- ঈদের পরই অস্থির চালের বাজার
- হঠাৎ এতোটা দাম বাড়ায় বেকায়দায় ভোক্তারা
- বাজারে নজরদারিতে ঘাটতি বলছেন সংশ্লিষ্টরা
‘মূলত ধান-চালের বাজারে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বাজার সবখানেই নজরদারিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। আর এতেই বারবার অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে’-এস এম নাজের হোসাইন, সহ-সভাপতি, কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)
‘এখন যে ধানের দাম বাড়ানো হচ্ছে এগুলো এক শ্রেণির অবৈধ মজুদদাররা করছে। এর সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও জড়িত। এরাই বারবার এ কাজ করে। এরা কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা করে না’-লায়েক আলী, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল মালিক সমিতি
বোরোর ভালো উৎপাদনের পর বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরু চালের দাম কমলে কিছুটা স্বস্তির দেখা পেয়েছিলেন ভোক্তারা। কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। কোরবানির ঈদের ছুটি শেষ হতে না হতেই এক লাফে ফের চালের দাম বেড়ে গেছে। মিনিকেট চালের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় চালের দাম হঠাৎ এতটা বেড়ে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন ভোক্তারা। বাজারে চাল কিনতে গিয়ে অনেকে অতিরিক্ত দামের কারণে জড়িয়ে পড়ছেন বাগ্-বিতণ্ডায়। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, ধান ও চালের বাজারে সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে এই অস্থিরতা। তারা বলছেন, এখন যে ধানের দাম বাড়ানো হচ্ছে এগুলো এক শ্রেণির অবৈধ মজুদদাররা করছে। এর সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও জড়িত। এরাই বারবার এ কাজ করে। এরা কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা করে না। এসব সিন্ডিকেটের কারণেই ভালো ফলন হওয়ার পরেও বারবার চালের দাম ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে মানুষ বেকায়দায় পড়ছে।
জানা গেছে, ধান উৎপাদনে সর্বাধিক উৎপাদনশীল মৌসুম হচ্ছে বোরো। কেননা দেশের মোট উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে এ মৌসুমে। এবার আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় বোরোর ফলন সন্তোষজনক। নির্বিঘ্নে কৃষকের ঘরে ওঠছে বোরো ধান। বাজারে নতুন চাল ওঠায় দামও কমে এসেছিল। কিন্তু ঠিক কী কারণে হঠাৎ বাজারে অস্থিরতা তার যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না কেউ। ভরা মৌসুমে দাম বাড়ার পেছনে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা দুষছেন মিল মালিকদের। অপরদিকে মিল মালিকরা দায়ী করছেন অবৈধ মজুদদারদের। আর এর মাঝে পড়ে অতিরিক্ত দামে চাল কিনে ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বোরো মৌসুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবার সারাদেশে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ৫০ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। আর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন। এ পর্যন্ত যতটুকু অর্জিত হয়েছে তাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ধান কাটা শেষ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ টন। ভালো ফলন ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ার বিষয়ে মিলাররা বলছেন, একদিকে মিলে খরচ বেড়েছে। অপরদিকে ধানের বাজারেও দর ওঠানামা করছে। চালের দামে এর প্রভাব পড়েছে। এদিকে বাজার সংশি¬ষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বোরো মৌসুমে যে ফলন হয়, তাতে চালের দাম কমে আসে। এ সময় নতুন চাল ওঠলে বাজারে অনেকটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও সরু চালের দামে নাজেহাল ভোক্তা। বাজার বিশে¬ষকদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে গাফিলতির সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র বারবার নানা কায়দায় চালের দাম বাড়িয়ে অল্প সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এতে যৌক্তিক দামে চাল কিনে খেতে পারছেন না ভোক্তারা।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. কৌশিক আহমেদ গতকাল মাসের চাল কিনতে গিয়ে জানান, ঈদের আগে ৭৫ টাকা কেজি দরে কেনা সরু চালের দাম বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে। সিজনের নতুন চাল ওঠার পর দাম কমে ৭৫ টাকা হলো বেশিদিন হয়নি। এর মধ্যেই এক লাফে বেড়ে ৮০ টাকা হয় কী করে, বুঝে পাই না। এগুলো খতিয়ে দেখার কি কেউ নেই?
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মো. নজরুল ইসলাম ফরিদ চালের বাড়তি দামে ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, এক লাফে বস্তায় (৫০ কেজি) ৩০০ টাকা বেড়ে গেছে। দোকানির কাছে জানতে চাইলে তারা বলছেন কারণ জানেন না। চালের মিলগুলোই নাকি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। মিলগুলো কেন বাড়াল সেই তদারকি কে করবে? যেহেতু চাল অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য, সরকারের উচিত দ্রুত বাজার খতিয়ে দেখা।
কদমতলী এলাকার চাল ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ঈদের পর সরু চালের দাম এক লাফে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে মিলগুলো। এতেই খুচরা ও পাইকারি বাজারে দাম লাফিয়ে বেড়েছে। অথচ বাজারে চালের সংকট নেই। এর আগে সংকট থাকলেও বোরো মৌসুমের নতুন চাল ওঠায় সরবরাহ বেড়েছে। বাজারে চালের সরবরাহ এখন পর্যাপ্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার অতিরিক্ত পরিচালক (সম্প্রসারণ ও কো-অর্ডিনেশন) ড. মো. আব্দুল আজিজ বলেন, এবার আবহাওয়াসহ সবকিছু অনুকূলে রয়েছে। ভালো ফলন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামান্য যে বৃষ্টি হচ্ছে, তাতে ক্ষতিকর তেমন প্রভাব ফেলবে না। কয়েকটি অঞ্চল ছাড়া ধানকাটা প্রায় শেষের দিকে। এবার উৎপাদন সন্তোষজনক। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়েক আলী বলেন, এখন যে ধানের দাম বাড়ানো হচ্ছে এগুলো এক শ্রেণির অবৈধ মজুদদাররা করছে। এর সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও জড়িত। এরাই বারবার এ কাজ করে। এসব মজুদদারের কোনো কাগজপত্রও নেই। এরা কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা করে না।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মূলত ধান-চালের বাজারে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বাজার সবখানেই নজরদারিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। আর এতেই বারবার অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। বোরোতে ভালো ফলন হয়েছে। চালের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দাম যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
























