযোগ অস্বীকার করেন মাহিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, এজাহারে কিছু ভুল থাকায় মামলা গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। তদন্তের আগে ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে এমন কথা তিনি কীভাবে জানলেন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। এসময় থানায় উপস্থিত সহকারী পুলিশ কমিশনার (মাহিগঞ্জ জোন) মারুফ আহমেদ বলেন, এঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। আটক তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হবে। ওসির বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমআর/সব